মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার বাস্তবতায় কর ও ভ্যাটের পুনর্বিন্যাস আবশ্যক

এবারের বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকুচিত রফতানি বাজার, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি; কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী অবস্থা; ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধাবস্থা; বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ সব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। তাছাড়া ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত

এবারের বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকুচিত রফতানি বাজার, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি; কভিড-১৯ মহামারী-পরবর্তী অবস্থা; ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধাবস্থা; বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ সব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। তাছাড়া ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হতে যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য কিছু সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সে হিসেবে এবারের বাজেট একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট হিসেবেও গণ্য হবে।

এমসিসিআই সবসময়ই একটি উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুকরণে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘‌ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘‌স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর দিকে এগিয়ে চলছে এবং সব ক্ষেত্রেই আমরা উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করছি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্ব এবং বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের সামগ্রিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে এনবিআর দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলছে। বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কর আহরণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩৮ দশমিক ৫২ শতাংশ কর আহরণ করা হয়েছে।

এমসিসিআই বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে সবসময়ই বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিকতর গতিশীল করার দিকে জোর দিয়ে থাকে। আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫-এর জন্য এমসিসিআই নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে—

১। বিগত অর্থবছরে কিছু শর্তসাপেক্ষে প্রায় সবক্ষেত্রে করপোরেট করহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় হ্রাসকৃত কোম্পানি করহার সুবিধা অনেকেই ভোগ করতে পারছে না। অর্থ আইন, ২০২৩ অনুযায়ী নগদ লেনদেনের শর্তাবলির প্রযোজ্যতার কারণে হ্রাসকৃত করহার সুবিধা নেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিপুল অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হয়। এ অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশের শিল্প ব্যবস্থা ক্রমেই অগ্রসরমাণ। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় করহারের ক্ষেত্রে অর্থ আইন, ২০২৩-এর শর্তাবলি বাতিল বিবেচনায় বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

অন্যপক্ষে, বাংলাদেশে কার্যকরী করপোরেট করহার (Effective Tax Rate)  অনেক বেশি। এখানে অননুমোদিত ব্যয় (disallowance of expense) এবং উৎসে কর কর্তন (TDS)  এত বেশি যে ব্যবসায়ীরা এ করপোরেট করহারের কমানোর সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। বাস্তবে এ করপোরেট করহার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ আর থাকে না, তা ক্ষেত্রবিশেষে ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। বিষয়টিও বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি।

২। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে ‘‌ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘‌স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপান্তরের দিকে অগ্রসরমাণ। সরকার সবক্ষেত্রেই অটোমেশনের দিকে জোর দিয়ে যাচ্ছে। এ ধারাবাহিকতায় বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ‘‌অনলাইনভিত্তিক আয়কর রিটার্ন যাচাইকরণ’ ব্যবস্থা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এছাড়া ‘‌অনলাইনভিত্তিক ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন জমাদান’ পদ্ধতি আরো একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে করদাতারা সব ধরনের দলিলাদি অনলাইনের মাধ্যমে সংযুক্তির সুবিধা পেলে এ অনলাইনভিত্তিক আয়কর রিটার্ন জমাদান পদ্ধতি অনেক জনপ্রিয়তা পাবে বলে এমসিসিআই বিশ্বাস করে।

ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় সব কোম্পানিগুলো মাসিক ভ্যাট রিটার্ন প্রদান করে। তবে এ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে অটোমেশন নয়। E-Invoicing  এর মাধ্যমে এ অটোমেশন ব্যবস্থা গতিশীল হবে বলে এমসিসিআই মনে করে। এছাড়া ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব উপাদানকেই পণ্য বা সেবার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করে আইনের ধারা পরিবর্তন সাপেক্ষে রেয়াত ব্যবস্থার অটোমেশন পূর্ণাঙ্গরূপে গতিশীল হবে বলে এমসিসিআই বিশ্বাস করে।

সময়ের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে কর নির্ধারণ ব্যবস্থা, আপিল, ট্রাইব্যুনাল, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পর্যায়ে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়নপূর্বক অনলাইনে শুনানি গ্রহণের বিধান প্রবর্তন করা অতীব জরুরি। এছাড়া করদাতাদের নোটিস প্রদান, শুনানিতে করদাতাদের হাজিরা পদ্ধতি ইত্যাদির ব্যবস্থাগুলো ও আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক হওয়া খুবই জরুরি। এ ব্যবস্থার ফলে ব্যবসায়ীদের অর্থ ও সময়ের অপচয়সহ ব্যবসায়িক ব্যয় কমবে।

