দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে টাকা যাচ্ছে সরকারের তহবিল থেকে ৷
রোববার (২৩ জুন) রাজধানীর মহাখালীতে ব্রাক ইন সেন্টারে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তার উপস্থাপনায় বলেন, দেশে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ব্যবহার করা না গেলেও কেন উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে?
তিনি বলেন, সরকার এখন যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে, তা ২০৩০ সালেও প্রয়োজন হবে না। আজ থেকে ছয় বছরে চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২৫ শতাংস রিজার্ভ ধরলে তখন ২৩ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হলেই হয়।
গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, সক্ষমতা বাড়লেও এখনও দেশে হচ্ছে লোডশেডিং। গরমে গড়ে ১১শ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। ময়মনসিংহ, খুলনায় এবং সিলেটে লোডশেড করা হয়। বাজেটে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত নিয়ে স্পষ্ট কিছু নেই। সরকার এই খাত নিয়ে কী করবে সেই ব্যাপারেও অন্ধকারে সবাই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি সংসদ সদস্য ও হামিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ গ্যাসের কথা বলে দাম বাড়ানো হলো কিন্তু লোডশেডিং কমেনি ৷ ৭/৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না ৷ ডিজেল দিয়ে, সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে ৷ এতে খরচ বেড়ে গেছে ৷ অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে ৷ নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস বিদ্যুৎ না থাকায় দেশে বিনিয়োগ আসছে না ৷ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে ক্যাপিটেল মেশিনারিজ আমদানি৷ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২২ শতাংশ ৷
বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় অনুন্নয়ন খাতে হয় দাবি করে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হাজার কোটি টাকা খরচ করে দামি গাড়ি কেনা হচ্ছে, যেখানে ভারতের মন্ত্রীরা নিজেদের দেশের গাড়িতে চড়েন ৷
ভারতের বিনিয়োগ পলিসির কথা তুলে ধরে একে আজাদ বলেন, তাদের জমি, বিদ্যুৎ জ্বালানি সাবিসিডাইজ, ৫ বছরের জন্য কর্মীদের বেতন দেয় সরকার, বিনিয়োগ তো সে দেশেই হবে ৷ তিনি বলেন, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না হলে কর্মসংস্থান হবে না ৷
এ সংসদ সদস্য আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে এখন উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট পার করেছে ৷ এতে জিডিপি বেড়েছে ৷ মধ্যআয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ ৷ এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হবে ৷ কাজ করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি হবে, তা সংশোধন হচ্ছে, ভবিষ্যতে আরো হবে ৷
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলেও দেশে সুবিধা মিলছে না কারণ ডলারের দাম বেশি ৷ আজকে প্রাইমারি এনার্জি থাকলে বিদ্যুৎখাতের যেসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে তা হতো না।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, সবার আগে একটি আধুনিক জ্বালানি নীতিমালা প্রয়োজন ৷ তা না করে শুধু জোড়াতালি দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৷ এজন্য একের পর এক মাস্টার প্ল্যান ফেল করছে ৷ বিদ্যুৎ খাতের বিশেষ বিধান বাতিল করতে হবে ৷ টেন্ডার ছাড়া প্রকল্প নেয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দাম পাওয়া যাচ্ছে না ৷ এখনো ১২/১৩ টাকায় সৌর বিদ্যুতের চুক্তি হচ্ছে ৷ যেটা ৮/৯ টাকায় করা সম্ভব দরপ্রক্রিয়ায় গেলে ৷
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) পুরোপুরি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের নামে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি সমন্বয় করা হয়েছে ৷
শামসুল আলম বলেন, বিপিসির দুর্নীতি প্রমাণ হলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সরকার বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ কিনছে। আবার কমিশনকে পাশ কাটিয়ে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করছে।