ক্যান্সার মানেই মৃত্যু এমন ধারণা সঠিক নয়

ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। অর্থাৎ রোগীর সংস্পর্শে এলে সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। উদাহরণস্বরূপ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও হাঁপানি রোগী থেকে যেমন সুস্থ মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয় না, তেমনি ক্যান্সার রোগীর থেকে অন্যের মাঝে ছড়ায় না। তাই উল্লিখিত রোগগুলোকে অসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। অর্থাৎ রোগীর সংস্পর্শে এলে সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। উদাহরণস্বরূপ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও হাঁপানি রোগী থেকে যেমন সুস্থ মানুষের মাঝে সংক্রমিত হয় না, তেমনি ক্যান্সার রোগীর থেকে অন্যের মাঝে ছড়ায় না। তাই উল্লিখিত রোগগুলোকে অসংক্রামক ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়।

বর্তমানে বিশ্বে অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুহার সংক্রামক ব্যাধিকে ছাড়িয়ে গেছে।  অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার শতকরা ৭০ ভাগ আর ক্যান্সার অসংক্রামক ব্যাধিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর কারণ। অধিকন্তু বিশ্বের শতকরা ৮০ ভাগ অসংক্রামক ব্যাধি দরিদ্র আর স্বল্প উন্নত দেশের মানুষের মাঝে দেখা যায়। অতএব বর্তমান বিশ্বে ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। 

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আর্জন করেছে। আর ২০১৫ সালে ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি  (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস) নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ লক্ষ্য পূরণে অসংক্রামক ব্যাধির মৃত্যুহার ২০৩০ সাল নাগাদ শতকরা ৩০ ভাগে কমিয়ে আনতে হবে। তাই এখন এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে ২০৩০ সাল নাগাদ ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক ব্যাধির মৃত্যুহার শতকরা ৩০ ভাগ কমিয়ে আনা প্রয়োজন।

বিশ্বে প্রতি বছর ২ কোটি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় আর এর অর্ধেক মানে এক কোটি মৃত্যুবরণ করে। ফুসফুস, স্তন, কোলন, রেকটাম আর প্রোস্টেট ক্যান্সারেই বেশি আক্রান্ত হয়। 

গবেষণায় প্রমাণ মেলে, শতকরা ৩০ ভাগ ক্যান্সারের সঙ্গে সরাসরি তামাক সেবনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত ওজন, মদপান, কম ফলমূল-শাকসবজি গ্রহণ, নিয়মিত পরিমিত শরীরচর্চা না করা—এগুলোও ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।

তবে বিশেষ কিছু ক্যান্সার যার সঙ্গে সংক্রামক ব্যাধির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, যেমন—জরায়ুমুখের ক্যান্সার, লিভারের ক্যান্সার। এসব ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব দরিদ্র আর নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় বেশি।

ক্যান্সার মূলত শরীরের কোষের জিনের ত্রুটিজনিত কারণে হয়। এ জিনের পরিবর্তনকে মিউটেশন বলা হয়। এ পরিবর্তনগুলোর জন্য যেসব উপাদান দায়ী তাদের বলা হয় কার্সিনোজেন। এসব উপাদানকে মোটাদাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে :

১।  ভৌতিক কিংবা পদার্থিক  কারণ (Physical carcinogens): বিকিরণ রশ্মি,  সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মি,  এক্স-রে, সিটি স্ক্যান থেকে বের হওয়া রঞ্জনরশ্মি।

২। রাসায়নিক দ্রব্য: তামাক ও তামাকজাতীয় পণ্য উপাদান, অ্যালকোহল কিংবা মদ, খাবারের ছত্রাক (Aflatoxin), ভারী ধাতব পদার্থ যেমন—আর্সেনিক, লেড ও ক্রোমিয়াম।  বিভিন্ন কলকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য।

৩। বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্টরস: হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের জরায়ুমুখের ইনফেকশন, হেপাটাইটিস ভাইরাস, হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি, যা গ্যাস্ট্রিক আলসার করে পরে পাকস্থলীর ক্যান্সার হয় এবং মূত্রথলির ক্যান্সার। 

