সংকট কমছে না, তবে ২০২৩ সালে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে বেশির ভাগ ব্যাংকের

দেশের ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় একটি অংশ আসে বৈদেশিক বাণিজ্যের কমিশন থেকে। বিদায়ী বছর আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। শ্লথ ছিল রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। আবার খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সব ব্যাংকের। কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় বাড়ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ। তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি, সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিসহ বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক ভিতও নাজুক হয়ে

দেশের ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় একটি অংশ আসে বৈদেশিক বাণিজ্যের কমিশন থেকে। বিদায়ী বছর আমদানি কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। শ্লথ ছিল রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিও। আবার খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সব ব্যাংকের। কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় বাড়ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ। তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি, সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিসহ বেশির ভাগ ব্যাংকের আর্থিক ভিতও নাজুক হয়ে উঠেছে। এর পরও দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সাল শেষে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

বিদায়ী বছরের লাভ-ক্ষতির হিসাব গতকাল চূড়ান্ত করেছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বিদায়ী বছরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ২ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। তার আগের বছর ব্যাংকটির এ মুনাফা ছিল ২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। গত বছর রেকর্ড ১ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক পিএলসি। ২০২২ সালে যা ছিল ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। বেসরকারি এ দুটি ব্যাংকের মতো দেশের প্রায় সব ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোরও মুনাফা বেড়েছে। যেমন—২০২২ সালে ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৪১৫ কোটি টাকা। শরিয়াহ্ভিত্তিক এ ব্যাংকটি বিদায়ী বছর ৪৫৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা পেয়েছে। মেঘনা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের ৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে ২০২৩ সালে। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার প্রবৃদ্ধির তথ্য দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সারা বছর ব্যাংকগুলো সংকটের কথা বলেছে। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তে এসে ব্যাংক খাতের সংকট আরো গভীর হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন মুনাফা বেড়ে যাওয়াটি রহস্যজনক। মূলত ব্যাংক নির্বাহীরা বেশি মুনাফা দেখিয়ে মালিক পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো অনাদায়ী সুদকেও আয়ের খাতে দেখিয়েছে। এর প্রভাবেই বেড়েছে তাদের পরিচালন মুনাফা।

ব্যাংক নির্বাহীরাও প্রায় একই কথা জানিয়েছেন। অন্তত পাঁচটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, সঠিকভাবে হিসাব-নিকাশ করলে পরিচালন মুনাফার কতটা টিকবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ব্যাংক এখন নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যখন-তখন খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারছে। এর মাধ্যমে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বাড়লেও কাগুজে মুনাফা দেখানো যাচ্ছে। সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও কর পরিশোধের পর অনেক ব্যাংকেরই নিট মুনাফা কমে যেতে পারে। 

আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে সেটিকেই বলা হয় পরিচালন মুনাফা, যা কোনো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এ মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফাকেই বলা হয় ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও ২০২৩ সালে পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ২০২২ সালে রূপালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ১০৬ কোটি টাকা। বিদায়ী বছরে এ মুনাফা বেড়ে ৬৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রূপালী ব্যাংকের সুদ খাত দীর্ঘদিন থেকে লোকসানি ছিল। ২০২৩ সালে তা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এর প্রভাবে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছরটিতে আমরা ৫১৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করতে পেরেছি। এটি বড় সাফল্য।’

পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেরও। গেল বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এর আগের বছর ৯২৮ কোটি টাকা পেয়েছিল।  

ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফায় বড় প্রবৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিচালন মুনাফা বাড়ার অর্থ এটি নয় যে ব্যাংক খাত ভালো আছে। সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও কর পরিশোধের পর পরিচালন মুনাফার কত অংশ টেকে সেটিই দেখার বিষয়। ব্যাংকগুলোয় মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আবার কিছু ব্যাংক মূলধন ঘাটতি ও সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে। ডলার ও তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক প্রত্যাশানুযায়ী ব্যবসা করতে পারছে না।’

