পর্যটক আকর্ষণে ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এ চার মাস পর্যটনের মৌসুম হিসেবে গণ্য হয়। এ সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট যেসব ব্যবসায়ী রয়েছেন, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট থেকে শুরু করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন, স্থানীয় পর্যটন আকর্ষণে যারা কাজ করছেন, রেস্টুরেন্ট, মোটরবাইক থেকে শুরু করে যারা অটোরিকশা চালিয়ে পর্যটকের সেবা নিশ্চিত করছেন সে জায়গাগুলোয় এ

ড. সন্তোষ কুমার দেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। দেশের পর্যটন খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। পর্যটন শিল্পে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। তার প্রকাশিত গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্নালে সুনাম কুড়িয়েছে। চলমান পর্যটন মৌসুম, ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক পর্যটক, অভ্যন্তরীণ পর্যটন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম

এখন পর্যটন মৌসুম চলছে, এবার পর্যটন শিল্প কেমন জমে উঠতে পারে বলে মনে করেন?

প্রতি বছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এ চার মাস পর্যটনের মৌসুম হিসেবে গণ্য হয়। এ সময়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট যেসব ব্যবসায়ী রয়েছেন, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট থেকে শুরু করে পর্যটনসংশ্লিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন, স্থানীয় পর্যটন আকর্ষণে যারা কাজ করছেন, রেস্টুরেন্ট, মোটরবাইক থেকে শুরু করে যারা অটোরিকশা চালিয়ে পর্যটকের সেবা নিশ্চিত করছেন সে জায়গাগুলোয় এ মৌসুমে হরতাল-অবরোধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের যেসব উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে, যেমন কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, রাতারগুল, বিছনাকান্দি, সিলেটের জাফলং থেকে শুরু করে বিছনাকান্দির আঁকাবাঁকা মেঠোপথের যে চা বাগান, সবুজের যে নান্দনিক সৌন্দর্য সেটি দেখার জন্য কিন্তু প্রচুর পরিমাণ পর্যটক যান। এ বছর হরতাল ও অবরোধের কারণে পর্যটকের সংখ্যা কমে গিয়েছিল। পর্যটকরা একটি শঙ্কার মধ্যে ছিলেন। পর্যটন মানেই হচ্ছে বিনোদন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকার পার্শ্ববর্তী পর্যটন কেন্দ্রে গিয়ে সময় কাটিয়ে সতেজতার আমেজ নিয়ে ফিরে আসা যায়। এ সতেজতার ফলে পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতা অনেকটা বৃদ্ধি পায়। এ বছর হরতাল-অবরোধের কারণে মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও পর্যটনে একটি খরা চলেছে। যেখানে হোটেল, মোটেল, রিসোর্টগুলোয় শতভাগ অকুপেন্সি রেট থাকার কথা, সেখানে এ হার ৪০-৫০ ভাগ দেখা গিয়েছিল। এই যে চারটি মাস, এ মাসগুলোর জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্টদের বাকি চার মাস অপেক্ষা করতে হয়। এ সময়ে তারা অপেক্ষা করেন আগের আট মাসের ঘাটতিগুলো পূরণ করার। সে জায়গায় প্রত্যাশিত পর্যটক না পাওয়ায় মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রামের এ তিন জেলার নান্দনিক দৃশ্য দেখার জন্য এ সময়ে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। তাই পর্যটন মৌসুমে পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষকে ব্যবসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্তটি রয়েছে। একটি দেশের পর্যটন কতটা সামনে এগিয়ে যাবে, অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখবে, এই যে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে পর্যটন অবদান রাখছে সেটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের অবদান কি?