কেবল তামাকজাতীয় পণ্য বর্জনেই শতকরা ৩০ ভাগ ক্যান্সারের ঝুঁকি কমতে পারে। ক্যান্সার প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য বর্জন, অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিহার, নিয়মিত শরীরচর্চা আর সুন্দর স্বাস্থ্যকর বসবাসের পরিবেশ অপরিহার্য। 

প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা আর সেবার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বলা বাহুল্য, শুরুতে শনাক্ত হলে অনেক ক্যান্সার সম্পূর্ণ নির্মূল করা যায়।  

প্রতিরোধ 

সংক্রামক ব্যাধির মতো ক্যান্সার প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক কিংবা টিকা নেই। তবে হেপাটাইটিস ভ্যাকসিন আর হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের ভ্যাকসিনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ও জরায়ুমুখের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে লিভার আর জরায়ুমুখের ক্যান্সার অনেকাংশে কমানো যায়। 

স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম

রোগ লক্ষণ প্রকাশের আগে সুনির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এসব পরীক্ষা পদ্ধতিকে বলা হয় স্ক্রিনিং। বাংলাদেশে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। বাংলাদেশে এসব ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। এই পরীক্ষা পদ্ধতিগুলো অনেক সাশ্রয়ী। শুরুতে শনাক্ত হলে এসব ক্যান্সার রোগীর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি। 

আরো অনেক ক্যান্সার যেমন—পাকস্থলী, কোলন, মুখগহ্বর ও প্রোস্টেট ক্যান্সার সরকারি স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের মধ্যে নেই। তবে পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে এসব ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের আওতায় আনা যায় আর রোগ লক্ষণ প্রকাশের আগে শনাক্ত করা যায়। কারো সন্দেহ হলে পূর্বসতর্কতা হিসেবে তারা নিজেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আক্রন্তের বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারে।

চিকিৎসা পদ্ধতি

রোগের উৎপত্তি, রোগের পর্যায় আর রোগীর অন্যান্য অবস্থা বিবেচনায়  চিকিৎসার তারতম্য হয়। এমনকি একই ক্যান্সার অবস্থা বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। এ ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির অন্যতম কারণ ক্যান্সার নির্দিষ্ট অঙ্গ থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। 

তাই রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগে দরকার সম্মিলিত ব্যবস্থা যাকে ইংরেজিতে বলে মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ। ক্যান্সার  চিকিৎসায় সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি ও কেমোথেরাপি—তিনটি মৌলিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

রোগের ধরন অনুযায়ী এক রোগীর এক কিংবা একাধিক পদ্ধতি দরকার হতে পারে।  প্রথামিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হলে চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ, সময় কম লাগে আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। ফলে রোগীর নিরাময়ের সুযোগও বেশি থাকে। কিছু  ক্যান্সার যেমন—কোলন, পাকস্থলী ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার কেবল অপারেশনের মাধ্যমে পুরোপুরি সুস্থ করা যায়। আবার  লিম্ফোমা, জার্মসেল ও ব্লাড ক্যান্সার শুধু কেমোথেরাপির মাধ্যমে নিরাময়  করা যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে বর্তমানে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন কেমোথেরাপি,  ইমিউনোথেরাপি, হরমোন থেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি উদ্ভাবন হয়েছে। এসব মলিকুল ক্যান্সার রোগের পর্যায় নির্বিশেষে চিকিৎসা করতে সহজ হচ্ছে।

প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা  

সহজ ভাষায় যখন রোগীকে ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না কেবল রোগীর শারীরিক কষ্ট দূর করতে যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তখন তাকে প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা বলে। এখানে ক্যান্সারের থেকে রোগীর কষ্ট আর উপসর্গ বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় এবং রোগীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কেবল রোগীর  শারীরিক সমস্যা নয় এখানে মানসিক অবস্থা, বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতিও গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই প্যালিয়েটিভ চিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি মনোরোগ চিকিৎসক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, নার্স ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের রোগীর সেবায় নিয়োগ করা হয়।

বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা ও সরকারের সক্ষমতা পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে  প্রায় ১৫ লাখ ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী রয়েছে এবং প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ মানুষ নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। সেই হিসেবে বাংলাদেশে প্রয়োজন ১৬০টি। আমাদের দেশে ৩০টির মতো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের সঙ্গে শতাধিক হাসপাতালে রেডিয়েশন থেরাপি ব্যতিরেকে ক্যান্সারের নিয়মিত অপারেশন ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা হয়ে আসছে। তবে বৃহৎ পরিকল্পনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে এর সমন্বয় ও সম্প্রসারণ দরকার। 

আশার কথা, ক্যান্সারের শতকরা ৯৯ ভাগ ওষুধ এখন দেশেই উৎপাদন হয়। এমনকি দেশের চাহিদা পূরণ করে ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশে রফতানি হয়। অধিকন্তু দেশের ওষুধ মানসম্মত ও সাশ্রয়ী।

ক্যান্সার নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা

১। ব্যক্তির সংস্পর্শে ক্যান্সার অন্যের শরীরে ছড়ায়, এটি মিথ্যা। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়। রোগীর সংস্পর্শে থেকে তাদের যত্ন নিলে কিংবা পরিবারের অন্যের শরীরে ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা নেই। তাই শুরুতে বলেছিলাম, এটি একটি অসংক্রামক ব্যাধি। 

২। ক্যান্সার রোগীর মৃত্যু অবধারিত, এমনটি নয়। অধিকাংশ ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য। ক্যান্সার হলেই তার পরিণতি মৃত্যু নয়। চিকিৎসা না করলে কিংবা গাফিলতির কারণে বর্তমানে ডায়রিয়ায়ও অনেক মানুষ মারা যায়। ক্যান্সার জটিল রোগ হওয়া সত্ত্বেও সময়মতো চিকিৎসা হলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। 

৩। ভেষজ চিকিৎসায় ক্যান্সার ভালো হয়, এটি ভুল ধারণা। ভেষজ চিকিৎসা ক্যান্সার রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরাময় করতে পারে, কিন্তু আসল ক্যান্সার নিরাময় করতে পারে না। তাই কালক্ষেপণ না করে আক্রান্ত ব্যক্তির বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত।  

৪। ক্যান্সার রোগের টিকা, এটি সত্য নয়। ক্যান্সার রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো টিকা এখনো আবিষ্কার হয়নি। এর সম্ভাবনাও কম। কারণ একই ক্যান্সারের বহুবিধ কারণ থাকে। টিকা কিংবা ভ্যাকসিন একটি সুনির্দিষ্ট উপাদানের বিপরীতে কার্যকর হয়। আমরা যেসব টিকা দেখছি তা কিছু সংক্রামক ব্যাধির বিপরীতে ব্যবহার করা হয়। 

৫। পারিবারিক ক্যান্সারের ঝুঁকি: পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে বাকি সদস্যরা আক্রান্ত হবে, এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। শতকরা ৮-১০ ভাগ রেগীর মধ্যে এ সম্পর্ক দেখা যায়। তবে  কিছু সুনির্দিষ্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য।

ক্যান্সার দিবসের এবারের স্লোগান : To close the care gap: ক্যান্সার চিকিৎসায় বৈষম্য দূর করি। তার মানে ক্যান্সার চিকিৎসায় সবাই যেন সমান সুযোগ পায়। সরকার বিদেশী আর্থিক সহায়তা ব্যতিরেকে যেভাবে সহাস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে, তেমনি ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করে এসডিজি অর্জন করতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য দরকার জাতীয় ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। তার আওতায় থাকতে হবে শক্তিশালী সম্প্রসারিত ক্যান্সার রোগ নিরাময় ব্যবস্থা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ক্যান্সার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও