প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশের বাজারে পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের ওপরে। আর এ খাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। যার ৯৮ শতাংশই বিনিয়োগ হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্য দিয়ে এলপি গ্যাসের বাজার শুরু হলে তা প্রসারিত হয়ে এখন শিল্প, ব্যক্তিগত গাড়িতে অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার প্রাক্কালে এ খাতে অবকাঠামো, মজুদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে পাইপলাইনের গ্যাসের মতো সারা দেশে এলপি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব।
এলপিজির বাজার ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, এ খাতে চ্যালেঞ্জসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; ওমেরা সিলিন্ডার্স লিমিটেড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিম চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু তাহের
দেশের বাজারে প্রতি বছর এলপি গ্যাসের চাহিদা ১৪ লাখ টন। এর ৯৫ শতাংশ আবাসিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে শিল্প খাতে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। এ খাতে বাজার গড়ে তুলতে এলপি গ্যাস খাতে লিডার হিসেবে ওমেরা কী করছে?
দেশের বাজারে যেমন এলপিজি চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ওমেরাও ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এলপিজির জোগান নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে ওমেরা ভিএলজিসির (Very Large Gas Carrier) মাধ্যমে একসঙ্গে ৪৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করছে, যা বর্তমান বাজারে এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া শিল্প খাতে এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী অবকাঠামগত উন্নয়ন নিশ্চিত করছে এবং প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলপিজি সরবরাহকে নিশ্চিত করার জন্য ক্রমাগত লজিস্টিকে (উদাহরণস্বরূপ এলপিজি বহনকারী রুট ট্যাংকার, বার্জ ইত্যাদি) বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এলপিজির ব্যবহার আরো সহজ এবং নিরাপদ করার জন্য ওমেরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় রেটিকুলেশন সিস্টেম স্থাপনের পাশাপাশি এলপিজি স্টোরেজ ট্যাংক স্থাপনের জন্য, স্টোরেস ট্যাংক আমদানি থেকে শুরু করে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি ব্যবহারকে নিশ্চিত করবে।
শিল্প খাতে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে কোনো ধরনের উৎসাহ বা সহায়তার প্রয়োজন দেখেন কিনা
শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য জ্বালানি হিসেবে এলপি গ্যাসের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে কিন্তু বিকল্প জ্বালানির সঙ্গে এলপিজির দামের ব্যবধান এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। তাই বিকল্প জ্বালানির সঙ্গে এলপিজির দামকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করার জন্য এর বিক্রি এবং আমদানির পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তাছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজেল, ফার্নেস অয়েলের তুলনায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এলপিজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করার জন্য রেয়াতি হারে করপোরেট কর, কর অবকাশের বিধান এবং আমদানি পর্যায়ে এলপিজি জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির শুল্ক অব্যাহতি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি।
হাউজহোল্ড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, কমার্শিয়াল এবং অটোগ্যাস খাতে ওমেরা এখন মার্কেট লিডার। জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ওমেরা এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা করছে কিনা। যদি করে থাকে সেটা কী ধরনের?
জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ওমেরা স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছে। দেশের প্রতিটি কোনায় এলপিজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে ওমেরা প্রতিনিয়ত বাজারে নতুন সিলিন্ডার প্রবেশ করাচ্ছে যা ওমেরা গ্রুপের নিজস্ব সিলিন্ডার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ওমেরা সিলিন্ডারস লিমিটেডের প্লান্টে সর্বোচ্চ গুণগতমান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রস্তুত করা হয়। এছাড়া যেসব সিলিন্ডারের বয়স ১০ বছর অতিক্রম করেছে সেসব সিলিন্ডারের নিরাপত্তার স্বার্থে ওমেরা সিলিন্ডারস লিমিটেডের নিজস্ব রিফার্বিশমেন্ট প্লান্টে পুনঃপরীক্ষণ শেষে বাজারে পুনরায় প্রেরণ করা হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং অটোগ্যাস খাতে বাল্ক এলপিজির চাহিদা বাড়ায়, ওমেরা ক্রমাগত এর রোড ট্যাংকারের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি এলপিজি সরবরাহ অবকাঠামোকে সমৃদ্ধ করছে। এছাড়া ওমেরা এলপিজি তার নিজস্ব প্লান্টগুলোর স্টোরেজ ট্যাংকের কেপাসিটি বাড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে হাউজহোল্ড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, কমার্শিয়াল এবং অটো গ্যাস খাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে এলপিজির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
গ্রিন ফুয়েল হিসেবে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। অন্যদিকে এলপি গ্যাসের দুর্ঘটনাও বাড়ছে। গ্রাহক সচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওমেরা গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে কী ধরনের কাজ করছে?