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যে পাঁচ খাতকে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে পর্যটন কিন্তু উল্লেখযোগ্য। ইউরোপকে বলা হয় পর্যটনের স্বর্গরাজ্য বা স্বর্গভূমি। সেখানে প্রচুর পরিমাণে পর্যটক ঘুরতে যায়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায়। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য অন্যতম মজবুত অর্থনীতির দেশ অস্ট্রেলিয়া ডিজিটাল পর্যটন প্রসারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। সেই সঙ্গে ওই দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধিকল্পে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের অন্যতম মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ‘আই লাভ অস্ট্রেলিয়া’ পেজের স্পন্সরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ এবং ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আকৃষ্টের চেষ্টা করছে। এ পেজের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নান্দনিক দৃশ্য ও পর্যটন আকর্ষণগুলোর ছবি দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্টের চেষ্টা করছে। বিশ্ববাজারে পর্যটন একটি অনন্য মাত্রা লাভ করেছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে পর্যটন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ১৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে খাতটির হিস্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৪-১৯ সালের পরিসংখ্যানে এসেছে, এ সময়ে পাঁচজনের মধ্যে একজনের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন শিল্পে। ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে মোট কর্মসংস্থানের ১০ দশমিক ৩ শতাংশ (৩৩৪ মিলিয়ন) পর্যটন শিল্পে হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটা মোট জনসংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে প্রতি সাতজনে একজন পর্যটক। কিন্তু কভিড-পরবর্তী ২০২১-২২-এর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৯-২০ সালে কভিড প্রসার লাভ করায় পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর দেখা যায়, কভিড-১৯-এর কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ পর্যটন শিল্প। আবার কভিড-১৯-পরবর্তী অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এ পর্যটন শিল্পের দিকেই প্রতিটি দেশ ফোকাস করছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পে কর্মরত রয়েছে। কভিড-১৯-এর ক্ষতির প্রভাব কাটিয়ে যখন বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে সামনের দিকে বেগবান হচ্ছে, ঠিক তখনই আরেকটি বাধার সম্মুখীন হয়েছে এ পর্যটন মৌসুমে। যেটি হরতাল ও অবরোধের কারণে হয়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কথা ভেবে ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনীতিসংশ্লিষ্ট সব দলের ভাবনায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি নিশ্চিত করা খুব প্রয়োজন। 

দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ হয়েছে, ঢাকার আশপাশে অনেক রিসোর্ট তৈরি হয়েছে। অতীতের তুলনায় এ বিবর্তন কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে? 

গত এক দশকে বাংলাদেশের পর্যটনে ব্যাপক একটি পরিবর্তন এসেছে। এর অন্যতম একটি কারণ হলো মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মানুষের আয়ের পরিমাণ বিগত সময়ের চেয়ে বেড়েছে। যখন মানুষের পকেটে টাকা থাকে, এর একটি উদ্বৃত্ত অংশ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার আশপাশের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং অবকাশ কেন্দ্রগুলোয় ঘুরতে যায়। এই যে ট্রেন্ড বিনোদন বা ভ্রমণের প্রবণতা, এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সময় দেখা যেত ভ্রমণ মানেই ইউরোপ, যা এশিয়ায় এতটা প্রচলিত ছিল না। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকায় আন্তর্জাতিক পর্যটক আসার সম্ভাবনা অনেক বেড়েছে। ইউরোপ থেকে প্রচুর পর্যটক এশিয়া-প্যাসিফিক দেশগুলো এমনকি বাংলাদেশেও ঘুরতে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ ইউরোপের প্রচুর পর্যটক কিন্তু বাংলাদেশে ভ্রমণ করছে। আমাদের ইন বাউন্ড ট্যুরিজমের প্রভাবও বাড়ছে। বাংলাদেশে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা যায়, অভ্যন্তরীণ পর্যটক প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। প্রতি বছর এসব মানুষ একটি ডেসটিনেশন থেকে আরেকটি ডেসটিনেশনে ঘুরছে। এখন আমরা যদি বলি মানুষ কোথায় ঘুরতে যায়? সাধারণত তার কর্মস্থলের আশপাশে যে ডেসটিনেশনগুলো রয়েছে, সে ডেসটিনেশনগুলোর ফোকাস একটু বেশি। যে মানুষ ঢাকায় চাকরি করে তার আশপাশে মুন্সিগঞ্জ, সোনারগাঁও, গাজীপুর, নরসিংদী ইত্যাদি এলাকায় রিসোর্টগুলোয় সাপ্তাহিক ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যায়। সেখানে এক দিন থেকে বাসায় ফিরে পরের দিন আবার তারা কর্মস্থলে যোগদান করে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কভিড-১৯-এর পর বিশ্বজুড়ে হ্রাস পেয়েছে। কারণ সমগ্র বিশ্বের পর্যটকদের মধ্যেই একটি প্রবণতা রয়েছে যে হেলথ সেফটি ফার্স্ট। মানুষ কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে যায় না। তার পরও দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ অনেক মানুষ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে, অবকাশ যাপন, পরিবার-পরিজন নিয়ে ও এককভাবে বিদেশে ঘুরতে যায়। সেই সঙ্গে অনেকের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই থাকে ভ্রমণ। এর মাধ্যমে বিশ্বের নান্দনিক দৃশ্যগুলো দেখতে চাওয়াই উদ্দেশ্য থাকে।

সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ পর্যটনের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলুন।

বাংলাদেশের পর্যটন টিকে থাকা ও তার অগ্রগতির জন্য বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে অনেক বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে হচ্ছে। স্থানীয় পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী হোটেল, মোটেল, রিসোর্টের মাধ্যমে আরো বেশি সেবা যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় ঢাকার পাশে যে রিসোর্টগুলো গড়ে উঠেছে, তাদের দৈনিক ভাড়া যদি কমানো হয়, খাবারের খরচ যদি সাধ্যের মধ্যে থাকে, রিক্রিয়েশনাল অ্যামিনিটিস যদি অ্যাভেইলেবল থাকে, তাহলে কিন্তু পর্যটকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে এবং তারা সন্তানাদি নিয়ে আশপাশের হোটেল, মোটেল, থিমপার্কগুলোয় অধিক পরিমাণে ঘুরতে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটি দেশের পর্যটনে উন্নয়নের জন্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট যেসব মানুষ ব্যবসা করছে তাদের একটা বাজেট প্যাকেজের মধ্যে যদি পর্যটনগুলো অফার করা যায় তাহলে অভ্যন্তরীণ পর্যটন সম্প্রসারিত হবে। অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। এতে দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান বৃদ্ধি পাবে। তৈরি হবে কর্মসংস্থান, সমৃদ্ধ হবে অর্থনীতি।

বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের জন্য আমাদের দেশে যথোপযুক্ত ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে কি?

বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম জায়গা হলো ব্র্যান্ডিং। আমরা কতটা আকর্ষণীয় করে ব্র্যান্ডিং করতে পারি। আমাদের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। তার সঙ্গে রয়েছে সুন্দরবন, যেখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কুয়াকাটায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটও রয়েছে। সেই সঙ্গে কান্তজীর মন্দির থেকে শুরু করে সিলেটের জাফলং, আঁকাবাঁকা মেঠোপথের যে চা বাগান রয়েছে। রাতারগুল, বিছনাকান্দি, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ নদী কেন্দ্রিক পর্যটন রয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের পদ্মা সেতু ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যোগসূত্র স্থাপন করেছে। এর ফলে গোপালগঞ্জ, বরিশাল, যশোর অঞ্চল থেকে শুরু করে পুরো অঞ্চলে পর্যটকের সংখ্যা কিন্তু বেড়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গাকে কেন্দ্র করে যে কর্ণফুলী টানেল হয়েছে, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে প্রায় ৮০ কিলোমিটারের যে মেরিন ড্রাইভটি রয়েছে। এটি সম্প্রসারণ করে আরো সামনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা-কক্সবাজার রেল চালু হয়েছে। ঝিনুক আকৃতির রেলস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যায়, মানুষ একটি দৃশ্য দেখার জন্য শ্রীলংকা যায়। ভারত মহাসাগরের তীরঘেঁষে যে রেললাইন চলে গেছে, রেলে বসে ভারত মহাসাগরের নান্দনিক দৃশ্য দেখবে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন রয়েছে। এসব পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র করে প্রমো তৈরি করা হলে তা ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম হতে পারে। তাতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের যে এম্বাসিগুলো রয়েছে, একজন পর্যটক যখন ভিসার জন্য অ্যাপ্লিকেশন করে, সে ওয়েবসাইটে একটু পর পর পর্যটন আকর্ষণগুলোর ছবি, ভিডিও কনটেন্টগুলো যদি থাকে, তাহলে একজন পর্যটক ঢাকায় ঘুরতে এলেও কক্সবাজারের ছবি দেখে তার ইচ্ছা হবে যে ঢাকার সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরে দেশে ফেরত যাবে। বাংলাদেশের পর্যটনের আরেকটি আকর্ষণ মেট্রোরেল যা বিমানবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যটককে ঢাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হতো। সে জায়গাটি এখন আর থাকবে না। বিমানবন্দরে মেট্রো স্টেশন হচ্ছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালটি আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে ২৬টি বোর্ডিং গেট আছে, ৬৬টি চেকিং ইমিগ্রেশন বুথ আছে। বিদেশীদের কাছে বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা দেখেই একটি দেশের পর্যটন নিয়ে প্রাথমিক ধারণাটি তৈরি হয়। পর্যটক আকর্ষণে ব্র্যান্ডিংটা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এক্ষেত্রে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ডিংটা করতে পারিনি। এজন্য ছোট ছোট প্রমো ভিডিওগুলো দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মার্কেটিং করা গেলে, পেজ খুলে সেগুলো বুস্টিং করে আন্তর্জাতিক বাজারে যদি প্রমোট করা যায়, ইনস্টাগ্রামে যদি বিউটিফুল বাংলাদেশ কনসেপ্ট বা অন্য কোনো ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এগোনো যায়। এ মুহূর্তে যেটি বলা হচ্ছে মুজিব’স বাংলাদেশ—এ জিনিসগুলোকে যত প্রমোট করা যাবে, ততই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। 

পর্যটন খাতের বিকাশে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব কতটুকু?

বর্তমানে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের উপাদানগুলোর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, ওয়েবসাইট, বিগ ডাটা ও কনটেন্ট মার্কেটিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে বিধায় পর্যটন ব্র্যান্ডিং ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নর্থ আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের দেশগুলো সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের (ফেসবুক, ইনস্টগ্রাম, ইউটিউব) ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করছে। অতএব উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে পর্যটন প্রমোশনে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের ওপর দেশে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ পর্যটন গন্তব্য ও দর্শনীয় স্থানকে বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে বিদেশী পর্যটক আকর্ষণ করা সম্ভব। ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও প্রমো তৈরির মধ্য দিয়ে দেশের প্রায় তিন কোটি পর্যটক দেশের নতুন নতুন পর্যটন ডেস্টিনেশন সম্পর্কে জানতে পারবে এবং পর্যটন আকর্ষণগুলোয় পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়বে।

স্মার্ট পর্যটন প্রচার ও প্রসারের জন্য সারা দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর ডিজিটাল ডিরেক্টরি তৈরি এবং প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের এক্সক্লুসিভ ডকুমেন্টারি, ৩৬০ ডিগ্রি ভিজ্যুয়াল গাইডেন্স, ৩৬০ ডিগ্রি ভিআর ট্যুর (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি) এবং পর্যটকের প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও সেবা ব্যবস্থা থাকা দরকার।

পর্যটন আকর্ষণগুলোর ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়ের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া খুবই প্রয়োজন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের টুলসগুলোর মধ্যে ই-মেইল মার্কেটিং, তথ্য সংবলিত নান্দনিক ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং এবং কনটেন্ট মার্কেটিং অন্যতম। পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির হোটেলগুলো তাদের হোটেলের দেয়ালে অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহারের মাধ্যমে অতিথিদের সেবা দিচ্ছে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে। 

আরও