আশুলিয়া-বিমানবন্দর-কমলাপুর

একই গতিপথে চার বড় প্রকল্প, সমন্বয়হীনতায় কাজে ধীরগতি

ঢাকার আশুলিয়া থেকে বিমানবন্দর হয়ে কমলাপুর রুটে বর্তমানে একই সঙ্গে চলমান রয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের চারটি বড় প্রকল্প। এর মধ্যে আশুলিয়া-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দর রুটে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। গাজীপুর-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। বিমানবন্দর-তেজগাঁও-কমলাপুর রুটে চলছে ‘ঢাকা এলিভেটেড

ঢাকার আশুলিয়া থেকে বিমানবন্দর হয়ে কমলাপুর রুটে বর্তমানে একই সঙ্গে চলমান রয়েছে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের চারটি বড় প্রকল্প। এর মধ্যে আশুলিয়া-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দর রুটে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। গাজীপুর-আবদুল্লাহপুর-বিমানবন্দরের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। বিমানবন্দর-তেজগাঁও-কমলাপুর রুটে চলছে ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র কাজ। আর টঙ্গী থেকে কমলাপুরের মধ্যে বিদ্যমান রেলপথের সমান্তরালে নির্মাণ করা হচ্ছে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ। আশুলিয়া-বিমানবন্দর-কমলাপুরের মধ্যে একসঙ্গে চার প্রকল্প চলমান থাকায় সবক’টির নির্মাণকাজে তৈরি হয়েছে ধীরগতি। এজন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি একই স্থানে প্রত্যেক প্রকল্পের জন্য আলাদা আলাদা খুঁটি তৈরি করে বিদ্যমান সড়কের সক্ষমতাও কমিয়ে ফেলা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে যাত্রাবাড়ী-সংলগ্ন চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ‌ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাল ধরা হয়েছিল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। ধীরগতির কারণে কয়েক দফা বাড়িয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। যদিও এ বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয়ের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে ঢাকা-টঙ্গীর মধ্যে বিদ্যমান রেলপথটির সমান্তরালে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ধীরগতির কারণে এ প্রকল্পের মেয়াদও ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

একইভাবে ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুরু হওয়া বিআরটি প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। আর ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ।

একই করিডোরে একই সময়ে চার প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্প। এ প্রকল্পের কাজ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য কয়েক দফায় পিছিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত দুই পাশে মোট ৩২ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেলপথসংলগ্ন এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে। এসব জায়গা সংযোগ রাস্তা হিসেবে মালামাল, নির্মাণ উপকরণ ও নির্মাণকাজের যান চলাচলের জন্য ব্যবহার করছে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ। ফলে এখন পর্যন্ত বনানী থেকে টঙ্গী অংশে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ শুরু করতে পারেনি রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. কামরুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যে অংশে নতুন দুটি রেলপথ নির্মিত হবে, তার একটি বড় অংশজুড়ে বর্তমানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে। ফলে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের কাজ শেষ করে জায়গাটি বুঝিয়ে দিলে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হবে।’ রেলপথ সম্প্রসারণের এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের কারণে বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়ার মধ্যে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজও বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক গু ফেং জানিয়েছেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি বিমানবন্দর এলাকায় সংযুক্ত করা হবে। বিমানবন্দর এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড রয়েছে তা ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু তারা কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড ও সংলগ্ন জায়গা এখনো পায়নি। এ কারণে বিমানবন্দর এলাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে প্রকল্পটির কাজ।

বিমানবন্দর গোলচত্বরে বিআরটি প্রকল্পের একটি ডিপো নির্মাণেও দেখা দিয়েছে জটিলতা। ডিপোর জন্য বিআরটি কর্তৃপক্ষ যে জায়গা নির্বাচন করেছে, তার মালিকানা দাবি করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বাংলাদেশ রেলওয়ে।

ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম জানান, প্রস্তাবিত বিআরটি বাস টার্মিনালের জায়গাটি উদ্ধার ও রেকর্ড সংশোধনের জন্য একটি মামলা চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে বিআরটি ও বেবিচকের কর্মকর্তারা জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। তারা একটি প্রতিবেদন দেবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে টার্মিনালের নকশা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে। নকশা চূড়ান্ত হলে আলোচনার ভিত্তিতে টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।

আগামী বছরের জুনের আগে বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৮৫ শতাংশ। গাজীপুর চৌরাস্তায় একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, যেটির জন্য আরেকটু সময় দরকার হতে পারে। আরেকটি ফ্লাইওভার তৈরি হচ্ছে ভোগড়া চৌরাস্তায়। এ ফ্লাইওভার অনেক জটিল। এ ফ্লাইওভারের নিচের অংশের কাজ মোটামুটি শেষ। ওপরের অংশ হতে আরেকটু সময় লাগবে।’

চলমান এ চার বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেহেতু একই এলাকায় এবং প্রায় একই সময়ে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, এখানে সবচেয়ে জরুরি ছিল সবগুলোর কাজে সমন্বয়। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিটি প্রকল্প আলাদাভাবে করা হচ্ছে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। ফলে সবগুলো প্রকল্প যে বিলম্বিত হচ্ছে, তা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।’

ড. সামছুল হক বলেন, ‘‌এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও বিআরটি একই পথে রয়েছে। দুটি প্রকল্পের উড়ালপথ রয়েছে, যার জন্য বিদ্যমান সড়কের ওপর খুঁটি তৈরি করা হয়েছে। একই সড়কে বিআরটির জন্য আলাদা খুঁটি, আবার এক্সপ্রেসওয়ের জন্যও আলাদা খুঁটি। একটা সময় ঢাকার সবচেয়ে প্রশ্বস্ত রাস্তা ছিল এটা। কিন্তু এ রাস্তায় একটার পর একটা খুঁটি বানিয়ে সক্ষমতা নষ্ট করা হচ্ছে। আমরা উন্নত বিশ্বে দেখি একটি খুঁটির ওপর একাধিক কাঠামো। আমাদের এখানেও এমনটি করা যেত। পরিকল্পনা কমিশনে যেহেতু সবগুলো প্রজেক্ট গেছে, তারা কিন্তু সিঙ্গেল খুঁটির ওপরে মাল্টিপল প্রজেক্ট করার উদ্যোগ নিতে পারত। আর একটি খুঁটির ওপর মাল্টিপল প্রজেক্ট করার ধারণা নতুন নয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ বছর ধরে এভাবে কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু তা না করে আমরা আলাদা আলাদা খুঁটি দিয়ে রাস্তার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছি।’

আরও