এশিয়ায় আট মাসের সর্বোচ্চে জ্বালানি তেল আমদানি

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে নতুন বছরে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি দেখেছে এশিয়া। জানুয়ারিতে আমদানি বেড়ে পৌঁছেছে আট মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে নতুন বছরে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি দেখেছে এশিয়া। জানুয়ারিতে আমদানি বেড়ে পৌঁছেছে আট মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিশ্বের শীর্ষ ক্রেতা দেশ চীন ও ভারত ক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোয় অঞ্চলটির আমদানিতে এমন উল্লম্ফন দেখা গেছে। খবর রয়টার্স। 

এলএসইজি অয়েল রিসার্চের দেয়া তথ্যমতে, জানুয়ারিতে এশিয়ার দেশগুলো সব মিলিয়ে দৈনিক ২ কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। গত ডিসেম্বরে যা ছিল দৈনিক ২ কোটি ৭০ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল। 

বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক দেশ চীন আলোচ্য মাসে দৈনিক ১ কোটি ১৩ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল করে আমদানি করেছে, যা গত ডিসেম্বরের তুলনায় কিছুটা কম। তবে গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় দেশটির আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ওই সময় আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ১ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল।

চীনের পরিশোধন কেন্দ্রগুলো যখন জানুয়ারিতে সরবরাহের জন্য ক্রয়াদেশ দিয়েছিল তখন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক অনেক কম ছিল। বিষয়টি তাদের ব্যাপক মাত্রায় আমদানি বাড়াতে উৎসাহিত করে। চীন গত বছরগুলোয় কয়েক ধাপে আমদানি কোটা ঘোষণা করত। এবার বছরের শুরুতেই এক ধাপেই সব কোটা ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে পরিশোধন কেন্দ্রগুলো কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ আমদানি করতে সক্ষম হয়েছে। 

সাধারণত চীনে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করে সৌদি আরব। কিন্তু বেশ কয়েক মাস ধরেই এ জায়গা দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। জানুয়ারিতেও দেশটি থেকে সর্বাধিক আমদানি করেছে চীন। ট্যাংকার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ১৯ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। অন্যদিকে সৌদি আরব থেকে আমদানি করা হয়েছে দৈনিক ১৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল করে। 

তবে দেশটিতে বাজার হিস্যা পুনরুদ্ধারে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সৌদি আরবও। ডিসেম্বরে দৈনিক ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল করে রফতানি করা হলেও জানুয়ারিতে তা দৈনিক তিন লাখ ব্যারেল করে বেড়েছে। 

সৌদি আরব এশিয়ার ক্রেতাদের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমিয়েছে। দেশটির জ্বালানি তেলের নিজস্ব গ্রেড আরব লাইট ক্রুডের ফেব্রুয়ারি সরবরাহ চুক্তির আনুষ্ঠানিক বিক্রয়মূল্য বা ওএসপি ২৭ মাসের সর্বনিম্নে নেমেছে। দামে এমন নিম্নমুখী প্রবণতার ফলে দেশটি থেকে চলতি মাসে আমদানি আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে খাতসংশ্লিষ্টরা। 

শুধু চীন নয়, বরং এশিয়ার অন্যান্য দেশও সৌদি আরব থেকে সাশ্রয়ী দামের কারণে আমদানি বাড়াচ্ছে। জানুয়ারিতে এ অঞ্চলে আমদানি হয়েছে দৈনিক ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল করে, ডিসেম্বরে যা ছিল দৈনিক ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। 

ব্যাপক মূল্যছাড়ের কারণে ভারত রাশিয়া থেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাপক বাড়িয়েছে। ফলে সৌদি আরব থেকে আমদানি কমে গেছে। তবে লাইট ক্রুডের দাম কমায় ফেব্রুয়ারিতে আবারো দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় পরিশোধন কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা। 

ভারত এশিয়ার দ্বিতীয় শীর্ষ জ্বালানি তেল আমদানিকারক। জানুয়ারিতে দেশটি রেকর্ড আমদানি করেছে। এলএসইজির তথ্যমতে, আলোচ্য মাসে দেশটি দৈনিক ৫৩ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল করে আমদানি করে, ডিসেম্বরে যা ছিল ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। 

গত মাসে ভারতে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে রাশিয়া। দেশটি থেকে আমদানি করা হয় দৈনিক ১৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল করে, আগের মাসে যা ছিল দৈনিক ১৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। অন্যদিকে দৈনিক ১৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল সরবরাহের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ইরাক।

ভারতের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে এগোচ্ছে। এশিয়ার বাজারের মধ্যে দেশটিতে পরিশোধিত জ্বালানির মুনাফা মার্জিন দ্রুত গতিতে বাড়ছে। স্থানীয় ও রফতানি বাজারে ব্যাপক চাহিদার সুবাদে দেশটি আমদানি বাড়াচ্ছে।

লম্বা সময় ধরেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও এর সহযোগী ওপেক প্লাস। উদ্দেশ্য দাম বাড়ানোর মাধ্যমে লোকসান এড়ানো। কিন্তু জোটের বাইরের দেশগুলো থেকে উত্তোলন ও সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানিটির উত্তোলন বাড়াচ্ছে ব্যাপক মাত্রায়। ফলে চলতি বছর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের গড় দাম নিম্নমুখী থাকবে বলে জানিয়েছে বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ।

সিটির গবেষণা বিভাগ সম্প্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের মূল্য পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়েছে। চলতি বছর এটির গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলার ধরা হয়েছে। তবে চলতি বছর বাজার আদর্শটির দাম ৭০ ডলারের নিচে নামবে না বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাছাড়া আগামী বছরের জন্যও পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।

সিটি গ্রুপ এক নোটে জানায়, এ বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়লেও সম্প্রতি কিছু বিষয় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। অনেক শিপিং কোম্পানি আগাম ঝুঁকি মোকাবেলায় এ রুট এড়িয়ে চলছে। এতে কিছু সময়ের জন্য সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। সংঘাত শিথিল হয়ে এলে আবারো সরবরাহ বাড়বে।

এর আগে দেয়া এক পূর্বাভাসে সিটি গ্রুপ জানিয়েছিল, আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ব্রেন্টের গড় দাম নামতে পারে ৭০ ডলারে। নতুন পূর্বাভাসে তা আরো কমানো হয়েছে। ব্যারেলপ্রতি গড় বার্ষিক মূল্য ধরা হয়েছে ৬০ ডলার।

সিটি গ্রুপের বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা না দিলে চলতি বছর নিম্নমুখী চাহিদার বিপরীতে মাত্রাতিরিক্ত সরবরাহের ধারা অব্যাহত থাকবে। জ্বালানি তেলের দামও নিম্নমুখী থাকবে। ফলে ওপেক প্লাস বছরজুড়ে উত্তোলন কমানোর নীতি বহাল রাখবে। তবে আগামী বছর এ নীতি থেকে ধারাবাহিকভাবে সরে আসতে পারে জোটটি।

আরও