প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে রেসকোর্সের বিকাল

মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল। বাড়তি কোনো আড়ম্বর নেই। পাশাপাশি বসে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের প্রতিনিধি জেনারেল নিয়াজি ও জগজিৎ সিং অরোরা। সেখানেই সামান্য সময়ের মধ্যে ফয়সালা হয়ে গেল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ভবিষ্যৎ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার পরিচিতি ছিল বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের অঞ্চল। উয়ারী বটেশ্বরের পত্তন থেকে শুরু করে ‘‌লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ পর্যন্ত বাঙালি জাতির

মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল। বাড়তি কোনো আড়ম্বর নেই। পাশাপাশি বসে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের প্রতিনিধি জেনারেল নিয়াজি ও জগজিৎ সিং অরোরা। সেখানেই সামান্য সময়ের মধ্যে ফয়সালা হয়ে গেল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ভবিষ্যৎ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার পরিচিতি ছিল বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের অঞ্চল। উয়ারী বটেশ্বরের পত্তন থেকে শুরু করে ‘‌লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ পর্যন্ত বাঙালি জাতির যত হাসি, কান্না, শান্তি ও বিদ্রোহ—সমস্তটাই যেন এবার একটা নাম পেল। বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম মানচিত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ। যতদিন বাংলা ও বাঙালি থাকবে, ততদিন মনে থাকবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকালের কথা। যেমনটা ভুলতে পারেননি সেদিন যারা রেসকোর্সের ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সবুজ ঘাসে উপস্থিত ছিলেন। বাঙালিদের পাশাপাশি পরবর্তী জীবনে সেই দিনের স্মৃতিচারণ করেছেন জড়িত পাকিস্তানি ও ভারতীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।  

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেদিন নিয়াজি ও অরোরা ছাড়াও হাজির ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকার, পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব এবং যৌথ বাহিনীর প্রধান স্যাম মানেকশ। ঘটনার সাক্ষী ছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। সেই সব মানুষদের বয়ান ও সংবাদমাধ্যমে ঢুঁ মারলে দিনটিকে দেখা খুব একটা কঠিন কাজ না। মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে ময়দানে উপস্থিত থাকা এ কে খন্দকার তার ‘‌১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ গ্রন্থের ২১০ পৃষ্ঠায় বলছেন, ‘‌রমনার চারপাশে মানুষের ব্যাপক ভিড়। এমন পরিস্থিতিতে ভিড় ঠেলে আমরা উপস্থিত হলাম রমনা ময়দানের সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে। অনুষ্ঠানটি ছিল অনাড়ম্বর এবং এটি অল্প সময়ে শেষ হয়। অনুষ্ঠানে মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল ছিল। একটি চেয়ারে জেনারেল নিয়াজি ও অন্যটিতে জেনারেল অরোরা বসলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি খুব সুশৃঙ্খলভাবে হয়নি। মানুষের ভিড়ে অতিথিদের দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন ছিল। আমি, ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল এস এম নন্দা ও পূর্বাঞ্চল বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চান্দ দেওয়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাশেই ছিলেন পূর্বাঞ্চল সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল এফ আর জ্যাকব। আমি জেনারেল অরোরার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অশোক রায় আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যদিও ভিড়ের চাপে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছিলাম না। 

আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে আসা হলো। প্রথমে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান জেনারেল নিয়াজি এবং পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা দলিলে স্বাক্ষর করলেন। স্বাক্ষরের জন্য নিয়াজিকে কলম এগিয়ে দেন অরোরা। প্রথম দফায় কলমটি দিয়ে লেখা যাচ্ছিল না। অরোরা কলমটি নিয়ে কিছু ঝাড়াঝাড়ি করে পুনরায় নিয়াজিকে দেন। এ দফায় কলমটি আর অসুবিধা করেনি। পরে জেনেছি, ওই দিন শুধু আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার জন্যই অরোরা কলকাতা থেকে কলমটি কিনে এনেছিলেন। স্বাক্ষর শেষ হলে উভয়েই উঠে দাঁড়ান। তারপর আত্মসমর্পণের রীতি অনুযায়ী জেনারেল নিয়াজি নিজের হাতের রিভলবারটি কাঁপা কাঁপা হাতে অত্যন্ত বিষণ্নতার সঙ্গে জেনারেল অরোরার কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের কর্ডন করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। 

