এখন পর্যন্ত জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে ২২ পণ্য, আবেদন রয়েছে ১৪টির

দেশে প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি শাড়ি, ২০১৬ সালে। আর সর্বশেষ গতকাল টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্বের ঘোষণা দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করেছে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। এর মধ্য দিয়ে দেশে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যের সংখ্যা দাঁড়াল ২২-এ। এছাড়া জিআই সনদের জন্য ডিপিডিটিতে আবেদন জমা রয়েছে আরো ১৪ পণ্যের।

দেশে প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি শাড়ি, ২০১৬ সালে। আর সর্বশেষ গতকাল টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্বের ঘোষণা দিয়ে জার্নাল প্রকাশ করেছে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। এর মধ্য দিয়ে দেশে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া পণ্যের সংখ্যা দাঁড়াল ২২-এ। এছাড়া জিআই সনদের জন্য ডিপিডিটিতে আবেদন জমা রয়েছে আরো ১৪ পণ্যের। 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৌলিক পণ্যগুলোর জিআই স্বত্ব নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৫ সালে প্রথম জামদানি শাড়ির জিআই স্বত্বের আবেদন জানায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও দুটি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদনের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে দেশের প্রথম জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায় জামদানি শাড়ি। 

এরপর একে একে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাতি আম, বিজয়পুরের সাদামাটি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ, বাংলাদেশের কালিজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহীর সিল্ক, ঢাকার মসলিন, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাংলাদেশের শীতলপাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলসীমালা চাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ীর চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা ও সর্বশেষ টাঙ্গাইল শাড়ি। 

এসব পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম ও গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন ডিপিডিটির কর্মকর্তারা। সংস্থাটির পরিচালক ড. কায়সার মুহাম্মদ মঈনুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি প্রদানে আমরা আনন্দিত। এখন জামালপুরের নকশিকাঁথা, নরসিংদীর লটকনসহ আরো কিছু জিআই সনদ প্রদানে আমরা কাজ করছি। আমাদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে যে প্রতিটি জেলা থেকে একটি করে জিআই পণ্য নির্ধারণ করতে হবে। আগেও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আমরা কাজ করেছি। এ নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোয় ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপ করব।’ 

বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত জিআই পণ্য জামদানি শাড়ির বুনন হয় শুধু নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, তারাব ও সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলায়। এক সময় মোগল রাজদরবারে রাজকীয় পোশাক হিসেবে ব্যবহার হয়েছে জামদানি। এটি বোনা হতো ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় উৎপন্ন কার্পাস তুলায়। ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলের সুতিবস্ত্র গোটা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করলেও এর মধ্যে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে জামদানি। এটিকে ভিন্ন রূপ দিয়েছে এর বৈচিত্র্যময় নকশা, উৎপাদন পদ্ধতি, কারিগরদের শ্রেণী ও সংখ্যা এবং সুতার কাউন্ট ইত্যাদি। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোথাও কারিগরদের পক্ষে জামদানি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘‌জামদানির আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য হলো এর শিল্পীরা সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই। আদিকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকায় জামদানি কারুশিল্পীদের বংশানুক্রমিক বসবাস। জামদানি শিল্পীদের অন্যত্র নিয়ে গিয়ে এটি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি। কারণ এ শিল্প বংশানুক্রমিকভাবে পারিবারিক পরিমণ্ডলে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যেভাবে বিকশিত হয়েছে, তা বিশ্বের আর কোথাও নেই। তাছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীর পানি বাষ্পীভূত যে আর্দ্রতা তৈরি করে, তা জামদানি সুতা প্রস্তুত ও কাপড় বুননের জন্য অনুকূল।’

দেশের আরেক জিআই পণ্য ইলিশ। বিশ্বের মোট ইলিশ আহরণের ৭৫ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। মূলত পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকার প্রধান প্রধান নদ-নদী এবং তৎসংলগ্ন উপকূলীয় ও সামুদ্রিক জলসীমায় সবচেয়ে বেশি ইলিশ আহরণ হয়। এর মধ্যে পদ্মার ইলিশের চাহিদা ও কদর সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ভোক্তাদের কাছে প্রায় সারা বছরই মাছটির ব্যাপক চাহিদা থাকে।

রংপুর জেলার শতরঞ্জির জিআই স্বত্ব চেয়ে ২০১৯ সালে আবেদন করে বিসিক। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও রংপুর এলাকায় শতরঞ্জির প্রচলন ছিল। রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদে এর ব্যাপক কদর ছিল। মোঘল সম্রাট আকবরের দরবারে এ শতরঞ্জি ব্যবহার করা হয়েছে। ত্রিশ দশকের জমিদার-জোতদারদের ভোজের আসন হিসেবে শতরঞ্জির ব্যবহারের কথা শোনা যায়। সে সময়ে শতরঞ্জিকে দেখা হতো আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। ব্রিটিশ শাসনামলে রংপুরের শতরঞ্জি সমগ্র উপমহাদেশের পাশাপাশি রফতানি হয়েছে বার্মা, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে এটি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় ৩৬টি দেশে রফতানি হচ্ছে।

শতরঞ্জি বুননে কোনো ধরনের যন্ত্রের ব্যবহার নেই। শুধু বাঁশ ও রশি দিয়ে মাটির ওপর সুতো দিয়ে টানা প্রস্তুত করে প্রতিটি সুতা গণনা করে হাত দিয়ে নকশা করে শতরঞ্জি তৈরি করা হয়। কোনো জোড়া ছাড়া যেকোনো মাপের শতরঞ্জি তৈরি করা যায়। এর সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব উল্লেখ করার মতো।

দেশে প্রধান খাদ্যশস্য চালের দুটি স্থানীয় জাত এরই মধ্যে জিআই স্বত্ব পেয়েছে। এগুলো হলো কালিজিরা ও কাটারিভোগ। এর মধ্যে কালিজিরা ধান দেখতে কালো বর্ণের। দানার আকৃতি ছোট হওয়ায় একে দেখতে অনেকটা কালিজিরা মসলার মতো দেখায়। বাহ্যিক এ সাদৃশ্যের কারণেই ধানটির নাম কালিজিরা। তবে চালের রঙ সাদা।

কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, কালিজিরা ধানের আদি উৎপত্তিস্থল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। ১৮৭৫ সালে চূড়ান্ত হওয়া উইলিয়াম উইলসন হান্টার সম্পাদিত আ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গলেও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কালিজিরা ধানের চাষাবাদ সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়। 

প্রাচীনকাল থেকে চাষ হয়ে আসছে দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সুগন্ধ। দিনাজপুরের বাইরে দেশের অন্যান্য স্থানে চাষ করে দেখা গেছে এর সুগন্ধি কমে যায়। বিশেষ করে জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার কাটারিভোগ এখন পর্যন্ত সর্বোৎকৃষ্ট বলে স্বীকৃত।

বাংলাদেশের শীতলপাটিকে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আবেদনটিও বিসিকের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। এর মধ্যে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার শীতলপাটি বিশেষভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বালাগঞ্জ উপজেলার গৌরীপুরের শিল্পীদের তৈরি শীতলপাটি ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদেও স্থান পেয়েছিল। বিভিন্ন ডিজাইন এবং বুননের বৈচিত্র্যের জন্য এখানকার শীতলপাটি সর্বত্র সমাদৃত। একসময় এটিকে মসলিন কাপড়ের সঙ্গেও তুলনা করা হতো বলে সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে। বুননের ধরন ও বেতের আকৃতির ভিত্তিতে বালাগঞ্জের শীতলপাটি বিভিন্ন স্থানীয় নামে পরিচিত, যেমন সিকি, আধুলি, টাকা, নয়নতারা, আসমানতারা, জোড়াকে-চিরা ইত্যাদি। 

বাংলাদেশের জিআই পণ্যগুলোর মধ্যে মসলিন গোটা বিশ্বেই কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। ঢাকাই মসলিনকে ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজসিক আভিজাত্যের সাক্ষী হিসেবে। সবচেয়ে সূক্ষ্ম সুতার তৈরি মসলিনের কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। এটি তৈরি হতো উন্নত মানের কার্পাস তুলা দিয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে দামি মসলিন হলো মলবুস খাস ও মলমল খাস মসলিন। এ মসলিন তৈরি হতো সম্রাটের জন্য। এক সময় মসলিন শিল্প বিলুপ্ত হলেও বর্তমানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এটিকে ফিরিয়ে আনার জোর প্রচেষ্টা চলছে। কিছুটা সাফল্যও মিলেছে।

জিআই পণ্যগুলোর তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন টাঙ্গাইল শাড়ি। এর আগে ৩ ফেব্রুয়ারি ‘টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের নয়, দাবি ভারতের’ এমন শিরোনামে বণিক বার্তায় একটি খবর প্রকাশিত হয়। ওই খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসে সরকারের। এ নিয়ে দেশের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্ব বাংলাদেশের বলে জানান। শিল্প সচিব তখন জানিয়েছিলেন বাংলাদেশী জিআই পণ্যের নিবন্ধন পাচ্ছে টাঙ্গাইল শাড়ি। এরপর ডিপিডিটির মহাপরিচালক বরাবর টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক কায়ছারুল ইসলাম ৬ ফেব্রুয়ারি ডিপিডিটি মহাপরিচালক বরাবর টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্বের আবেদন করেন। 

শাড়িটির জিআই সনদ পাওয়া প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি এখন জার্নালে অন্তর্ভুক্ত হলো। এটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের। এ স্বীকৃতি টাঙ্গাইলের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে। এখন পর্যায়ক্রমে যেসব কাজ বাকি, সেগুলো হলো আইডেন্টিটি নোটিফিকেশন হওয়া আর নিবন্ধিত হওয়া। এর সবই হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। এর বাইরেও আমাদের মধুপুরের আনারসের জিআই স্বত্বের জন্য আবেদন আরো দুই মাস আগেই করা আছে। সেটাও হয়তো এ মাসের মধ্যে পেয়ে যাব। এ মাসের মধ্যে আরো দুটি পণ্যের জন্য আবেদন করব। এগুলো হলো জামুর্কির সন্দেশ ও টাঙ্গাইলের কাঁসা-পিতল। এগুলো হয়ে গেলে আমরা শাড়িগুলো নিয়ে আবেদন করব। বালুচুড়ি শাড়ি, খেসা শাড়ি, নিলাম্বরী শাড়ি এ রকম টাঙ্গাইলের বিখ্যাত শাড়িগুলো নিয়ে। এছাড়া উপজেলাভিত্তিক কোনো বিশেষ পণ্য আছে কিনা, সে বিষয়েও খোঁজ দিতে বলেছি।’  

জিআইয়ের আবেদন থেকে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ছয়টি পণ্যের জিআই সনদ দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের আবেদনের ভিত্তিতে। চারটি জিআই সনদ এসেছে ব্যক্তিগত আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আবেদনে পেয়েছে তিনটি। দুটি পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদপ্তরের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে। এছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ফল গবেষণা কেন্দ্র, রাজশাহী, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির বগুড়া শাখার আবেদনের ভিত্তিতে একটি করে পণ্যের জিআই সনদ মিলেছে। এক্ষেত্রে মূলত সরকারি সংস্থাগুলোর আবেদনই বেশি। 

শুধু টাঙ্গাইল শাড়ি নয়, আরো কিছু পণ্যের জিআই স্বত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিমতের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে অন্যতম হলো সুন্দরবনের মধু। সুন্দরবনের ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে অবস্থিত। বর্তমানে বাংলাদেশেও ডিপিডিটিতে সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বত্ব নিয়ে আবেদন করা রয়েছে। 

সব মিলিয়ে জিআই সনদ পাওয়ার জন্য ডিপিডিটিতে ১৪টি পণ্যের আবেদন জমা পড়েছে। এগুলো হলো যশোরের খেজুর গুড়, নরসিংদীর লটকন, অমৃতসাগর কলা, জামালপুরের নকশিকাঁথা, মধুপুরের আনারস, সুন্দরবনের মধু, মৌলভীবাজারের আগর-আতর, রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম, মুক্তাগাছার মণ্ডা, রাজশাহীর মিষ্টিপান, শেরপুরের ছানার পায়েশ, ভোলার মহিষের কাঁচা দুধ, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা এবং নওগাঁর নাগ ফজলি আমের আবেদনের কথা উল্লেখ আছে ডিপিডিটির ওয়েবসাইটে। এছাড়া দিনাজপুরের লিচু রয়েছে আবেদনের প্রক্রিয়ায়। 

