পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক

বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় উল্লেখ করার মতো তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কভিড-১৯ মহামারীসহ দেশের সংকটকালে আমাদের এ অক্ষমতাগুলো আরো বেশি নজরে আসে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সুশিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন

বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় উল্লেখ করার মতো তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। কভিড-১৯ মহামারীসহ দেশের সংকটকালে আমাদের এ অক্ষমতাগুলো আরো বেশি নজরে আসে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সুশিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে দক্ষ শিক্ষক লাগবে এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। 

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জনগণের প্রতি দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে একজন শিক্ষার্থী পরিণত বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। জ্ঞান, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, সৃজনশীলতাসহ মানবিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটাতেও ভূমিকা রাখেন শিক্ষকরা। তাই উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ সবদিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও নানা অনিয়ম অগ্রহণযোগ্য। বর্তমানে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে, যা কাম্য নয়। এসব অনিয়ম বন্ধ করে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ (ইউজিসি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, শিক্ষক-কর্মকর্তাসহ মোট ৫৮টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া গত ২ ডিসেম্বর সম্পন্ন করেছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন উপাচার্যের ছেলে রয়েছেন। এ নিয়োগে যোগ্যতা নিরূপণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি। এ বিষয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগও করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে ইউজিসি। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও। 

জ্ঞান সৃষ্টিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেমন অবদান রাখছে তার বড় একটি মাপকাঠি হলো গবেষণা। কিন্তু এখন সেদিকে নজর কম দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদধারীরা নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে ও নিজের স্বার্থকে চরিতার্থ করতে নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড জাতিকে বিব্রত করছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের রক্ষক হলেও আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে শিক্ষক ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও অনুগত কিংবা আত্মীয়দের শিথিল করা হচ্ছে নিয়োগ ও পদোন্নতির শর্ত, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় মেনে নেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ দেশের প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুকরণীয় হওয়ার কথা। কিন্তু তা আমরা করতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ কারণে বিশ্বের হাজার উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলো শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রশ্নে অনড়। প্রতিবেশী দেশ ভারত শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেয় না। বিভাগ কিংবা ডিসিপ্লিনে যোগ্যতাসম্পন্নরাই নিয়োগ পান। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারা নিয়োগ দেন না। এছাড়া অধিকাংশ দেশেই শিক্ষক হতে হলে ন্যূনতম পিএইচডি ডিগ্রি থাকা লাগে। শিক্ষা ও গবেষণার মান ঠিক রাখতে তাদের সময়ে সময়ে মূল্যায়ন করা হয়। এসব দেশের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতার তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। 

কর্মক্ষম ও উন্নত জাতি গঠন করতে হলে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতার আওতায় আনাও জরুরি। স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও শর্ত আরো উন্নত করা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে তা অবনমিতও করা হয়েছে।

দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালা প্রণীত ও কার্যকর করা দরকার বলেও মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। বিশ্বমঞ্চে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়াতে হলে শিক্ষক নিয়োগের প্রাথমিক ধাপেই সর্বোত্তম প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একটি সাধারণ চিত্র হচ্ছে শিক্ষক হওয়ার পর অনেকেই পড়াশোনা ও গবেষণা ছেড়ে দেন। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি ও সহজ পদোন্নতি কাঠামোর কারণে এমন হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

কোনো বিভাগ বা ডিসিপ্লিনে শিক্ষক হতে হলে বৈশ্বিকভাবে যে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সে পদ্ধতি অনুসরণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে। ইউজিসিরও দায়িত্ব অনেক। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত বিশ্বে উন্নীত হতে হলে প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো কিংবা তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষা খাতকে। এক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া সহজ হয়ে পড়ায় শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণায় উৎসাহ কমেছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন গবেষণায় বরাদ্দ কমিয়ে অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করছে বেশি। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৪-তে দাঁড়িয়েছে। এখন আমরা কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় করতেই পারি। সামনের দশকগুলোয় বাংলাদেশ অর্থনীতি ও রাজনীতির দিক থেকে আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গবেষণায় মনোযোগ দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। দেশের প্রধান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ঘটানো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে অবস্থান দেখে আমরা এ কথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্য অর্জন হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানের উত্তরণ ঘটিয়ে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে একটা সম্মানজনক পর্যায়ে স্থান করে নিতে হলে আমাদের সত্যিই অনেক দূর যেতে হবে। এক্ষেত্রে সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, যোগ্যতা ও চাকরির শর্তগুলো বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে তৈরি করা প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বেতন কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারকে বিষয়টি অনুধাবন করে তা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগের উদ্দেশ্যে একটি ‘‌স্বতন্ত্র নিয়োগ কমিশন’ গঠনের কথাও বলছেন শিক্ষবিদরা। এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। 


আরও