সাম্প্রতিক সহিংসতায় রাজধানীর মেট্রোরেল, বিটিভি কার্যালয়, নরসিংদী জেলা কারাগার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারসহ গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইগুলোয় অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর চালানো হয়। আগুন দেয়া হয় বিদ্যুতের বিভিন্ন উপকেন্দ্র, সেতু ভবন, দুর্যোগ ভবন ও বিআরটিএ কার্যালয়ে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের বক্তব্যও এসেছে। তবে এসব বক্তব্যকে ছাপিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, কেপিআই নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ না করাটাই এসব স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বিধানের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এর জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) দেয়া রয়েছে। এখানে কার কী দায়িত্ব, কে কোন সময় দায়িত্ব পালন করবেন, কোন সময় ওপেন ফায়ার করা হবে, কোন কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, সে নির্দেশনাও রয়েছে। সব কেপিআইয়ে একই ধরনের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়। এর জন্য কোন ধরনের কেপিআইয়ে কোন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে তাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিটিভি, রেডিও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা হয়েছে, সেখানে জেলার থাকেন, ন্যূনতম ৭০-৮০ জন পুলিশ থাকেন। এখানে তো তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেয়ার কিছু নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবির কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য নীতিমালাও করা আছে। তারপরও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় কেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি, তার জন্য আগে তদন্ত করতে হবে।’
দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেপিআইয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৭ সালে ইংরেজিতে ‘ইনস্ট্রাকশন ফর সিকিউরিটি অব কেপিআই ইন বাংলাদেশ’ তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ ও বাংলা ভাষায় প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারি কার্যালয়, সরকারি বাসভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা কেপিআইয়ের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা কারখানা অথবা জনস্বার্থে ব্যবহৃত স্থাপনা, এমনকি দেশের জাতীয় অর্থনীতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কেপিআইয়ের আওতাভুক্ত। দেশে ৫৮৭টি কেপিআইভুক্ত স্থাপনা রয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানায়, কেপিআই ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় এসবি সদর দপ্তর থেকে ৬৪টি জেলার পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন উপকমিশনার (ডিসি) এবং কেপিআইয়ের দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে মনিটরিং করা হয়। পাশাপাশি সব কেপিআইপ্রধান ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার ই-মেইল এবং টেলিফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, কেপিআই স্থাপনাগুলোয় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালায় দুই শ্রেণীর নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে বলা হয়েছে, ‘কেপিআইয়ের ২০ মিটারের ভেতরে ভূগর্ভস্থ পয়োনিষ্কাশন লাইন কিংবা যেকোনো সুড়ঙ্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে কেপিআইডিসির মতামত বা ছাড়পত্র নিতে হবে। কেপিআইয়ের চতুর্দিকে অবস্থিত যেসব স্থাপনা থেকে গোপনে ছবি তোলা যায় বা আগ্নেয়াস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুর আওতায় পড়ে, সেসব স্থাপনায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কেপিআই গেটগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং এর উচ্চতা সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। টহলরত কর্মকর্তারা গেটের বাইরের অংশে যেন সার্বক্ষণিক দৃষ্টিসীমা রাখতে পারেন, তার জন্য পর্যাপ্ত ফাঁক রাখতে হবে।
প্রথম শ্রেণীতে তিন ধরনের (ক, খ ও গ) নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণীর নিরাপত্তায় নানা ধরনের নিরাপত্তা বলয়ের কথা বলা হয়েছে। এসব নিরাপত্তায় কার কী দায়িত্ব, সেগুলো সুনির্দিষ্ট করা আছে। তবে কেপিআই নিরাপত্তায় ত্রুটি রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।
দেশে কেপিআইগুলো নিরাপত্তা ও মনিটরিং বাড়াতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়েছে কেপিআই ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার। গত বছর থেকে এ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। কেপিআইগুলোয় গতানুগতিক ব্যবস্থার বাইরে এর মাধ্যমে নিরাপত্তার নির্দেশনা দেয়া যায় এক ক্লিকেই। এত কিছুর পরও কীভাবে হামলা হলো, তা খতিয়ে দেখার কথা বলছেন অনেকেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) জয়দেব কুমার ভদ্র বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য সরকারের একটি নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতিমালা অনুযায়ী ক্যাটাগরিভিত্তিক নিরাপত্তা দেয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে আগে সরকারের কাছে কেপিআইভুক্ত হতে আবেদন করতে হয়। যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে সেই আবেদন গ্রহণ হলে প্রতিষ্ঠানটিকে ক্যাটাগরি অনুযায়ী নিরাপত্তা দেয়া হয়।’
দেশের বিদ্যুতের মেগা প্রকল্প, বৃহৎ সাবস্টেশন এবং সার্বক্ষণিক চলমান (বেইজলোড) বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোই রয়েছে রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলোয়।
বিদ্যুৎ খাতের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যেসব স্থাপনা কেপিআইভুক্ত সেগুলো নিরাপদ। সেসব জায়গায় ৮০-১০০ জন করে সশস্ত্র আনসার রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এসব সহিংসতায় গাজীপুরের টঙ্গীর বিদ্যুতের চেরাগ আলী অফিস, সেখানকার উপকেন্দ্র, জাপান গার্ডেন সিটি উপকেন্দ্র, আজিমপুর উপকেন্দ্র, নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, সেখানকার বিদ্যুৎ বিতরণের আঞ্চলিক অফিস, মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ ও বিদ্যুতের বিভিন্ন যানবাহনে অগ্নিসংযোগে এ ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনে ভাংচুর চালানো হয় ১৯ জুলাই। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্টেশন দুটি। কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক ক্ষতির হিসাব শুরু করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তদন্ত কমিটি। তবে নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে মেট্রোরেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।