যশোরের খেজুর গুড়কে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আবেদনটি করা হয়েছিল স্থানীয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সরকারিভাবে যশোর জেলার ব্র্যান্ড পণ্য ধরা হয় দুটিকে। এর একটি হলো খেজুরের গুড়। পণ্যটি সম্পর্কে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমানে যশোরের খেজুর গুড়ের বাণিজ্য দাড়িয়েছে বছরে প্রায় শতকোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, এ অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দোঁ-আশ। মাটির অম্লত্ব কম, পানিতে লবণাক্ততা নেই এবং এখানে বৃষ্টিপাতের হারও কম। গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। এ কারণে এখানকার খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে। এ রস তৈরি হয় বিখ্যাত ‘‌পাটালি গুড়’, যা যশোর ছাড়া দেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এ গুড়ের বাইরের আবরণ থাকে শক্ত, কিন্তু ভেতরটা গলে যাওয়া মোমের মতো নরম।’

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আবরাউল হাছান মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমরা জেলার খেজুর গুড়ের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য পাঠিয়েছিলাম। মন্ত্রণালয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুমোদন দেবে। তবে ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে কেউ আপত্তি দেয় কিনা। আশা করছি আমরা খেজুর গুড়ের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাব। একই সঙ্গে আমরা গদখালির ফুল ও নকশিকাঁথার জন্যও আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ 

শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে জিআই স্বত্বের প্রক্রিয়াধীন আবেদনগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া আছে। গত সোমবার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক জরুরি সভায় নির্দেশনা জারি করে বলা হয়, ‌টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ছাড়াও মধুপুরের আনারস, নরসিংদীর লটকন, সাগর কলা, ভোলার মহিষের কাঁচা দুধের দই ইত্যাদিসহ জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য যেসব আবেদন অনিষ্পন্ন আছে, তা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দেশের ৬৪টি জেলা থেকে এক বা একাধিক পণ্য বা বস্তু খুঁজে বের করে আবেদন করার জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুরোধ করা হয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর এগুলোকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হবে। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌জিআই স্বত্বের আবেদন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যারা আবেদন করেন প্রথমত তাদের যথাযথভাবে ডকুমেন্টেশনগুলো সম্পন্ন করতে হয়। এক্ষেত্রে অনেকের ঘাটতি থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যারা উৎপাদনকারী বা যে এলাকায় যে পণ্য উৎপাদন হয় সেখানকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই এসব ডকুমেন্টেশনের নিয়মগুলো জানেন না। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা আসার পর আমাদেরকে তাদের এ বিষয়ে সাহায্য করতে হয়। সব নিয়মনীতিগুলো দেখে তাদের বোঝাতে হয়, বলতে হয়, হিয়ারিং দিতে হয়। এসব কারণেই প্রক্রিয়াগুলোকে একটির পর আরেকটি ধরতে হচ্ছে। আমাদের সব জেলা-প্রশাসকদের বলা হয়েছিল স্থানীয় পণ্যগুলোর আবেদন দেয়ার জন্য। এর অনেকগুলো এরই মধ্যে চলে এসেছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘‌কতগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় আঞ্চলিকতার বিষয়টি প্রমাণ হয় না বা প্রমাণ করা যায় না। এ ধরনের আবেদন আবার বাতিলও হয়েছে। পাইপলাইনে বেশকিছু আছে। আমরা ধারাবাহিকতা রেখে একের পর এক পদক্ষেপ নেব। এরই মধ্যে তিন-চারটি জার্নালে প্রকাশের জন্য দিয়ে দিয়েছি। গোপালগঞ্জের রসগোল্লা, নরসিংদীর সাগর কলা, লটকন, যশোরের খেজুরের গুড়—এগুলো পাইপলাইনে আছে। আর টাঙ্গাইল শাড়িটা গতকাল জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। জার্নালে প্রকাশের পর আমাদের দুই মাস সময় দিতে হয়। যদি এ সময়ের মধ্যে কোনো আপত্তি আসে, সেজন্য। এর পরই সার্টিফিকেশন। ডিপিডিটির জনবলের স্বল্পতা আছে, সেজন্য তাদের বিষয়গুলো দেখতে সময় লেগে যাচ্ছে। অধিদপ্তর আরো বড় হলে হয়তো আরো কম সময়ে কাজ করা যেত।’

আরও