ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) ব্যাংকিং জগতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি একটি মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচি, যা গ্রামের নিম্ন আয়ের নারী ও পুরুষদের আর্থিক সেবা প্রদান আর নৈতিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক মর্যাদা সৃষ্টির জন্য কাজ করে থাকে। গ্রামের দুস্থ ও কর্মঠ নারী-পুরুষের আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে ইসলামী শরিয়াহ ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা করে আরডিএস। ইসলামী ব্যাংক গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের শুধু অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করে না, নৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক সচেতনতা বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে যথার্থ পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টির কাজ করে থাকে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ আত্মপ্রকাশ করে। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষসহ সব শ্রেণীর লোকদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষ ৪০ শতাংশ। মোট দারিদ্র্যের মধ্যে ১৮ শতাংশ নিরক্ষরতা, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ঝুঁকি ও গ্রামীণ-শহুরে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে, যার মাধ্যমে গ্রামীণ-শহুরে বৈষম্য হ্রাস এবং আয়ের ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামী ব্যাংক ১৯৯৫ সালে ৩১ জুলাই দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সুযোগ সৃষ্টি করতে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু করে।
আরডিএস হচ্ছে কোনো ব্যক্তি অথবা কিছু গ্রামীণ দরিদ্র সদস্যকে সমিতিবদ্ধ করে জামানতবিহীন অল্প পরিমাণ মূলধন ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা। যার মাধ্যমে স্ব-কর্মসংস্থান তৈরি করে, সংসারের স্বাভাবিক আয়ের সঙ্গে বাড়তি আয় সৃষ্টি করে। মোটাদাগে এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে জামানতবিহীন অল্প পুঁজি, দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীরা হচ্ছে এর প্রধান গ্রহীতা। ব্যক্তি বা সমিতি দুটোর মাধ্যমে লেনদেন হয়। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ, আয় থেকে ঋণের দায় পরিশোধ, স্বকর্মসংস্থান বা মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নিয়মিত সাপ্তাহিক সভায় নির্দিষ্ট একটি স্থানে লেনদেন যা আরডিএস কেন্দ্র নামে অভিহিত করা হয়। সদস্য ও সদস্যদের দোরগোড়ায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য ইসলামী ব্যাংকের ফিল্ড অফিসার তথা কর্মকর্তারা আরডিএস সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে সেবা নিশ্চিত করেন।
এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের কৃষি ও অকৃষি খাত সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক খাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিনিয়োগ প্রদান, বিনিয়োগ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মহিলাদের সরাসরি উৎপাদনে সম্পৃক্তকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার বিস্তার, দৈনন্দিন জীবনমান, প্রান্তিক চাষী, ভূমিহীন, দরিদ্র ও শ্রমজীবী নারী ও পুরুষকে ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য অব্যাহত বিনিয়োগ সহায়তা প্রদান এবং মহাজনি ও চড়া সুদে টাকা লগ্নি ইত্যাদি শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।
ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ প্রকল্পের অধীনে গ্রাহকরা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার (বিশেষ ক্ষেত্রে ৩ লাখ) টাকার বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। মৎস্য চাষ, কৃষি যন্ত্রপাতি, সেচ যন্ত্রপাতি, প্রাণিসম্পদ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক বাণিজ্যিক উৎপাদন, গ্রামীণ পরিবহন, গ্রামীণ বেকার যুবক এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের আত্মকর্মসংস্থান এবং আয়ের উৎপাদক কার্যক্রমের জন্য বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে। তাছাড়া পল্লী আবাসনের জন্য এ প্রকল্পের আওতায় এইচপিএসএমের মাধ্যমে বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করা হয়। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষা সেবা এবং নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও মেডিকেয়ার সুবিধা প্রদান করা। পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র, ভূমিহীন, শ্রমজীবী ও গরিব চাষীদের সংঘবদ্ধ করে তাদের মধ্যে পুঁজি বিনিয়োগ, নৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রযুক্তিজ্ঞান ও দক্ষতা লাভে সহায়তা বা উৎসাহিত করা। গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতে ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্প সরাসরি ভূমিকা রাখছে। আরডিএসের ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম পল্লী অঞ্চল থেকে শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। শহরাঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা এবং গ্রামাঞ্চলে বিপুল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামী ব্যাংক প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে, যা দেশের দারিদ্র্য নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
আরডিএস ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৬৪টি জেলার ৩২ হাজার ৬৩৮টি গ্রামে ব্যাংকের ৩৩৭টি শাখা ও ১৭টি উপশাখা মিলিয়ে মোট ৪১ হাজার ৪৯২টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সদস্য সংগঠিত করে ক্ষুদ্র আর্থিক সেবায় এনেছে প্রায় ১৬ লাখ ৮৬ হাজার ৪৩ পরিবারকে। যার মধ্যে ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯২ জন সরাসরি আরডিএস থেকে বিনিয়োগ নিয়েছেন, যার মধ্যে ৯২ শতাংশ নারী। বর্তমানে এ প্রকল্পের বিনিয়োগ স্থিতি ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত, জামানতবিহীন ঋণগ্রহীতাদের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, দুর্নীতিমুক্ত ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থার ফলে আদায়ের এ উচ্চ হার বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আরডিএসের এ বিনিয়োগ কার্যক্রম আরো ১০-১২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে।
আরডিএস রেমিট্যান্স আনতে বিরাট ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদী ভাঙা অঞ্চলের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া বাসযোগ্য বাড়িঘর নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সামাজিক বনায়ন, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন স্থাপন—এসব ক্ষেত্রে আরডিএসের প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আরডিএসের নারী সদস্যরা সবচেয়ে বড় গ্রাহক, যারা প্রতি সপ্তাহে দলীয় সভায় অংশ নেন, পণ্যসামগ্রী বেচাকেনায় বাজার ও শহরমুখী হন। নারীরা পরিবারের গণ্ডি থেকে বের হয়ে সামাজিকভাবে তাদের অবস্থান ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণের উপার্জিত আয়ের একটি অংশ গ্রহীতার সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য ব্যয় করছে। বিশেষ করে মেয়ে সন্তানদের। তাই শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের অনুপাত প্রায় সমান সমান। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা একাডেমিক ফলাফল ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। শিক্ষা প্রসারের সাফল্যে মেয়ে শিশুদের বাল্যবিবাহও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি ও তার বাস্তব রূপ প্রকাশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আরডিএসের মাধ্যমে আরো কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। যেমন উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হিসেবে সদস্যদের বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড। অর্থাৎ ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, মৎস্য চাষ ইত্যাদির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া। আত্মকর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সদস্যদের সন্তানদের কম্পিউটার, মোবাইল সার্ভিসিং, টেইলারিং, ইলেকট্রিকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ দেয়। শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য প্রকল্প সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা উপহার দেয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে টিউবওয়েল ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন, গরিব সদস্যদের জটিল অসুস্থতায় চিকিৎসা সহায়তা দেয়া। দুর্দশাগ্রস্ত পরিবারকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন করা। মানবিক সহায়তা হিসেবে হতদরিদ্রদের কর্জে হাসানা প্রদান, মৃত সদস্যদের দাফন ও সৎকার সম্পাদনে সহায়তা করা। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ, দুর্যোগ মোকাবেলায় বেড়িবাঁধ দেয়া ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির কাজে এ প্রকল্প কাজ করে থাকে।