বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিস্কা
ওনসর্গ বলেছেন, বাংলাদেশী তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের উন্নতি হয়েছে এবং ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি
খাতের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু বাণিজ্য বলতে সামগ্রিকভাবে অনেক কিছু বোঝায় যার মধ্যে
এ খাতগুলোর বাইরের অনেক কিছুও পরে। বাণিজ্যে অতি প্রতিবন্ধকতা দিয়ে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি
ও কর্মসংস্থানের পথকে শ্বাসরোধ করছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং বিশ্বব্যাংক
যৌথভাবে বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল)"‘দক্ষিণ এশিয়ায় কি কর্মসংস্থানহীন উন্নয়ন হচ্ছে?’
শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। রাজধানী ঢাকার মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন অডিটোরিয়ামে
সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৪ এর ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে
আয়োজিত এ প্যানেল আলোচনায় মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া
অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিস্কা ওনসর্গ। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি
ফর উইমেনের ভাইস চ্যান্সেলর ড. রুবানা হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের
অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়েমা হক বিদিশা এবং বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের
জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্নার্ড হ্যাভেন।
প্রতিবেদনে ড. ফ্রানজিস্কা ওনসর্গ দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির
পথে বাধা এবং এ বাধাগুলো দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা তুলে ধরেন। অন্যান্য উদীয়মান
বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ভালো,
তবে তার অনেকটাই ভারতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং পাবলিক সেক্টরের ওপর অতি নির্ভরতার
কারণে, যা অন্যান্য উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় বেশি।৷ তিনি উল্লেখ
করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে; বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের
তুলনায় অনেক কম। জিডিপিতে এর অবদান অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক কম। তিনি
বলেন, উন্মুক্ত বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার উপস্থাপনা দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য-জিডিপি অনুপাত
অনেক কম। বাংলাদেশী তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের উন্নতি হয়েছে, এবং ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি
খাতের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু বাণিজ্য বলতে সামগ্রিকভাবে অনেক কিছু বোঝায় যার মধ্যে
এ খাতগুলোর বাইরের অনেক কিছুও পরে। বাণিজ্যে অতি প্রতিবন্ধকতা দিয়ে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি
ও কর্মসংস্থানের পথকে শ্বাসরোধ করছে।"
ড. ফ্রানজিস্কা মন্তব্য করেন যে নাজুক রিজার্ভ নতুন করে বৈদেশিক মুদ্রার
চাপের সম্মুখীন করতে পারে৷। তিনি বলেন, ‘যখন মুদ্রা সংকট দেখা দেয়, প্রথম এক থেকে
দুই মাসে বিনিময় হার ৫০ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়। এ অবমূল্যায়নের ফলে ঋণ গ্রহণের খরচ
এবং প্রকৃত আয়ের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টি হয়, যা মুদ্রা সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাবকে
নির্দেশ করে।’
তার উপস্থাপনার আরেকটি দিক হলো যে, ফার্মগুলোর তুলনায় বসতবাড়ির জলবায়ু
অভিযোজন কৌশল কম কার্যকর। কৃষকরা কৃষি খাত থেকে অকৃষিতে অভিযোজন কৌশল হিসেবে অভিবাসন
করছে, কিন্তু অ-কৃষি খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। শুধুমাত্র ন্যূনতম
কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত নয়; ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কর্মসংস্থান
সে অনুসারে বাড়াতে হবে। উল্লেখ্য যে দক্ষিণ এশিয়ায় পুরুষ শ্রমশক্তির তুলনায় নারী
শ্রমশক্তি অর্ধেক এবং সামগ্রিকভাবে নারী কর্মসংস্থানের অনুপাত অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির
তুলনায় অনেক কম, কিন্তু একটি অভিনব তথ্য হলো পুরুষ কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়া।
ড. সায়েমা হক বিদিশা কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ওপর জোর দেন। ড. ফ্রানজিসকার এক প্রশ্নের উত্তরে ড. বিদিশা কর্মক্ষেত্রে
নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের অনুপাতের বৈষম্য তুলে ধরে বলেন,"বাংলাদেশে ২০১৭ থেকে
২০২২ সাল পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণের অনুপাত সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যদিকে
নারীদের জন্য যদিও এটি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাদের এখনো বিশাল
ব্যবধান রয়ে গেছে। এ বিষয়ে তিনি নারী শ্রমশক্তির কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের পরিবর্তনশীল
প্রবণতা তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে গ্রামীণ এলাকায় নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের
পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও শহুরে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প রূপান্তরিত হওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি এ সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণের
একটি ক্রমহ্রাসমান চিত্র তুলে ধরেন এবং এর জন্য তিনি স্বয়ংক্রিয়তা এবং চতুর্থ শিল্প
বিপ্লবকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তৈরি পোশাক শিল্পের এ প্রবণতাকে তিনি ডিফেমিনাইজেশন
বলে অভিহিত করেন। ড. বিদিশা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টিকারী
সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর রূপরেখা তুলে ধরার মাধ্যমে সবাইকে শুধুমাত্র সংখ্যা
বাড়ানোর পরিবর্তে গুণগত বৃদ্ধির দিকে পরিবর্তনের জন্য আহ্বান জানান।
বার্নার্ড হ্যাভেন বিগত ১ দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির
পাশাপাশি বিদেশগামী শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি
বাংলাদেশের জন্য তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার তুলে ধরেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গুণগত মানসম্পন্ন
কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে কর্মশক্তিতে একীভূত করা। বার্নার্ড
হ্যাভেন সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির আন্তঃনির্ভরতার ওপর
জোর দেন, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধি এবং একটি ইতিবাচক ব্যবসায়িক
পরিবেশ তৈরির তাগিদ দেন। তিনি মানবসম্পদে বৃহত্তর বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক উভয়ের জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর গুরুত্বের ওপর জোর
দেন। তিনি বলেন, মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী, একটি শিশুকে পরিপূর্ণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
দিয়ে বড় করা হলে সে যতটা উৎপাদনশীল হতো, বাংলাদেশের একেকটি শিশু তার চেয়ে ৪৬ শতাংশ
কম উৎপাদনশীল হয়। এছাড়াও তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার ক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রমশক্তিতে
নারীর অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার জন্য চাইল্ড কেয়ার সুবিধা বাড়ানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস
এবং সামাজিক সুরক্ষা জাল প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ড. রুবানা হক বলেন,"ভালো চাকরি এবং আরএমজি সেক্টরে আপস্কিলিং
এবং রিস্কিলিং উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি রয়েছে। একই ধরনের সেমিনার, আলোচনার
অনেক আয়োজন করা হচ্ছে, কিন্তু কেউ নীতি পরিবর্তন করছে না। তিনি মন্তব্য করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর
একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে যদি আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা
করি। তিনি আরএমজি ক্রেতাদের দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়ে আরো বলেন,"প্রচেষ্টা
সত্ত্বেও আমরা নিজেদের কম দামের দুষ্টচক্রের ফাঁদে ফেলেছি।" তিনি ইন্ডাস্ট্রি
ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কথা তুলে ধরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও
গণিত শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় তিনি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত
করার আহ্বান জানান।
অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্য রাখেন ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, দক্ষিণ
এশিয়ায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি খুব বেশি উৎসাহজনক নয়, যদিও সরকারি
খাতের বিনিয়োগ একটি বড় ভূমিকা পালন করে যা উদ্বেগের কারণ। শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষ
উভয়েরই কর্মসংস্থান অনুপাত কমেছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করেন তিনি।
বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের জন্য আসন্ন বাজেটে সবচেয়ে জরুরি বিষয়
হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তিনি বর্তমান শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়
মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নীতি সংস্কারের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আরো ভালো সামাজিক
সুরক্ষা প্রদানের জন্য সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা এবং দক্ষ কর সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ওপর
জোর দেন।