বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। দেশে শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটেছে। এর অংশ হিসেবে অনেক নারীই তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে প্রবেশ করেছে। কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও অবদান বাড়ছে। বর্তমানে তারা চাষাবাদ থেকে শুরু করে ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনকাজেও অংশ নিচ্ছে। বেশকিছু পরিপ্রেক্ষিত ও কার্যকরণের ধারাবাহিকতায়, যেমন ভূমিহীনতা, অলাভজনক কৃষি, পুরুষ সদস্যদের শহরমুখী বা বিদেশগামিতা ইত্যাদি কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারী ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে, হাল ধরেছে গ্রামীণ কৃষির।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। গ্রামীণ নারীরাই দেশের গবাদি পশু ও পোলট্রির সম্প্রসারণ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮৮ দশমিক ২ ও পুরুষের মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। এদিকে এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তারা মালিকানায় পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বড় আকারের গবাদি পশুর (গরু-মহিষ) ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মালিকানাই রয়েছে পুরুষের হাতে আর নারীর মালিকানায় রয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আবার ছোট গবাদি পশুর (ছাগল-ভেড়া) ক্ষেত্রে পুরুষের মালিকানায় আছে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ আর নারীর মালিকানায় আছে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে হাঁস-মুরগির ক্ষেত্রে নারীর মালিকানা ৮৩ দশমিক ৮ ও পুরুষের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
শুধু দেশের প্রাণিসম্পদ খাতেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়েনি। কৃষি খাতেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানেও তা ওঠে এসেছে। কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী, এখনো বাংলাদেশে মোট ৯৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ পরিবার গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। যার মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ কৃষি পরিবার। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বৃহত্তর কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমে বাড়ছে। জাতীয় জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, গত ৪৭ বছরে কৃষিতে নারীর সংখ্যা শতকের ঘর থেকে কোটিতে পৌঁছে গেছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুসারে, কৃষিতে নারীর সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত (১৫ ও তদূর্ধ্ব বয়সী)। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। মোট কর্মজীবী নারীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত, যেখানে মোট কর্মজীবী পুরুষের ৩২ দশমিক ২ শতাংশ কৃষিজীবী।
কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে কিন্তু কৃষক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি না থাকায় চারটি ক্ষেত্রে তারা প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, দ্বিতীয়ত খাসজমি লিজ না পাওয়া, তৃতীয়ত সরকারি প্রণোদনা এবং চতুর্থত যথাযথ মজুরি না পাওয়া। দেশের জিডিপিতে বর্তমানে নারীর অবদান ২০ ভাগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর গৃহস্থালি ও অবৈতনিক কৃষিকাজের আনুমানিক মূল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা। এ হিসেবে জিডিপিতে নারীর অবদান হওয়ার কথা ৪৮ ভাগ। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান করা হয়নি। নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হলে নারীর অবমূল্যায়িত কাজ জাতীয় অর্থনীতিতে গণনা করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৮ সালের তথ্যমতে, নারীপ্রধান পরিবারে তুলনামূলকভাবে দারিদ্র্যের হার কম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, দেশে আড়াই কোটির বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে, যার ৬০ শতাংশই নারী। তবে নারীদের সক্রিয়ভাবে কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত করলে অপুষ্টি কমবে ১২-১৭ শতাংশ। এদিকে ইউএন উইমেনের তথ্য বলছে, পর্যাপ্ত সুযোগ ও প্রযুক্তিগত বাধা দূর করতে পারলে নারীর মাধ্যমে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় কৃষিজমির মালিকানা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষের হাতে। দেশের কৃষকদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যার তথ্য থাকলেও কিষাণীদের কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যার তথ্য নেই। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের মাধ্যমে কৃষক কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষিজমিতে নারীদের মালিকানা না থাকায় তারা সেটি থেকে বঞ্চিত।
নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে তারা অর্থনীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়। নারীদের মজুরিবৈষম্য কমিয়ে আনতে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। নারীদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে তাদের মালিকানার আওতায় আনা দরকার।
সময়ের প্রয়োজনেই নারীরা সংসারের হাল ধরে এবং কৃষি ও প্রাণিজ সম্পদ খাতে অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। তৈরি পোশাক খাত, ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন শিল্প খাতেও নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই ভিত্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাক খাতে নারীদের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবেও তারা এখন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও প্রাণিজ সম্পদ খাতে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের সহজ শর্তে প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যবস্থা করলে তারা গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল করতে ভূমিকা রাখতে পারবে। বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার ঋণ পরিশোধের উপাত্ত খতিয়ে দেখলে আমরা দেখব যে তাদের পরিশোধের হার বেশি। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের বরাতে জানা গেছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৯৯ শতাংশই ফেরত আসে। করোনা মহামারীর সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়ায় অনেকেই খেলাপি হয়েছেন। কিন্তু মহামারীর আগের সময়ের চিত্র বেশ ইতিবাচক। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে গ্রামগঞ্জের আনাচে-কানাচে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ৪৯৬টি ক্ষুদ্রঋণ দানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২১ হাজার ৪০টি শাখা স্থাপন হয়। সদস্য সংগঠিত করে ক্ষুদ্র আর্থিক সেবায় আনা হয় প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ পরিবারকে। এদের মধ্যে ৯৬ শতাংশই ছিল মহিলা। প্রতি বছর ঋণ বিতরণ হয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার মতো। ঋণ আদায়ের হার ছিল ৯৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে।
সহজ শর্তে ঋণদানের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবেও গড়ে তোলার অনেক সুযোগ রয়েছে। সংসারে উন্নতি আনতে এবং সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে নারীরা সহজাতভাবেই নতুন কিছু শিখতে এবং আয়ের বিকল্প পথ অনুসন্ধান করতে চায়। পুরুষদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে কিংবা শহরে গমন করায় গ্রামে নারীরাই কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নারীদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান দেয়ার পাশাপাশি তাদের বিকাশের পথ মসৃণ করতে এগিয়ে আসতে হবে। নারীরা তাদের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারলে আমাদের অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা আরো বাড়বে। দারিদ্র্য কমবে এবং মাথাপিছু আয় বাড়বে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হতে গেলে দেশের অর্ধেক জনশক্তিকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে।