২০১৮ সালে সন্দ্বীপে সাবমেরিন কেবলে বিদ্যুৎ সংযোগ

পাঁচ বছরেও বিদ্যুৎ পাননি ৫০ শতাংশ গ্রাহক, গতি আসেনি স্থানীয় অর্থনীতিতে

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ২০১৮ সালে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। চার লাখ বাসিন্দার এ দ্বীপে গত পাঁচ বছরে ৩৬ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন। তবে এ বিদ্যুৎ দ্বীপের কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি অর্থনীতিতে গতি আনতে পারেনি। বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে এখনো পিছিয়ে আছে দ্বীপ উপজেলাটি।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে ২০১৮ সালে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। চার লাখ বাসিন্দার এ দ্বীপে গত পাঁচ বছরে ৩৬ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন। তবে এ বিদ্যুৎ দ্বীপের কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি অর্থনীতিতে গতি আনতে পারেনি। বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে এখনো পিছিয়ে আছে দ্বীপ উপজেলাটি।

বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পর বাসাবাড়ি ও হাটবাজারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হলেও স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, হালকা প্রকৌশল খাতসহ শিল্পভিত্তিক কোনো কাজে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়নি। এ কারণে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও সন্দ্বীপে দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার মাত্র আট-নয় মেগাওয়াট। যদিও সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে জেনারেটরের মাধ্যমে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত) ১ দশমিক ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হলেও জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ আসার পর সেটি আট-নয় মেগাওয়াটের বেশি উন্নীত হয়নি। বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ প্রকল্প-১-এর আওতায় ৪০০ কিলোমিটার বিভিন্ন ক্যাটাগরির সঞ্চালন লাইন স্থাপন হলেও বর্তমানে দ্বিতীয় প্রকল্পের মাধ্যমে আরো ৩০০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের কাজ চলমান।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, সন্দ্বীপের জনসংখ্যার বড় অংশ প্রবাসী। এ কারণে অধিকাংশ জমিই বর্গা চাষ হয়। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগের পর বেকারি, প্রিন্টিংসহ ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও কর্মসংস্থান তৈরির মতো কোনো বিনিয়োগ হয়নি। বঙ্গোপসাগর মৎস্য আহরণের অন্যতম স্থান হলেও বরফকল কিংবা মৎস্য ও কৃষিজ পণ্য সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর উপকূল থেকে ১৫ কিলোমিটারের ৩৩ কেভি দুটি কেবল স্থাপনের মাধ্যমে গ্রিড সংযোগ স্থাপন করা হয়। এজন্য সন্দ্বীপে ১৬ ও সীতাকুণ্ডে ১০ কিলোমিটার ওভারহেড লাইন (মাটির ওপর) স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম দিকে একটি কেবলের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হলেও বর্তমানে ৩৬ হাজার গ্রাহক প্রতিদিন ব্যবহার করেন নয় মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ। দুটি কেবলের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আগামী ৫০ বছর সঞ্চালন করা সম্ভব হবে। ২০১৪ সালে সমুদ্র চ্যানেল দিয়ে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগের ১৪৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। চীনা কোম্পানি জেডটিটি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

সন্দ্বীপে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মাসেই সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগের নতুন আবেদন আসে ২৫০-৩০০টি। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম প্রাপ্তি সাপেক্ষে এসব সংযোগ দেয়া হয়।