ওমেরা ব্যবসার সূচনালগ্নেই এলপিজির নিরাপত্তা এবং এলপিজি বিষয়ে গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে বদ্ধপরিকর। গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে ওমেরা নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করছে। এসব কর্মশালায় এলপিজি গ্যাসের সঠিক ব্যবহার, সিলিন্ডার সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া হয়। ওমেরা বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে (যেমন—ইউটিউব, ফেসবুক, লিংকডিনে) সহজবোধ্য শিক্ষামূলক ভিডিও এবং ইনফোগ্রাফিক্স প্রকাশ করছে, যাতে গ্রাহক সহজেই গ্যাসের ব্যবহার সঠিক পদ্ধতি শিখতে পারে। গ্রাহকের জন্য এলপিজি ব্যবহারের সঠিক নির্দেশিকা ও নিরাপত্তা টিপসসংবলিত লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে, এতে গ্যাস ব্যবহারের সঠিক নিয়মাবলি ও সতর্কমূলক পদক্ষেপগুলো বর্ণনা করা আছে। তাছাড়া ওমেরা সেফটি অডিটের অংশ হিসেবে নিয়মিত গ্রাহককে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ও সরঞ্জাম চেকআপ এবং মেইনটেন্যান্স সেবা প্রদান করছে, যাতে গ্যাস লিক বা অন্য সমস্যাগুলো সময়মতো শনাক্ত ও সমাধান করা যায়। জরুরি প্রয়োজন এবং সাধারণ পরামর্শের জন্য ওমেরা একটি ১৬৭৯৭ হেল্পলাইন চালু করেছে, যেখানে গ্রাহক তাৎক্ষণিক সেবা পাচ্ছেন।
এলপিজি খাতে ২৫টি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে। অপারেটরদের অভিযোগ, ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে এক খাতের ব্যবসা সংকুচিত হচ্ছে, তেমনটি মনে করেন কিনা? বাজারের ছোট কোম্পানির ভবিষ্যৎ কী দেখেন?
বাংলাদেশে এলপিজি হচ্ছে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি পণ্য এবং বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোয় ডলার সংকট এলপিজি ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট ও দেশের অভ্যন্তরে ডলারের অস্থিরতার কারণে অনেক অপারেটর বিগত বছর এবং বর্তমানে এলসির মাধ্যমে এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা এলপিজি ব্যবসার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অটোগ্যাস হিসেবে গাড়িতে এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে না কেন? প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
বাংলাদেশে প্রতিটি সেক্টরের মতো অটোগ্যাস সেক্টরেও এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে অটোগ্যাস সেক্টরে গাড়ি কনভার্সনসহ গাড়িতে এলপিজির ব্যবহার আগের তুলনায় কিছুটা থমকে গেছে। যেহেতু সিএনজি সারা বছর একটি নির্দিষ্ট দামে বিক্রি হচ্ছে আর এলপিজির দাম প্রতি মাসেই পরিবর্তনশীল, যা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের সহজলভ্যতার ওপর। অটোগ্যাসের দাম দিন দিন বাড়ছে, ক্রমাগত অটোগ্যাসের দাম বাড়া এবং প্রতি মাসে দাম পরিবর্তনের কারণেও ব্যবহারকারীরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন, ফলে গাড়ি ব্যবহারকারী গাড়িকে এলপিজিতে কনভার্সনের আগ্রহ হারাচ্ছেন। এছাড়া কনভার্সন কিটের অধিক দাম এবং তা নিম্নমানের হওয়ায় গাড়ি কনভার্সনের হার কমে যাচ্ছে, যা অটোগ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলপিজি স্টেশন মালিক, কনভার্সন সেন্টার, বিভিন্ন রেগুলেটরি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাও অটোগ্যাস বাড়ার অন্তরায় বলে মনে হচ্ছে।