অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েই দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণ আজ

আজ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ নিবন্ধিত ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। আর বয়কট করেছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ। এমন এক সময় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

আজ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ নিবন্ধিত ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। আর বয়কট করেছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ। এমন এক সময় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। অর্থনীতির ভিতকে ক্রমাগত দুর্বল করছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্রমাগত ক্ষয়। শ্লথ হয়ে এসেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুই প্রধান উৎস রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। এতে প্রায় দুই বছর ধরে চলে আসা ডলার সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। 

আমদানি এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমিয়েও ডলার সংকট কাটাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতে তীব্র হয়ে উঠেছে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট। স্থবিরতা চলছে বেসরকারি বিনিয়োগেও। দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ বাড়ছে সরকারের। বিপরীতে কমছে রাজস্ব আহরণ। অর্থ সংকটে পড়ে বিদ্যুৎ, সারসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি ও প্রণোদনার অর্থও পরিশোধ করতে পারছে না সরকার। সরকারের তরফ থেকে বিশেষ ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে ভর্তুকির দায় পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। স্থবিরতা চলছে দেশের পুঁজিবাজারেও।

অর্থনীতির এ বহুমুখী সংকটের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ‘বাধা প্রদানকারী’ বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

দেশের রফতানির ৬২ শতাংশই হয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোয়। এসব দেশ এখন বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রধানতম উৎসও। এ অবস্থায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ বাড়লে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরো তীব্র হয়ে ওঠার বড় আশঙ্কা রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ নির্বাচন যদি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় বিষয় হলো বাংলাদেশ পশ্চিম থেকে টাকা আয় করে। ব্যয় করে পূর্বের দিকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের বড় একটি অংশ আসে পশ্চিমা বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। আর আমদানি বাবদ ব্যয় হয় চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোয়। এ অবস্থায় যদি পশ্চিম দিক থেকে অর্থ আসা বন্ধ হয় বা কমে যায় তাহলে বাংলাদেশকে অর্থের জন্য পূর্ব দিকের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই রাজনীতির ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের মতো কঠোর কোনো পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) পরিস্থিতির ওপর। সরকার যদি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে অন্তত ৪০ শতাংশ ভোটারকে অংশ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকার এ নির্বাচনকে পশ্চিমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। আমার মনে হয়, সরকার সে চেষ্টাই করছে। নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাত-সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব না হলে দেশের অর্থনীতির জন্য ২০২৪ সাল হবে ভয়ংকর বছর।’

তিনি বলেন, ‘২০২২ সালে শুরু হওয়া অনেক সংকট ২০২৩ সালে এসে আরো গভীর হয়েছে। এর অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। আইএমএফের শর্ত পরিপালনের অংশ হিসেবে এটি করা হয়েছে। তবে আমরা দেখতে চাই, জানুয়ারিতে যাতে রিজার্ভে অস্বাভাবিক পতন না হয়। রিজার্ভ হলো যেকোনো দেশের অর্থনীতির মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। রিজার্ভ বাড়লে বিদেশীদের আস্থা বাড়ে। অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পায়।’

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৪ সালের শুরুতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ১ হাজার ৭৫৬ কোটি বা ১৭ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর শেষে তথা ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশের রিজার্ভ বেড়ে ২২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। ওই সময় দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও কম। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ শতাংশের ঘরে। দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশে। আর প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭৮ টাকা। 

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি ও ফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ওই সময় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের তুলনায় স্থিতিশীল ছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকায় সীমাবদ্ধ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হারও ছিল ৫ শতাংশের ঘরে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। 

কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনীতির প্রায় সবক’টি সূচকই নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের স্থিতি এখন প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। বিপরীতে আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর থেকে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গত ৩০ নভেম্বর দেশের গ্রস রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত ঋণ ও বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ ডিসেম্বর গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ২৬ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে। ওইদিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। তবে একই দিন দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। মূলত আইএমএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির শর্ত পূরণ করার জন্যই বাজার থেকে ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি দায় পরিশোধের কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যয় হবে প্রায় ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। আবার দেশের ব্যাংকগুলো থেকে কেনা ডলারের একটি অংশ ১০ জানুয়ারির মধ্যে ফেরত দিতে হবে। কারণ ফেরত দেয়ার শর্তেই কিছু ব্যাংক থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ডলার কেনা হয়েছিল। সব মিলিয়ে চলতি জানুয়ারিতেই রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অবনতি ঘটছে সব সূচকে। এর অভিঘাত কিন্তু সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়েনি। মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এর ধাক্কাটা সবচেয়ে বেশি পড়ছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ওপর। বিশ্বের বিভিন্ন ঋণমান পূর্বাভাসদাতা প্রতিষ্ঠান এখন দেশের ঋণমান নামিয়ে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ও সরবরাহ কমার পাশাপাশি টাকার টানা অবমূল্যায়ন অর্থনীতিতে নিম্নমুখী চাপকে আরো জোরালো করে তুলেছে। ‌অর্থনীতির এখনকার চ্যালেঞ্জগুলো আগেও নানা মাত্রায় ছিল। কিন্তু সে সময় এগুলো মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এখন এমন এক পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে যখন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‌দ্রুত ও জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নেয়া হলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে হুমকিতে পড়তে পারে। আবার আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক ছায়াযুদ্ধের হুমকিও রয়েছে।’

রিজার্ভ ক্ষয়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নও হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে গত দুই বছরে ১১১ টাকায় উঠেছে। তবে ডলারের এ বিনিময় হার (১১১ টাকা) কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত। দেশের ব্যাংকগুলোয় আমদানি দায় মেটাতে প্রতি ডলার কিনতে ১২৪-১২৬ টাকাও ব্যয় করতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। 

দেশে ডলার সংকট কাটাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময় থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কঠোর পদক্ষেপের কারণে গত অর্থবছরে আমদানি ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে যায়। আমদানি নিয়ন্ত্রণের এ পদক্ষেপ এখনো অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আমদানি কমেছে ২০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রেকর্ড পরিমাণ আমদানি কমিয়ে আনার পরও দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ প্রত্যাশা অনুযায়ী কমাতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে স্থবিরতা চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। একই সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক ১৭ শতাংশ। 

দেশে যে পরিমাণ ডলার ঢুকছে, এখন বেরিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এ কারণে দেশের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বেড়েই চলছে। গত নভেম্বর শেষে এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। দেশের ইতিহাসে আর্থিক হিসাবে এত বড় ঘাটতি এর আগে কখনই দেখা যায়নি। নভেম্বর শেষে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপির ঘাটতিও ৪৮৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। আর বৈশ্বিক খাদ্য মূল্য কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময় খাদ্যশস্যের দামও কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়ও এ সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে এর কোনোটিরই ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। পণ্যের দাম না কমে উল্টো গত এক বছরে দেশে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। গত বছরজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। বছর শুরুর মাস তথা জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর নভেম্বরে এসে সে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। মাঝে অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করছেন, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার সরকার প্রকাশিত এ পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

সামষ্টিক অর্থনীতির টানাপড়েন সামাল দেয়া নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। বণিক বার্তাকে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‌মূল্যস্ফীতি এখনো বেড়ে চলেছে, এর পেছনে বড় কারণ বিনিময় হার। টাকার মান কমে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘‌রিজার্ভ বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। সেজন্য অর্থনীতির চাকা আরো সচল রাখতে হবে। অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার হবে এবং সেগুলোর দিকে নজর বেশি দিতে হবে। অনেক সংস্কারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশের ভেতরের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বহিঃঅর্থনীতির জায়গাটাও চ্যালেঞ্জিং। রেমিট্যান্স কীভাবে বাড়ানো যায়, রফতানিকে আরো কীভাবে গতিময় করা যায়; সেটির উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টকে ইতিবাচক ধারায় আনতে হবে। দেশের নিজস্ব অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী থাকলে আন্তর্জাতিক চাপ যতই থাকুক না কেন, সেটি মোকাবেলা করা যাবে। এজন্য কৃষিকে শক্তিশালী ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরো চাঙ্গা রাখতে হবে।’

আরও