২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে ব্যবহৃত অন্তত ৩০ শতাংশ মোটরযান বিদ্যুচ্চালিত হিসেবে রূপান্তর করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে নীতিমালা। বিদ্যুচ্চালিত মোটরযান নিবন্ধন দেয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে গাড়ি চার্জিং স্টেশন। যদিও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, লক্ষ্য পূরণে সরকারের এ উদ্যোগগুলোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানিতে আরোপিত উচ্চ শুল্কহার। সম্প্রতি ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপন করা তথ্যে দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশে।
আইইবির তথ্যানুযায়ী, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানিতে বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমারে কোনো শুল্ক আদায় করা হয় না। আরেক প্রতিবেশী দেশ নেপালে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানি শুল্কহার ১০ থেকে ৬০ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতে এ শুল্ক ১৫ শতাংশ। তবে স্থানীয় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি উৎপাদন শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষায় আমদানির ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে থাকে দেশটি। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তানে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে একই ধরনের গাড়ির আমদানি শুল্ক ৪০ শতাংশ। আর বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির আমদানি শুল্কহার ৮৯ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রসারে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে শুল্কহার। পরিবেশ দূষণ কমাতে বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেখানে প্রণোদনা, শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ উল্টোপথে হাঁটছে বলে মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে দেশের গাড়ি আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন বলেন, ‘আমার ধারণা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা মনে করেন, শুল্ক কমালে রাজস্ব কমে যাবে। কিন্তু শুল্ক কমালে যে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়বে এবং ব্যবহার বাড়লে যে অধিক হারে রাজস্ব আদায় হবে—এ সত্যটা তারা মানতে চান না। বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রসার সহজ হবে না। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও কিন্তু এখনো সেভাবে এ ধরনের গাড়ির প্রসার হয়নি। বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানি করতে হলে শুল্ক ছাড়ের কোনো বিকল্প নেই।’
বিদ্যুচ্চালিত মোটর নিবন্ধন ও রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দেয়ার জন্য ‘ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল নীতিমালা-২০২৩’ করেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। গণপরিবহন হিসেবে এসব মোটরযান পরিচালনার জন্য বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট নিতে হবে। সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে ফিটনেস সনদ। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন এবং ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা বিদ্যুচ্চালিত মোটরযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ইলেকট্রিক মোটরযানের লাইফটাইম কত হবে, তা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। লাইফটাইম শেষ হলে সেই মোটরযানের নিবন্ধন বাতিল ও স্ক্র্যাপ করা হবে।
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপের বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুল্ক আরোপের বিষয়গুলো মহাসড়ক বিভাগের আওতাভুক্ত নয়। কেন এত শুল্ক আদায় হচ্ছে এ বিষয়ে এনবিআর ভালো বলতে পারবে। তার পরও আমরা আমাদের মতো করে বিষয়টি জানার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করব।’
অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৬টি চার্জিং স্টেশন করা হয়েছে। আরো কয়েকটি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। কিন্তু এগুলোর কোনো চাহিদা নেই। সমস্যা দুই দিকে। একটা হলো চার্জিং স্টেশনের অপ্রতুলতা ছিল বলে আসেনি। এখন আমরা চার্জিং স্টেশন করছি। কিন্তু সেভাবে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা আশা করছি এটা বাড়বে। আমরা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি চার্জিং নীতিমালা করেছি ২০২২ সালে। এর এক বছর পর বিআরটিএ গাড়ি নিবন্ধন দেয়া শুরু করেছে। এখান থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির প্রসারে আমরা এগিয়ে আছি। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’