বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে মাগুরা টেক্সটাইল মিল

অব্যাহত লোকসানে কয়েক দফা বন্ধ হয়েছে মাগুরা টেক্সটাইল মিলস। সর্বশেষ ২০১৭ সালে কারখানাটি চালু করা হলেও দুই বছরের মাথায় ২০১৯ সালে আবারো বন্ধ হয়ে যায়।

অব্যাহত লোকসানে কয়েক দফা বন্ধ হয়েছে মাগুরা টেক্সটাইল মিলস। সর্বশেষ ২০১৭ সালে কারখানাটি চালু করা হলেও দুই বছরের মাথায় ২০১৯ সালে আবারো বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তি শেষের আগেই লোকসানের অজুহাত তুলে উৎপাদন বন্ধ করে দেয় কারখানা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলী ট্রেডার্স। এর পর থেকেই বন্ধ রয়েছে সুতা তৈরির এ কারখানা। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থেকে মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি)। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি) মাধ্যমে এটি চালু করা হবে। এ লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২০ নভেম্বর দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।

এর আগেও দুবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে জানান মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর। সম্প্রতি তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিটিএমসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী ফিরোজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারখানা চালুর জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয়া যাবে। আমরা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি পিপিপির মাধ্যমে কারখানাটি পরিচালনার জন্য। এ পদ্ধতিতে কারখানা পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকেও নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।’

মাগুরা টেক্সটাইল মিলস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে মাগুরা পৌরসভার ভায়না এলাকায় ১৬ দশমিক ১৭ একর জায়গার ওপর কারখানাটি নির্মিত হয়। সে সময় কারখানা নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৫১ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা। শুরুতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক মিলিয়ে জনবল ছিল ৯৮৩ জন। প্রতিষ্ঠার প্রায় পাঁচ বছর পর কারখানাটি ১৯৮৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে।

বিটিএমসি নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাটি চালুর দুই-তিন বছর ভালোই চলছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং তৎকালীন সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে তিন বছরের মাথায় লোকসানে পড়ে। অব্যাহত লোকসানের মুখে কারখানাটি ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বেচ্ছায় অবসরে পাঠানো হয়।

যদিও ২০০০-০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় আট বছর কারখানাটি সার্ভিস চার্জ (নো ওয়ার্ক, নো পে) ভিত্তিতে কোনো রকমে চালু ছিল। সেটাও সফল না হওয়ায় ২০০৮ সালের ১৭ আগস্ট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার প্রায় নয় বছর পর ২০১৭ সালে নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেয় বিটিএমসি। সে সময় দরপত্রে অংশ নিয়ে মেসার্স আলী ট্রেডার্স দুই বছরের জন্য বন্দোবস্ত পায়। তবে চুক্তি শেষের আগেই লোকসানের অজুহাত তুলে ২০১৯ সালে আলী ট্রেডার্সও কারখানায় সুতা তৈরি বন্ধ করে দেয়।

বিটিএমসি সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ২০২২ সালের ২৮ জুন মাগুরা সার্কিট হাউজে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিটিএমসির চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কারখানা আবারো চালুর ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। কারণ বিনিয়োগকারী এখানে ব্যাংক ঋণ বাদে সব সুবিধাই পাবেন। প্রথমত, কারখানাটির অবস্থান খুবই সুন্দর জায়গায়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মাগুরা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে যাতায়াতের সময়ও কমে এসেছে। এছাড়া পায়রা, মোংলা বন্দর কাছে। দ্বিতীয়ত, নিষ্কণ্টক জমি পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তৃতীয়ত, সস্তায় শ্রমিক পাচ্ছেন। তবে এটা যেহেতু সরকারি জমি, তাই বিনিয়োগকারী ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিতে পারবেন না। যদিও এ বিষয়েও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে।’

কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কারখানায় যেসব মেশিনারিজ ও অন্য সরঞ্জাম রয়েছে, সেগুলো প্রায় ১০০ বছর পুরনো মডেলের। মেশিনারিজগুলো রোমানিয়া থেকে আনা হয়েছিল।  বর্তমানে বিভিন্ন টেক্সটাইল মিলে আধুনিক মেশিনারিজ ব্যবহার করা হয়। ফলে রোমানিয়ান ওই পুরনো মেশিনে উৎপাদিত সুতার চাহিদা কম। পুরনো মেশিন হওয়ায় বিদ্যুৎ খরচও বেশি। এ কারণে মিলটি বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় স্থাপনাগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিটিএমসির কর্মকর্তারা বলছেন, এখানে বিনিয়োগকারী চাইলে সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলতে পারবেন। সুতা থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক অথবা অন্য যেকোনো ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো বাধা থাকবে না।

বিএমটিসি কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে ৩০ বছরের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে চুক্তি করতে চায় সরকার। যেখানে দরপত্রের নিরাপত্তা জামানত হিসেবে বিনিয়োগকারীকে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাতে হবে। এরপর সর্বোচ্চ দরদাতাকে চুক্তির সময় ৩০ বছরের জন্য পারফরম্যান্স সিকিউরিটি আড়াই কোটি টাকা এবং চুক্তিমূল্য সাড়ে ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। কারখানা স্থাপন ও সংস্কারে তিন বছর সময় পাবেন বিনিয়োগকারী। এরপর বেসরকারি বিনিয়োগকারীকে প্রতি বছর সরকারকে কমপক্ষে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা দিতে হবে।

কারখানার সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, কারখানাটি মাগুরা-যশোর সড়কের পাশে প্রতিষ্ঠিত। এ অঞ্চলে এমন পরিবেশ আর বিশাল জায়গাজুড়ে কোনো কারখানা নেই। এখানে শ্রমের বাজারও সস্তা। তাই আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কারখানা নতুন করে পরিকল্পিতভাবে চালু করা গেলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

আরও