বিএনপিসহ বেশকিছু দল নির্বাচন বর্জন করায় বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়নি আওয়ামী লীগকে। অন্যদিকে ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে কিংবা যতটা সম্ভব কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় বিরোধী দলগুলো। এ লক্ষ্যে সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার হরতালও ডাকে বিএনপি-জামায়াত। এর মধ্যেই গতকাল অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এ ভোট জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি বিএনপিসহ ২৭টি দলের। ভোট বর্জন করায় তারা ভোটারদের ধন্যবাদও জানিয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে এক প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল রাতে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দ্বাদশ নির্বাচনের ভোট প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকামী মানুষের জয় হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে সরকারের তোড়জোড়ে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো শুরু থেকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। গণতন্ত্রকামী দলগুলোর আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও রাষ্ট্রযন্ত্রে নিজের “সেটআপে” জাতীয় নির্বাচন সম্পাদন করতে অনড় থাকে সরকার। ফলে আন্দোলনরত অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা ও দাবিকে অগ্রাহ্য করে তামাশার নির্বাচন করতে উঠেপড়ে লাগে।’
ভোটে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে দাবি করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আজকের জালিয়াতির নির্বাচনে যেটি উন্মোচন হয়েছে তা হলো বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দীপনাকে সম্পূর্ণরূপে অপমান করা।
নির্বাচন বলে দাবি করে শাসক দল আত্মশ্লাঘা লাভ করলেও ভোট কেন্দ্রের চরম অনিয়ম ও সহিংসতা ঢাকতে পারেনি। ঢাকার বাইরেও জনশূন্য কেন্দ্রে ভোটারদের নিয়ে আসতে পারেনি সরকার, নির্বাচন কমিশন ও দলীয় ক্যাডারদের নানা কারসাজি, হুমকি ও কাকুতি-মিনতি।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপিসহ ৬৩টি গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করা সত্ত্বেও দেশের প্রতিটি আসন ও কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সংঘবদ্ধভাবে কারচুপি ও সংঘাত করেছে। একের পর এক যেসব ছবি, ভিডিও ও তথ্য আমরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখতে পেয়েছি, তাতে এটিই পুনঃপ্রমাণিত, এ সরকারের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয়।’
বিএনপির বিবৃতিতে আরো বলা হয়, দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে ও সাহসিকতার সঙ্গে যেভাবে ডামি নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, বিএনপি তার জন্য দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এর আগে দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে জনগণ নির্বাচন বর্জন করেছে বলে দাবি করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। জনগণকে স্যালুট জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কোনো নির্বাচন না। এটা একটা ভুয়া নির্বাচন। আগামীকাল দেশে-বিদেশে সব গণমাধ্যমে এ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন বের হবে।’
দলটির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিবেকবান লোকও আজ ভোট দিতে যায়নি বলেও খবর পেয়েছি। ২ শতাংশের বেশি ভোটার কেন্দ্রে নিতে পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে গরু-ছাগল দেখা গেছে, এবারের ভোটের দিন যুক্ত হয়েছে বানরও। প্রহসনের তামাশার ভোট, যেখানে নিজেরা নিজেরা ভোট করছে সেখানেও এ অবস্থা। আমরা কী কারণে ভোট বর্জন করেছি, তা প্রমাণিত।’
জনগণ এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, সংসদ নির্বাচনের ফল দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই এ নির্বাচনের ঘোষিত ফলের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের নৈতিক অধিকার কারো নেই।
সিপিবির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বিবৃতিতে বলেন, ‘সরকারের জবরদস্তি, ভয়ভীতি ও লোভ-লালসা উপেক্ষা করে অধিকাংশ দেশবাসী ভোট বর্জন করায় তাদের অভিনন্দন। জনমত উপেক্ষা করে সরকার গঠিত হলে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হবে।’
ভোট শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজ ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্ববাসী বাংলাদেশে আরো একটি ভোটারবিহীন প্রহসনের ডামি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।’ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে দাবি করে তিনি দেশবাসীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
‘নির্বাচনে জনগণের ভোট বর্জন ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে থাকবে’—এমন মন্তব্য করে ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, আওয়ামী লীগের এখনি পদত্যাগ করা উচিত। কারণ জনগণ ভোট কেন্দ্রে যায়নি। দেশের মানুষ এ সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে। তাই জনগণের নীরব ‘ভোট প্রত্যাখ্যান’ জাতির বিজয় এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের পরাজয়। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব ও পল্টন এলাকায় গতকাল জোট আয়োজিত হরতাল ও গণকারফিউয়ের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে দেয়া বক্তব্যে তারা এ কথা বলেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘একতরফা অবৈধ প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে সেন্টারে গিয়ে ভোট না দেয়ায় দেশপ্রেমিক ঈমানদার জনতাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও আন্তরিক ধন্যবাদ। সচেতন দেশবাসী স্বৈরাচারী সরকারকে লাল কার্ড দেখিয়ে প্রমাণ করল দলীয় সরকারের পাতানো তথাকথিত এ নির্বাচনের নাটক তারা শুধু দেখতেই চায় না, বরং ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।’
ভয়ভীতিতে কাজ হয়নি, জনগণ ভোট প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করেছে গণতন্ত্র মঞ্চ। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গতকাল এক সমাবেশে ছয় দলীয় জোট দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে ‘ডামি নির্বাচন’ বলে আখ্যা দেয়।