আত্মসমর্পণের পর ঢাকায় নয় মাস ধরে অবরুদ্ধ থাকা জনতা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে; কয়েকজন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আমরা কোন কথাই বলতে পারছিলাম না। আবেগে সবাই বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর অনেকে বলল, ‌আহ! আজ থেকে আমরা শান্তিতে, নির্ভয়ে ঘুমাতে পারব।’

স্বাভাবিকভাবেই লাখো মুক্তিযোদ্ধার মতো এ কে খন্দকারের চোখেও সময়টা গৌরব ও সম্মানের। তাদের চোখে-মুখে তখন উচ্ছ্বাস। কিন্তু বিপরীত শিবিরে তখন ছেয়ে ছিল উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে জেনারেল নিয়াজির জন্য দিনটি ছিল অপমান আর গ্লানির। তার সারা জীবনে নির্মিত গৌরবের স্তম্ভ সে বিকালে ধসে পড়ছে মাটিতে। তিনি কাঁপছিলেন এবং কাঁদছিলেন। সে বর্ণনা সীমিত পরিসরে হলেও উঠে এসেছে তার লেখা ‘‌দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে। ২৯৩ পৃষ্ঠায় তিনি বলছেন, ‘‌মেজর জেনারেল ফরমান ও অ্যাডমিরাল শরিফ এ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। আমি কাঁপা হাতে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করি। তখন আমার অন্তরে উত্থিত ঢেউ দুচোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানের একটু আগে একজন ফরাসি সাংবাদিক এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন আপনার অনুভূতি কি টাইগার? জবাবে বললাম, আমি অবসন্ন। অরোরা পাশেই ছিলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, এক চরম বৈরী পরিবেশে তাকে এক অসম্ভব দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কোনো জেনারেলই এ পরিস্থিতিতে এর চেয়ে ভালো করতে পারত না।’  

মাঠের সে সময়টুকু পরবর্তী জীবনে স্মরণ করেছেন জেনারেল জ্যাকব ফ্রেডারিক রালফ জ্যাকব, যিনি জে এফ আর জ্যাকব নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি তখন মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা। পালন করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘‌সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ এবং ২০১১ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীধর্মী ‘‌অ্যান ওডিসি ইন ওয়ার অ্যান্ড পিস: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ উভয় বইয়ে উঠে এসেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই বিকালের চিত্র। সারেন্ডার অ্যাট ঢাকায় তিনি লিখেছেন, ‘‌গাড়ি রওয়ানা দিয়ে দিলে আমিও অন্য গাড়িতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে রেসকোর্স ময়দানের দিকে যাত্রা করি। আয়োজনের জন্য সময় খুব কম থাকা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি মোটামুটি ভালোভাবে সম্পন্ন হয়। গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর অরোরা ও নিয়াজি টেবিলের দিকে এগিয়ে যান। অরোরার নিয়ে আসা আত্মসমর্পণের দলিল টেবিলের ওপরে রাখা হয়। নিয়াজি সেটার ওপরে কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে নিয়ে সই করেন। অরোরাও সই করেন। দলিলের ওপরে সতর্ক দৃষ্টিপাত করার সময় এটার শিরোনাম লক্ষ করে আমি হতবুদ্ধি হয়ে যাই। সেখানে লেখা আছে ‘‌Ins trument of Surrender - To Be Signed at 1631 Hours IST (Indian Standard Time)’। ঘড়ির দিকে চোখ ফেলে দেখি, সময় তখন বিকাল চারটা পঞ্চান্ন মিনিট। এরপর নিয়াজি তাঁর কাঁধ থেকে এপলেট (epaulette) সেনা অধিনায়কদের সম্মানসূচক ব্যাজ) খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়ার্ড (lanyard) ছোট দড়িবিশেষ)-সহ দশমিক ৩৮ রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তাঁর চোখে অশ্রু দেখা যাচ্ছিল। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজিবিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান ও গালিগালাজ দিতে থাকে। রেসকোর্সের আশেপাশে তেমন কোনো সৈন্য না থাকায় নিয়াজির নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত ছিলাম। আমরা কয়েকজন সিনিয়র অফিসার মিলে নিয়াজির জন্য একটি বেষ্টনী রচনা করে তাঁকে পাহারা দিয়ে একটি ভারতীয় জিপের কাছে নিয়ে যাই। পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বন্দিদেরকে ভারতে নিয়ে যাবার ব্যাপারে সগত সিংকে আমি ব্রিফ করি। এর পরে আগরতলায় যাবার উদ্দেশ্যে আমরা ঢাকা বিমানবন্দরে আসি।’

পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন সিদ্দিক সালিক। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের চালচিত্র উঠে এসেছে তার ‘‌উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে। সেই মুহূর্তকে তিনি ২১১ পৃষ্ঠায় চিত্রিত করেছেন এভাবে, ‘‌চিৎকার আর স্লোগানের মধ্য দিয়ে তারা রমনা রেসকোর্সে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এলেন যেখানে আত্মসমর্পণের ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মঞ্চ সাজানো হয়েছিল। বিশাল সেই উদ্যান আবেগী বাঙালী জনতার কলনাদে মুখরিত হয়ে উঠেছিল। বিজেতাকে গার্ড অব অনার দেয়ার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ছোট কন্টিনজেন্ট ঘিরে দাঁড়াল আর ভারতীয় সেনাদলের একটি বিচ্ছিন্ন দল বিজিতদের গার্ড দিল। প্রায় দশ লক্ষ বাঙালী ও প্রচুরসংখ্যক বিদেশী সাংবাদিকের চোখের সামনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণের চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করলেন। তারপর তারা দুজনেই উঠে দাঁড়ালেন। ঢাকার আত্মসমর্পণের নিদর্শন হিসেবে জেনারেল নিয়াজি তার রিভলভার বের করে অরোরার কাছে হস্তান্তর করলেন। এর সাথেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানকে হস্তান্তর করলেন।’

বইয়ের বাইরে গিয়ে দিনটির কথা উঠে এসেছে গণমাধ্যমেও। সবচেয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। ১৭ তারিখে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের একটির নাম ‘‌টু মেন অ্যাট আ টেবিল’। আলোচনা যথেষ্ট সাহিত্যরস সমৃদ্ধ। প্রতিবেদক দাবি করেছেন, ‘ঢাকার ঘাসভর্তি রেসকোর্স মাঠটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করল পাকিস্তানি বাহিনী। ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করার ১৩ দিন পর ঘটনাটি ঘটছে। এটা সেই মাঠ, যেখানে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান লাখো বাঙালির সামনে সামরিক শাসনের সমাপ্তির দাবি জানিয়েছেন। দাবি জানিয়েছিলেন ক্ষমতাকে সংখ্যাগুরু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের হাতে হস্তান্তর করার জন্য। আজ সেখানে কোন বক্তব্য নেই। কেবল দুজন ব্যক্তি বসে আছেন একটি টেবিলের সামনে। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পূর্ব পাকিস্তানে ৭০ হাজার সৈন্যের কমান্ডার লেফটেনেন্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি। আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করা হলো। আরো বলা হয়েছে, ‘‌সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ আগে ১০টি ভারতীয় হেলিকপ্টার এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো। তারা জেনারেল অরোরা ও অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে কোলকাতা থেকে পৌঁছেছে। প্রত্যেকেই উপস্থিত হলো আত্মসমর্পণের আয়োজনে। নিয়াজির মর্যাদাপূর্ণ মূর্তি যেন কালিমালিপ্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।’ 

১৬ ডিসেম্বর বিকাল শেষে সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছে, সত্যিকার অর্থেই যেন অস্ত যাচ্ছে বহিঃশক্তির শাসন। পাকিস্তান একটা সূর্যাস্ত হিসেবেই বর্ণনা করেছে সময়টাকে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে ময়দান ঘিরে বাঙালির উল্লাসের চিত্র প্রমাণ করে, ‘‌সেটা ছিল বাঙালি জাতির আকাশে সত্যিকারের সূর্যোদয়।’ 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক

আরও