যুগের চাহিদার সঙ্গে আমরা শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি

বাংলাদেশে গত ৫৩ বছরে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কিছু সাফল্য এবং অর্জনের পরও হিসাবের খাতা খুললে দেখা যায় আমরা অনেক অনেক চিন্তার জায়গায় পিছিয়ে আছি। যেভাবে সাধারণ শিক্ষা বিস্তার লাভ করেছে, সে তুলনায় কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার পথ যতটা বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি। গুণগত

অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখা। উপাচার্য, উত্তরা ইউনিভার্সিটি। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সভাপতি এবং স্কুল অব এডুকেশন, ফিজিক্যাল এডুকেশনের ডিন ও উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি দেশের শিক্ষা খাতের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

স্বাধীনতার ৫৩ বছরে শিক্ষা খাতে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বাংলাদেশে গত ৫৩ বছরে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কিছু সাফল্য এবং অর্জনের পরও হিসাবের খাতা খুললে দেখা যায় আমরা অনেক অনেক চিন্তার জায়গায় পিছিয়ে আছি। যেভাবে সাধারণ শিক্ষা বিস্তার লাভ করেছে, সে তুলনায় কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার পথ যতটা বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি। গুণগত শিক্ষা অর্জনে ও টেকসইকরণে কিছু সাধারণ পূর্বশর্ত পূরণ প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে বৈষম্যহীন সমন্বিত শিক্ষা, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, মানসম্মত ও পেশার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় সুযোগ দিয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতায় এনে ধরে রাখা, সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, দুর্নীতি নির্মূল ও অপচয়রোধ এবং শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ। এসব পূর্বশর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করে গুণগত শিক্ষার মান ও মাত্রা। মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এজন্য কেবল পরিমাণগত নয়; সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবক সবার মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষার ওপর আমাদের জোর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশে কি একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা উচিত?

আমাদের সবার উচিত এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটি সর্বজনীন, বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা, যার প্রধান উদ্দেশ্য হবে মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এরূপ শিক্ষা পরিচালিত হবে এক দেশ এক শিক্ষা—এ নীতির ভিত্তিতে, অর্থাৎ মৌলিক শিক্ষার স্তরে দেশের প্রতিটি শিশুকে একই শিক্ষা দেয়া এবং এর মূল লক্ষ্য মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করা। 

বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। কিন্তু সর্বশেষ বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ...

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শিক্ষা খাতকে অন্যান্য খাতের মতো বিবেচনা করে আর দশটা বারোয়ারি ‘বাজেটিক-আইটেম’ ধরে চিন্তাভাবনা এবং বরাদ্দ-বিবেচনা করলে, আমরা একটা বড় ধরনের গলদ করব। কেননা শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড সোজা এবং শক্ত না হলে কোনো কিছু শেষ বিচারে দাঁড়াবে না। তাই শিক্ষাকে সবসময়ই একটি বিশেষ বিবেচনায় এবং সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় সব পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং শিক্ষার যথাযথ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

স্মার্ট বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছেন দেশের নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আদৌ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে?

স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে সবার আগে স্মার্ট শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এখন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সফল অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনার দিকগুলো যেমন আমাদের আছে, একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জও আছে। আমাদের এসব অর্জন করতে গেলে পথে অনেক বাধা-প্রতিবন্ধকতা আছে। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সফল অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো মোকাবেলা করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। সে প্রস্তুতের ক্ষেত্রটা হলো শিক্ষা।

বিদেশে পাড়ি জমাতে চান দেশের ৪২ শতাংশ তরুণ। যারা একবার বিদেশে যান তারা আর দেশে ফেরেন না। মেধাবীরা দেশ ছাড়তে চাইছে কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ায় আমাদের নতুন করে ভাবনার জন্ম দিচ্ছে, কেন এসব মেধাবী ছেলে-মেয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে? একটি দেশে যদি সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার বিরাজমান থাকে, তাহলে সে দেশ অগ্রগতির পথে ধাবিত হয়। দেশ হয়ে ওঠে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বসবাসের উপযোগী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় মেধাবীদের মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের যথাযথ সম্মান ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব দেখা যায়। যার কারণে দেশে ব্রেইন ড্রেইন ক্রমাগত হারে বেড়ে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য, যা কখনো দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। এছাড়া মেধাবীদের বিদেশ গমনের ফলে দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মক্ষেত্রে বিদেশী বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়, এতে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ের সঙ্গে রয়েছে দেশপ্রেমহীন নিম্নমানের কাজের শঙ্কা। 

প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা সংস্কারে আপনার বিশেষ কোনো ভাবনা আছে কি?

প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে এত চিন্তা, ভাবনা ও পরিকল্পনা, কিন্তু তা গবেষণাভিত্তিক নয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপদান করতে হবে। শিক্ষা গবেষণায় বিনিয়োগ না করে কোনো দেশ শিক্ষায় উন্নতি করতে পারবে না। আমাদের দেশেই কৃষি গবেষণায় বাড়তি বিনিয়োগ করে আমরা সুফল পেয়েছি। তাহলে শিক্ষায় গবেষণা নয় কেন? আমাদের সামনে এখন ভিশন ২০৪১। টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) আমরা স্বাক্ষর করেছি, তাতে আছে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার কথা। এখন বাস্তবভিত্তিক সহপাঠের বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তাই সাপ্লিমেন্টারি বা সহায়ক উপকরণের গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু আমরা সেখানে এখনো বেশি দূর এগোতে পারিনি। তাই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিতকরণে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, বিষয়ে বৈচিত্র্য আনয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নবতর জ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন এবং উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিশ্বমানের গবেষণা কার্যক্রম নিশ্চিতকরণে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রÅvংকিংয়ে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুসংহত এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়ন কার্যক্রমকে গতিশীল রাখতে হবে। এজন্য জাতীয় বাজেটে উচ্চশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও সরকারকে যৌথভাবে বহুমাত্রিক কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বলে আমি মনে করি।

আরও