আগামী পাঁচ-ছয় বছর এলপিজির প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হওয়ার আশা করা হচ্ছে

১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইগ্যাস তুরস্কের একটি সফল ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিভিন্ন মহাদেশ ও দেশ পর্যালোচনা করে সর্বশেষ আমরা সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার। ঠিক যে মুহূর্তটায় আমরা বিনিয়োগের জন্য স্থানীয় অংশীদার খুঁজছি, সেই সময়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইওর সহযোগিতায় ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে এক পাটাতনে দাঁড়িয়েছি।

প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশের বাজারে পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের ওপরে। আর এ খাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। যার ৯৮ শতাংশই বিনিয়োগ হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্য দিয়ে এলপি গ্যাসের বাজার শুরু হলে তা প্রসারিত হয়ে এখন শিল্প, ব্যক্তিগত গাড়িতে অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার প্রাক্কালে এ খাতে অবকাঠামো, মজুদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে পাইপলাইনের গ্যাসের মতো সারা দেশে এলপি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব।

এলপিজি খাতে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেডের সিইও আহমেত আর্যুমান্ত পোলাট

ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেড বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করেছে ২০২১ সালে। এ তিন বছরের যাত্রা কেমন ছিল?

১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইগ্যাস তুরস্কের একটি সফল ব্র্যান্ড। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিভিন্ন মহাদেশ ও দেশ পর্যালোচনা করে সর্বশেষ আমরা সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার। ঠিক যে মুহূর্তটায় আমরা বিনিয়োগের জন্য স্থানীয় অংশীদার খুঁজছি, সেই সময়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সিইওর সহযোগিতায় ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে এক পাটাতনে দাঁড়িয়েছি। নীতিমালা, ব্যবসায়িক পন্থা, লক্ষ্যমাত্রা ও বাণিজ্যিক কৌশল—সবদিক থেকেই। 

বাজারে প্রবেশের এক বছরের মধ্যেই আমরা চট্টগ্রামে নিজস্ব প্লান্ট স্থাপন করেছি, যা খুবই অল্প সময়। এজন্য আমরা বিডা, সিপিএ ও সরকারি অন্য বিভাগগুলোকে ধন্যবাদ জানাই। স্টার্টআপ কোম্পানি হিসেবে এটা আমাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। সবকিছু আমরা গোড়া থেকে শুরু করেছি। বলতে কোনো দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে ইউনাইটেড গ্রুপের বিদ্যুৎ ও ব্যবহারিক জ্ঞান এবং আইগ্যাসের বাণিজ্যিক সংস্কৃতি সম্মিলিতভাবে সফলতার পথে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে।  

এলপি গ্যাসের বাজার ক্রমে বড় হয়ে উঠছে। সরকার যখন থেকে ন্যাচারাল গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে, তখন থেকেই গৃহস্থালি কাজে দ্রুত বাড়ছে এলপি গ্যাসের ব্যবহার। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছে, এখন থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস গৃহস্থালিভাবে সরবরাহ করা হবে না। বরং কেবল ইকোনমিক জোন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যেই সীমিত থাকবে। ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় প্রতিস্থাপক হতে পারে এলপিজি। আগামী পাঁচ-ছয় বছর এলপিজি গ্যাসের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাল্ক ও অটোগ্যাস বিজনেসের সম্ভাবনা তাই এখানে ব্যাপক।

গ্রাহকদের মধ্যে পরিবেশানুকূল এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে কেমন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা বেশ জটিল একটা প্রশ্ন। আমি তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বসবাস করছি। ফলে আমি নিজেকে অর্ধেক বাংলাদেশী মনে করি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি বায়ুদূষণ। এলপিজির তুলনায় কাঠ ও কয়লা পুড়লে প্রায় দেড়শ গুণ বেশি কর্বন মনোক্সাইড তৈরি হয়। অটোমোবাইল ও থ্রি হুইলারের জন্য অটোগ্যাসও অনেক বেশি সুবিধাজনক। ডিজেলের চেয়ে অটোগ্যাস প্রায় ৯৬ শতাংশ কম নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করে। পেট্রলের চেয়ে কম করে ৬৮ শতাংশ। অটোগ্যাস ডিজেলের তুলনায় পিএম ৮১ শতাংশ কম নিঃসরণ করে। ফলে এলপিজি কোম্পানি হিসেবে আমাদের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে। 

এলপিজি খাতে ২৫টি কোম্পানি কাজ করছে। ছোট একটা মার্কেটে এতগুলো কোম্পানি থাকায় এর ভবিষ্যৎ কেমন বলে আপনি মনে করছেন? 