স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি সূত্র জানিয়েছে, সন্দ্বীপে বিদ্যুতের সম্ভাব্য গ্রাহক সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেয়ার পরও ৪০-৫০ শতাংশ গ্রাহক এখনো বিদ্যুৎ পাননি। চাহিদা থাকলেও সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও বিড়ম্বনার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে অনীহা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তাছাড়া বিদ্যুৎ যাওয়ার পরও সেচনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সে অনুপাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে না। এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কার্যক্রমকেও দায়ী করেছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সন্দ্বীপে চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ২৭ হাজার হেক্টর। বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরও সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর সেচ ব্যবস্থার কারণে সন্দ্বীপে বর্ষা মৌসুমে আউশ ও আমন ধান চাষ হয় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে। সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া স্থানীয় ধানের জাত রাজাশাইলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১ দশমিক ৫০ থেকে ১ দশমিক ৭৫ টন। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে মাত্র ২০-২৫ হেক্টর জমিতে আউশ ও আমনের উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করা হচ্ছে, যার হেক্টরপ্রতি ফলন তিন টন। বিদ্যুৎ যাওয়ার পর কৃষি বিভাগ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ শতাংশ জমিতে বোরো চাষ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কৃষকদের অনাগ্রহ থাকায় সন্দ্বীপের শস্য নিবিড়তা ১৭৫ শতাংশেরও কম। মূলত ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে শাকসবজি চাষ হওয়ায় শস্য নিবিড়তার সূচক কিছুটা উন্নত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে সন্দ্বীপের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সংযোগ আসার পরও সেচনির্ভর কৃষি এখনো সেভাবে চালু হয়নি। তাছাড়া বরফকল কিংবা কৃষিভিত্তিক কোনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন হয়নি। একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ব্যক্তি উদ্যোগে সেচ পাম্প স্থাপন করেছেন। স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে অনীহার কারণে চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্বীপের বাইরে থেকে আনা হয়।

বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া নিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার মানুষ বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভও জানিয়েছে। সন্তোষপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ৪০টি পরিবার ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পিডিবির প্রধান প্রকৌশলীকে (চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চল) অভিযোগ দেয়। লিখিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সঞ্চালন লাইন থেকে মাত্র ৪০০-৪৭৫ মিটার দূরত্বে পরিবারগুলো বসবাস করলেও আবেদনের পরও বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে না। ওই এলাকায় প্রায় ১০ একর এলাকাজুড়ে একটি পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি।

ট্রাভেলী ইকোভিলেজ পর্যটন পার্কের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. নুরুল আনোয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌পর্যটন কেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেও দুই বছরে বিদ্যুৎ সংযোগ পাইনি। বিদ্যুতের জন্য স্থানীয় পিডিবি কার্যালয়সহ চট্টগ্রামে পিডিবির বিভিন্ন অফিসে দেনদরবার করেও কাজ হয়নি। এখন অবকাঠামোগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে অনেকে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ কিংবা পোলট্রিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পর সন্দ্বীপের জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় শিল্প কিংবা খামার স্থাপনে প্রত্যন্ত এলাকা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু দ্বীপের বেড়িবাঁধ বা প্রত্যন্ত চর এলাকায় এখনো সঞ্চালন লাইন স্থাপনকাজ শেষ হয়নি। এ কারণে কর্মসংস্থানভিত্তিক বিনিয়োগে পিছিয়ে রয়েছে উপজেলাটি।

যোগাযোগ করা হলে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইসমাইল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমাদের কাছে যেসব আবেদন আসে, সেগুলো যথাসময়ে সংযোগ দেয়া হয়। তবে সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণের বিষয়টি প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। ফলে যেসব এলাকায় এখনো বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়নি সেখানকার বাসিন্দারা আবেদন করলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষই এর সমাধান দিতে পারবে। সন্তোষপুর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় খুঁটি বসানো হয়ে গেলে দ্রুতই সংযোগ দেয়া হবে।’

যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নতুন এলাকায় সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। তাছাড়া প্রধান প্রধান সড়কসংলগ্ন এলাকায় সংযোগ দেয়া হলেও দ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকাগুলো এখনো বিদ্যুতের আওতায় আসেনি। এ কারণে বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প স্থাপন কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ শুরু হয়নি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের পক্ষ থেকে সন্দ্বীপে একটি শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চট্টগ্রাম জোনের (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক মো. শামসুদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌মূল ভূখণ্ড থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় বিদ্যুৎ পেয়েও স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের উদ্যোগ নেই সন্দ্বীপে। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প থেকে সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হচ্ছে। এখন পর্যন্ত শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হলেও নতুন নতুন বাড়িঘর স্থাপনের কারণে নিয়মিতভাবে কেউ না কেউ সংযোগের আবেদন করে।’ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন কিংবা সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

আরও