জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চীনা প্রযুক্তিপণ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চীনও তার দেশে ব্যবসা করা বিদেশী কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে ওই কোম্পানিগুলো একধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছে। ইউরোপীয় ব্যবসায়ীক গোষ্ঠী সম্প্রতি জানিয়েছে, চীনে ব্যবসা করা যেকোনো বিদেশী কোম্পানির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গতকাল এক প্রতিবেদনে এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা। খবর এপি নিউজ।
চীনে অবস্থিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চেম্বার অব কমার্সের দীর্ঘ ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনিশ্চয়তা দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এ উদ্বেগ মোকাবেলায় চীনা নেতাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
চেম্বার অব কমার্স ও চায়না ম্যাক্রো গ্রুপের করা এ জরিপে চীনে কর্মরত ইউরোপীয় ও মার্কিন সংস্থাগুলোর দাবি উদ্বেগের প্রতিধ্বনি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিদেশী কোম্পানিগুলো নিজেদের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করায় চীনে বিদেশী বিনিয়োগ এক বছর আগের তুলনায় গত বছর ৮ শতাংশ কমেছে।
ইইউ চেম্বারের কর্মকর্তারা বলেছেন, চীনের পরিবর্তিত ব্যবসায়িক পরিবেশ অনুকূল নয়। কারণ ইউরোপ বা আমেরিকা মূলত ছিল চীনা পণ্য আমদানিনির্ভর। সেই অবস্থান থেকে ক্রমে পশ্চিমা দেশগুলো সরে আসছে। তারা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এসব পণ্য উৎপাদনে ঝুঁকছে। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারীর সময় সরবরাহ চেইন বন্ধ হওয়ার পর নীতিনির্ধারকরা এসব নিয়ে ভাবতে বাধ্য হন। এভাবে ইউরোপ ও আমেরিকা আমদানি থেকে সরে উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছে।
চীন বিদেশী কোম্পানি ও বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করার ওপর জোর দেয়ার চেষ্টা করেছে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সম্প্রতি জানিয়েছেন, বাণিজ্য বাধা দূর করে বিদেশীদের উৎপাদনের শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করছে বেইজিং।
আরো বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গত জুলাইয়ে ঘোষিত একটি কর্মপরিকল্পনার আপডেট সংস্করণ প্রকাশ করেছে চীনের স্টেট কাউন্সিল ও মন্ত্রিসভা। এতে উচ্চ প্রযুক্তিগত খাত যেমন কম্পিউটার চিপ, বায়োফার্মাসিউটিক্যালস ও উন্নত সরঞ্জামগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেয়া হয়েছে।
নতুন সংস্করণের কর্মপরিকল্পনায় শুল্কছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে এবং বিদেশী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক কার্যক্রম বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে চীনা কর্তৃপক্ষ উন্মুক্ত সুযোগের কথা বললেও বিপরীত চিত্র রয়েছে বলে অভিযোগ বিদেশী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের। তারা বলছেন, চীনে ভিনদেশী ব্যবসার ওপর অব্যাহত অভিযান, দেশটির অস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় গোপনীয় আইন ও তথ্যসংক্রান্ত কঠোর নিয়ম-কানুন অনেক বিদেশী ব্যবসায়ীর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে এক ব্রিফিংয়ে চীনে অবস্থিত ইউরোপীয় চেম্বারের প্রেসিডেন্ট জেনস এসকেলুন্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঝুঁকির পরিধি ও তীব্রতা দ্রুতগতিতে বেড়েছে, যা বিদেশী কোম্পানিগুলোকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।’
একই সময়ে বিদেশী ব্যবসায়ীদের উত্থাপন করা অনেকগুলো সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্রয় চুক্তিগুলোয় প্রবেশাধিকার, যা অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর বড় ভূমিকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
চায়না ম্যাক্রো গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কাস হারম্যান চেন বলেন, ‘এ পরিস্থিতি চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কোম্পানি এবং এর গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো তথ্যনিরাপত্তা আইন নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ কোম্পানিগুলো নতুন ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে পারছে না। আমরা মনে করি, এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার।’ এদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলোও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনে অবস্থিত আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান শন স্টেইন সম্প্রতি বলেন, ‘চীন কিছু সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে সব সংকট সমাধান হয়নি।’
সম্প্রতি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বার্ষিক ভোজে অংশ নেয়ার আগে তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী চাইবে উভয় পক্ষ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং এটি কীভাবে নির্ধারণ করা হয় সে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হোক। কারণ ব্যবসায়ীদের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।