দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুযায়ী গত বুধবার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৬ কোটি বা ১৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে দেশের নিট রিজার্ভ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অক্টোবর দেশের রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ১৫ নভেম্বর তা নেমে আসে ১৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। এ হিসাবে প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ১৩৫ কোটি ডলার কমেছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধের পর রিজার্ভের পরিমাণ এতটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ মজুদ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, ওই সময় রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এর পরই ক্ষয় শুরু হয়। গত দুই বছর প্রতি মাসে রিজার্ভ কমেছে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় পরিশোধের জন্য প্রতি মাসে অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়েও রিজার্ভের ক্ষয় বাড়ছে। গত অর্থবছরে মজুদ থেকে রেকর্ড সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইএমএফ থেকে ঋণপ্রাপ্তির শর্ত হিসেবেই তা করা হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে আইএমএফের সদস্যদেশগুলো ব্যালান্স অব পেমেন্টস ও ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম৬) অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাবায়ন করে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদিও তা শুরু করতে সময় নিয়েছে প্রায় এক যুগ।
বিপিএম৬ মূলনীতি অনুযায়ী হিসাব করা রিজার্ভও বাংলাদেশের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ নয়। নিট রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফ থেকে নেয়া এসডিআরসহ স্বল্পমেয়াদি বেশকিছু দায় বাদ দেয়া হয়। সে হিসাবে দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ এখন ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতিতে ১৫ নভেম্বর দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ২৫ দশমিক ২৬ বিলিয়ন দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি দায় মেটানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সহায়তা দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ কারণে রিজার্ভ কমছে। তবে আশা করছি, আগামী বছরের শুরুর দিকে রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করবে।’
দেশের অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ডলারের বিনিময় হার বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। গত বছরের জানুয়ারিতেও দেশের ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত দর অনুযায়ী প্রতি ডলার ১১১ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। যদিও ঘোষিত দরে দেশের ব্যাংকগুলোয় ডলার মিলছে না। আমদানিকারকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি ১২৪-১২৫ টাকাও আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে হিসেবে এ সময়ে ডলারের বিনিময় হার বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। আর কার্ব মার্কেটে (খুচরা বাজার) প্রতি ডলারের মূল্য ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
ডলার সংকট কমাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানির লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার শর্ত কঠোর করা হয়। ব্যাংকগুলোও ডলার সংকটের কারণে নিজেদের এলসি খোলা কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থবছর শেষে আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ কমে যায়। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানির পরিমাণ কমেছে ২৩ দশমিক ৯০ শতাংশ।
আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাওয়ার পরও দেশে যে পরিমাণ ডলার ঢুকছে, বেরিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এ কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বড় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আর্থিক হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯৩ কোটি ডলার। দেশের ইতিহাসে এ পরিমাণ ঘাটতি এর আগে কখনই দেখা যায়নি। আর্থিক হিসাবে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় থামানো যাচ্ছে না। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো বেশি নাজুক হয়ে উঠছে।
কোনো দেশে আন্তর্জাতিক সম্পদের মালিকানা বাড়া বা কমার বিষয়টি পরিমাপ করা হয় আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে। এ হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়ে। চলতি শতকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদেশের আর্থিক হিসাব উদ্বৃত্ত ছিল। বিশেষ করে ২০১০ সাল-পরবর্তী এক যুগে কখনই আর্থিক হিসাবে ঘাটতি দেখা যায়নি। কিন্তু ডলার সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। গত অর্থবছর শেষে এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে ১ হাজার ৫৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, দেশের অর্থনীতির জন্য যখন যেটি করা দরকার, সেটি করা হচ্ছে না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণেই দেশের আর্থিক খাতে পুরোপুরি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রিজার্ভ যত দ্রুত কমছে, তাতে ডিসেম্বর কিংবা আগামী জুনে গিয়ে দেশের অর্থনীতি কোথায় দাঁড়াবে, সেটি অনুমানও করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার ধরে রাখার কারণেই রিজার্ভের ক্ষয় ত্বরান্বিত হচ্ছে।’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এ নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, ‘রিজার্ভের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এর বড় অংশ এখন চলে গেছে হুন্ডির বাজারে। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে না দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশ থেকে টাকা পাচারের পথও বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখন বিনিময় হার ধরে রাখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিকই বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তখন এক ধাক্কায় টাকার বড় অবমূল্যায়ন হবে, মূল্যস্ফীতিও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে।’