২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কুইক রেন্টাল ও অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ফেজ আউট বা বন্ধের প্রস্তাব করেছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সেই সঙ্গে দেশের উপকূলীয় এলাকায় জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প বাতিল করে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে গতকাল আয়োজিত এক সেমিনারে সংস্থাটির এসব প্রস্তাব উঠে আসে। ‘বাংলাদেশে জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ: একটি নাগরিক ইশতেহার’ শীর্ষক ওই সেমিনারে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
প্রস্তাবগুলো তুলে ধরে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো উচিত। এজন্য ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে সরকার কিছু কিছু উদ্যোগ নিতে পারে।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালকের বক্তব্যে উঠে আসা স্বল্পমেয়াদি বা আগামী জুনের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে জ্বালানির চাহিদা পূর্বাভাস সংশোধন করা, স্থানীয় মুদ্রায় জ্বালানির মূল্য পরিশোধ, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা, সোলারসামগ্রীতে শুল্ক হ্রাস, বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো ইত্যাদি।
মধ্যমেয়াদি বা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছেকুইক রেন্টাল ও অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে ফেজ আউট করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা, অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাসহ সমন্বিত জ্বালানিনীতি গ্রহণ করা, প্রকৌশলীদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা, পাওয়ার প্লান্ট ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল ইত্যাদি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনায় ২০৫০ সাল নাগাদ ১৭৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এ বিনিয়োগের বড় অংশই ব্যয় হবে এলএনজি-ভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ অথবা এলপিজি অবকাঠামোয় বিনিয়োগে। এছাড়া কিছুটা বিনিয়োগ হবে পরিবহন খাতে। জ্বালানি রূপান্তরের দিক থেকে বিবেচনা করলে সরকারের এসব নীতিমালায় আরো পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালে ৪১ শতাংশ সক্ষমতা অব্যবহৃত ছিল। এগুলো যথাযথ উপায়ে ব্যবহার করতে না পারায় অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। অর্থের সংস্থান করতে মোটা সুদে অর্থ ধার করতে হচ্ছে।’
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তানভীর শাকিল জয়। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি এখন অন্ন-বস্ত্রের মতো প্রধান বিষয় হয়ে গেছে। দিন শেষে রাজনীতিবিদদের কাছে জনগণের চাওয়াটাই মুখ্য। আওয়ামী লীগ যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে, তখন বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকটা যুদ্ধাবস্থার মতো ছিল। নির্বাচনী এলাকায় গেলেই হাজার হাজার মানুষ ভিড় করতে বিদ্যুতের দাবিতে। এখন একজনও আর আসে না। কিছু ভুল থাকতে পারে। তখন এটি দরকার ছিল। কারণ জনগণ চায় বিদ্যুৎ। আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেই যেতে হবে। আমরা সেদিকেই যাচ্ছি।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমরা যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, প্রথমেই আমাদের পরিষ্কার হতে হবে আমরা আসলে কী করতে চাই। কীভাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমাদের স্বল্পমেয়াদি চাহিদার প্রাক্কলন হওয়া দরকার। দীর্ঘমেয়াদে কী হবে সেটি এখন জরুরি না।’
সেমিনারে বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দিচ্ছে না এমনটি নয়। এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে একেবারে বের হয়ে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই অন্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে।’
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য রাখেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাবি অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম, বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী, অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবুল কালাম আজাদ, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম প্রমুখ।