৩। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বর্তমানে ২৬৪ ধারা অনুযায়ী ৪৩টি ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমাদানের প্রমাণপত্র (PSR) দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। PSR সংগ্রহকারীর পক্ষে হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা জটিল হচ্ছে। কোম্পানিগুলো এনবিআরের পক্ষে আইনসিদ্ধভাবে কর ব্যবস্থাপনা তদারক করে। ফলে এ বিধানের ক্ষেত্রগুলো বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনাপূর্বক পরিসর সীমিত করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

৪। ছয় বছরের অধিককাল পর্যন্ত পরিসম্পদ কর বিবেচনা: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২১২(৪)-এর দফা (আ) তে ০৬ (ছয়) বছরের অধিককাল পর্যন্ত পরিসম্পদ ওই ষষ্ঠ বছরের বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। বাস্তব অবস্থায় ষষ্ঠ বছরের পূর্বোক্ত বছরগুলোর হিসাব অনেকাংশে সংরক্ষণ করা খুবই দুরূহ। ষষ্ঠ বছরের অধিককালের কোনো সীমারেখা না রেখে প্রণীত আইন বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমসিসিআই পূর্বোক্ত আইনের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে নতুন আয়কর আইন, ২০২৩-এ বিধানটি প্রবর্তন করার জন্য এনবিআর চেয়ারম্যান মহোদয়কে অনুরোধ জানাচ্ছে।

৫। অনুমোদিত ফান্ডগুলোর ওপর করারোপ: অর্থ আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্য তহবিল, অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিল, অনুমোদিত আনুতোষিক তহবিল এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওই ফান্ডের জন্য কোনো কর আরোপের বিধান নেই। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমারেখা আইনগতভাবে দৃষ্টিকটু ও বৈষম্যমূলক। এ অবস্থায় ফান্ডগুলোর কর আরোপ পুনর্বিবেচনা করার সুপারিশ করছি।

৬। বর্তমান বাস্তবতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পণ্যের বিনিময়মূল্যকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করে ডাটাবেজ মূল্য বা রেকর্ড মূল্যকে শুল্কায়নের মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের হালনাগাদ তথ্যের ডাটাবেজ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সাবস্ক্রাইবের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অটোমেশন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন করতে সম্মানিত চেয়ারম্যান মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

৭। বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ লাখ জনশক্তি যাদের বয়স ১৫-৬০ বছর এবং যারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত নয় (NEET) এ বৃহৎ জনশক্তিকে শ্রমবাজারে নিয়ে আসা খুবই জরুরি। এ বৃহৎ জনশক্তিকে যদি দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে আমাদের জিডিপির (GDP)  ওপর অবশ্যই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় শিল্পের বিকাশ খুবই জরুরি। স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা স্থানীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আয়কর হার, মূসক ব্যবস্থাপনা, শিল্প যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ককহার, সম্পূরক শুল্কহার যথাযথভাবে বিবেচনা করে স্থানীয় শিল্প সম্প্রসারণে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

৮। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় আয়কর হার, ভ্যাট হার, সম্পূরক কর, শুল্কহারসহ কাস্টমস ডিউটিগুলো পুনর্বিন্যাস করা আবশ্যক।

তাছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশের নিরিখে সম্পূর্ণ অটোমেশন ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিকল্পনা খুবই জরুরি। এ অবস্থায় বর্তমান বাজেট প্রস্তাবনা থেকে এর রূপরেখা বা পরিকল্পনা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৯। ২০২৬ সালে উন্নত আয়ের দেশে পরিপূর্ণ হলে অনেকাংশে রাজস্ব কমে যেতে পারে। সেজন্য পরিপূর্ণভাবে অটোমেশন ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিকল্পনাসহ একটা করনীতি আবশ্যক।

১০। উৎসে কর কর্তনসংক্রান্ত আইনের ধারাগুলোর কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন এবং হারগুলোর বাস্তব ব্যবসায়িক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ণয় করার সুপারিশ করছি। 

১১। সর্বশেষ ভ্যাট আইনের ক্ষেত্রে E-Invoice (Electronic VAT invoice); কেন্দ্রীয় ইউনিট; উপকরণ-উৎপাদন সহগ; রেয়াত ব্যবস্থা সহজীকরণের ধারাগুলো সহজীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্যও প্রস্তাব করছি।

উপসংহারে, স্মার্ট বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘‌ক্যাশলেস বাংলাদেশ’; ‘‌ডিজিটাল ব্যাংক ও ক্রেডিট স্কোরিং সিস্টেম’ ও ‘‌ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা’ বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্তি, যা পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন প্রক্রিয়ার বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে এমসিসিআই বিশ্বাস করে।

আরও