সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ও শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা

ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। নিয়ন্ত্রণমূলক আমদানি নীতির প্রভাবে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সুদের হার বাড়তে থাকায় ঋণ গ্রহণে ব্যয় বেড়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা

ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। নিয়ন্ত্রণমূলক আমদানি নীতির প্রভাবে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। সুদের হার বাড়তে থাকায় ঋণ গ্রহণে ব্যয় বেড়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটের এসব পদক্ষেপ এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের ঋণ গ্রহণে ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ায় বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণ প্রাপ্তিকে কঠিন করে তুলতে পারে। আবার শুল্ক আরোপের ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে বেসরকারি খাতে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ে সরকার বেশকিছু পণ্য ও সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও শুল্ক (কাস্টমস) বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশও শিল্প খাতের বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা। একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে দেশের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোও।

দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে মূলধনি যন্ত্রাংশ আমদানিতে শিল্প উদ্যোক্তাদের আর শুল্ক অব্যাহতি থাকছে না। সরকার শূন্য শতাংশ শুল্ক থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর শুল্ক আরোপ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ১ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোনো ডেভেলপার উন্নয়নকাজে পণ্য আমদানি করলে তাকেও ১ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। মূলধনি যন্ত্রাংশ আমদানি করার ক্ষেত্রে এসআরও সংশোধন করে কিছু পণ্য তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।

সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাই-টেক পার্ক গড়ে ‍তুলছে। এসব অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উদ্যোক্তাকে আহ্বান জানাচ্ছে। তবে শুল্ক আরোপ হলে বিনিয়োগকারীরা নিরুসাহিত হতে পারেন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

প্রস্তাবিত বাজেটে হাই-টেক পার্কে বিভিন্ন মূলধনি যন্ত্রাংশ ও নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে শূন্য শুল্ক থেকে বেরিয়ে আসতে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া হাই-টেক পার্কের উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত পণ্য আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে আগামী বাজেটে।

দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প এলাকার বাইরে গিয়ে কারখানা স্থাপন করলে সেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দেয়া হবে না। চলতি বছরের ২১ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলে ব্যাংক ঋণ পাবেন না শিল্পমালিকরা। এ-সংক্রান্ত এক নির্দেশনা গত মার্চে জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারের এসব শর্তের বাইরে নতুন করে অর্থনৈতিক অঞ্চলে শুল্ক আরোপ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজেটে বিকেএমইএর দেয়া প্রস্তাবের কোনো প্রতিফলন নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে ১ শতাংশ এআইটি (অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স) কেটে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। এ প্রস্তাব শিল্পের জন্য সবচেয়ে খারাপ দিক। বাজেটে সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, তখন শিল্প খাত ঋণ পেতে জটিলতায় পড়বে।’ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক আরোপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শনিবার (আজ) বিকেএমইএ সংবাদ সম্মেলন করবে। সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’ 

ঘাটতি অর্থের সংস্থান করতে প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে বড় অংকের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ ঋণের মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় মেটাবে আগামী অর্থবছরে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আর ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ দুই খাত থেকে আগামী অর্থবছরে সরকারের ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি এমনিতেই জটিল সময় পার করছে। প্রতিটি খাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি রয়েছে। ভালো ভালো কোম্পানিতেই এ পরিস্থিতি। এর মধ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে বাজেট প্রস্তাবনায় গুরুত্ব দেয়া যেত। ঘাটতির টাকার বড় অংশ ব্যাংক থেকে নেয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই সম্প্রসারণ কিংবা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কমে আসবে। এদিকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজেও শুল্ক হার বসছে। এক্সপোর্টের ক্ষেত্রেও প্রণোদনা কিংবা সুবিধা তৈরির বদলে উল্টোটা হয়েছে।’

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এ দুই খাত থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্য কমিয়ে আনা হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ক্রমাগত ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতে এরই মধ্যে ব্যাংক ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমে গেছে। 

প্রস্তাবিত বাজেট কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়বে মন্তব্য করেছেন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু হেনা মো. রেজওয়ানুল করিম। তিনি বাজেট প্রতিক্রিয়ার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘সরকার বিদেশী ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির মতো ব্যয় মেটাতে কর অব্যাহতি ও শুল্ক-করে ছাড় কমিয়ে রাজস্ব আয়ের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তাতে শুধু মধ্যবিত্ত নয়, নিম্ন ও উচ্চ বিত্তদের ওপরও নানা ক্ষেত্রে করের চাপ বাড়বে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি হবে। সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে, তাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।’

দেশের বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন প্রবৃদ্ধি এরই মধ্যে বেশ শ্লথ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে, যা দুই বছর আগেও ছিল ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। 

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি. রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার দুই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। প্রথমত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়লে অর্থনীতিতে একটি ক্রাউডিং আউট প্রভাব তৈরি করতে পারে। এর ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আবার মূলধনি যন্ত্র আমদানিতে এখন অন্তত ১ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং ডলারের বিনিময় হারও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার একটি কারণ।’

আরও