বিষয়টি আমি আগেও বলেছি, বাজারে কিছু অনিশ্চয়তা দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে এটাও শোনা যাচ্ছে, কোনো কোনো কোম্পানি বাজার ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। এলপিজি একটা কমোডিটি পণ্য। এর পেছনে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। এলপিজি সিলিন্ডারের খরচ অনেক বেশি, তাছাড়া এটা চলমান ব্যবসা। ফলে মানসম্পন্ন পরিষেবা দেয়ার পাশাপাশি সময়ে সময়ে বিনিয়োগ করতে হবে। 

এলপিজি বাজারে নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলো স্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রচারণা চালায়। আপনারা নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রসারে কী করছেন?

আমার ধারণা সেদিক থেকে আমাদের অবস্থান ভালো। আমরা আমাদের শেয়ারহোল্ডারদের থেকে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমরা সমাজে ব্র্যান্ড সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগ করেছি। সেক্ষেত্রে আমরা স্পন্সরশিপ ও প্রকল্প নিয়ে আরো বেশি সিলেকটিভ হওয়ার চেষ্টা করছি।

আমাদের কিছু তথ্যপূর্ণ ভিডিও আছে। রমজান মাস ও ক্রিকেট বিশ্বকাপে কিছু টিভি স্পন্সরশিপ আছে।এছাড়া আমাদের নিরাপত্তা ক্যাম্পেইন আছে, যা এখন জারি আছে; কারণ সবার আগে চাই নিরাপত্তা। সর্বশেষ আমরা এর মধ্যেই জিঙ্গেল ভিডিও নিয়ে এসেছি। এ জিঙ্গেলটি তুরস্কের আইগ্যাসের সিগনেচার হিসেবে কাজ করে। সেটাকে আমরা স্থানীয় লিরিক, সংগীতায়োজন ও ভিডিওর মধ্য দিয়ে অভিযোজন করে নিয়েছি। আমরা সবসময়ই আমাদের ব্র্যান্ডের স্বীকৃতি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তৎপর।

সম্প্রতি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। আপনারা কি নিরাপত্তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন? কিংবা এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন? 

হ্যাঁ। যখন আমরা বাজারে প্রবেশ করি, তখন থেকেই আমরা কাভার ব্যবহার শুরু করি। এর কারণে সিলিন্ডার নিরাপদ উপায়ে পূর্ণ হয়। তারপর আইগ্যাস ইউনাইটেডের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে আপনার বাসায় সেই স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। বাংলাদেশের বাজারে আমাদের আরো দুটি নতুন প্রয়োগ আছে। একটা হলো সিলিন্ডার ইনফরমেশন কার্ড, যেখানে সিলিন্ডারের সামগ্রিক জরুরি তথ্য থাকবে। এটা এজন্য জরুরি যে আপনাকে সিলিন্ডারকে ১২ কেজি দিয়েই পূর্ণ করতে হবে। এছাড়া এ কার্ড দিয়েই পাওয়া যাবে নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য। দ্বিতীয় পদক্ষেপটি হলো সিলিন্ডারের ওপরে বারকোড। বিভিন্ন সময়ে সিলিন্ডার মেরামতের মতো বিষয়গুলোয় বারডকোড অনুসরণ করা হয়। 

আইগ্যাসের জন্য এলপিজি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ৬৩ বছরের। ফলে আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য এ ব্যবহারিক দিকগুলো খুবই জরুরি। এটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে কেবল আর্থিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত হবে না। আমার কাছে ব্যবহারিক জ্ঞান সরবরাহ করাটা আর্থিক বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাছে তুরস্ক থেকে আসা টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে, যাদের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ১০ বছর। 

এলপি গ্যাসের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বাজেটে সহযোগিতার প্রয়োজন আছে?

এলপিজি ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাঁচামাল আমদানি অনেকটা সাধারণ বিষয়। আমরা এলপিজি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করি। সেক্ষেত্রে আমরা গ্রাহকদের জন্য গুণগত মানের নিশ্চয়তা নিয়েই কাজ করি। তবে দেশের ডলারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এলসি খোলা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। আশা করি, আগামী দিনগুলোয় এটার সহজীকরণ হবে। 

খাতের সম্প্রসারণের জন্য সরকার কি আলাদা করে ভর্তুকি কিংবা ইনসেনটিভের মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দ রাখতে পারে?

অবশ্যই রাখতে হবে। এ খাতের উন্নয়নের জন্য সরকার সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখছে। এলপিজি খাতের অনুকূলে কিছু নীতিমালা প্রণয়ন সবার জন্য দিনশেষে উপকারী হয়ে উঠতে পারে। ইনসেনটিভ হিসেবে হোক কিংবা কর ছাড়ের মাধ্যমে। এর ফলে এলপিজির ব্যবহার ত্বরান্বিত হবে। এসএমই ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের উচিত ডিজেলে ও এইচএফওর পরিবর্তে বাল্ক এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহিত করা। বিশেষ করে বায়ুদূষণ কমাতে সেটা জরুরি। আর সেটা অনুধাবন করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দেয়ার ব্যাপারে তৈরি থাকতে হবে। 


আরও