এর আগে ২০২২ সালে দেশের ব্যাংক খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ নিট মুনাফা দেখানো হয়। বছরটিতে ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকার নিট মুনাফা দেখায় ব্যাংকগুলো, যেখানে আগের বছর ছিল ৫ হাজার ২০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা বাড়ে ১৮৩ শতাংশের বেশি। মুনাফার এ অর্থের সিংহভাগই লভ্যাংশ হিসেবে মালিক পক্ষ বের করে নিয়েছে। অথচ ২০২২ সালেই পুনঃতফসিল করা হয়েছে খেলাপি হতে যাওয়া ৬৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ। রেকর্ড পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করার কারণেই ব্যাংকগুলোর মুনাফা বেড়ে যায়। খেলাপি ঋণ কমে আসায় সঞ্চিতি সংরক্ষণও কমে আসে। যদিও পুনঃতফসিল করা ঋণই আবার খেলাপির খাতায় উঠছে। 

২০২২ সালের মতো গত বছরও দেশের ব্যাংকগুলো গণহারে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ পেয়েছে। তবে ঠিক কত পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেটির তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া যায়নি। একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, আগের বছরের তুলনায় ২০২৩ সালে ঋণ পুনঃতফসিল বেড়েছে। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ নিজেদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। 

বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল সত্ত্বেও গেল বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ৩৪ হাজার ৭৪১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এ খেলাপি ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।

আগে ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিলের প্রস্তাব নিজ পর্ষদে পাস হওয়ার পর তা অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাচাই-বাছাইয়ের পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতো। কিন্তু ২০২২ সালের জুলাইয়ে সেই ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নীতিকেই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুনঃতফসিলকৃত ঋণকে ‘স্ট্রেসড’ বা ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ হিসেবে দেখায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। একই সময়ে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতিও ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার বেশি। আবার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো ৬৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের অন্তত এক-চতুর্থাংশ ঋণই ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। খেলাপির খাতায় ওঠা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো গ্রাহক উচ্চ আদালতে মামলা করছেন। এসব মামলায়ও বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকা পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করছেন, ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষমতা পেয়ে তার অপব্যবহার করছে। তার ভাষ্যমতে, ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা নিয়ে আগে অনেক কঠোর অবস্থানে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সিদ্ধান্ত দেয়া হতো কেস-টু-কেস পর্যালোচনা করে। ঋণ পুনঃতফসিলে নির্দিষ্ট অংকের ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু প্রভাবশালী গ্রাহকরা এখন তা করছেন কোনো ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ ছাড়াই। বাছবিচার না করে পুনঃতফসিল করা এসব ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অনাদায়ী সুদ আয়ের খাতে নিয়ে ব্যাংকগুলো যে মুনাফা দেখাচ্ছে, সেটি কাগুজে। এর মাধ্যমে মুনাফা দেখানো ব্যাংকই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রায় দুই বছর দেশের ব্যাংক খাতে ডলার সংকট চলছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই মাধ্যম রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে আসায় ডলার সংকট তীব্র হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রফতানি আয়ে প্রবদ্ধির হার মাত্র ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর একই সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি আটকে রয়েছে দশমিক ১৭ শতাংশে। ডলার সংকট কাটাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) তা আরো ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে।

ডলার সংকটের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতে নগদ টাকার সংকটও এখন তীব্র হয়ে উঠেছে। এ সংকটের কারণে দেশের কলমানি বাজারের সুদহার উঠে গেছে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। গত ২৮ ডিসেম্বর ওভার নাইট বা একদিন মেয়াদি ধারের সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কলমানি বাজারের বিদ্যমান সুদহার এক বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। উচ্চ সুদ ও তীব্র চাহিদা সত্ত্বেও প্রত্যাশা অনুযায়ী কলমানি বাজারে টাকা মিলছে না। এ কারণে বেশির ভাগ ব্যাংক রেপো, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এএলএস) ও লিকুইডিটি সাপোর্ট সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। তিন মাস ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেশের ব্যাংকগুলোর ধার নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে দৈনিক ধারের পরিমাণ ছিল ১৫-২৫ হাজার কোটি টাকা।

আরও