প্রতিদিন যে হারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে তাতে শুধু শঙ্কাই নয়, যুদ্ধের ভয়াবহতা বিরাজ করার কথা। কিন্তু সবার মাঝেই কেন জানি মনে হচ্ছে উদাসীন উদাসীন ভাব। যে পরিবারের সদস্য মৃত্যুবরণ করছে সেই পরিবার অস্থি-মজ্জায় অনুভব করছে বেদনা আর কষ্টের গভীরতা কতটুকু। কতটা নির্মমতা আর দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত স্বজন হারানো পরিবার। এ নিষ্ঠুর পরিণতির ভবিষ্যৎ কোথায়। আমরা অনেকে অনেক কথাই বলছি, কিন্তু বাস্তবে কী চিত্র দেখছি ও বরণ করছি। এর লাগাম কীভাবে টানা যাবে। অন্যান্য দেশ কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে অভূতপূর্ব সফলতা পেয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ডেঙ্গুপ্রবণ দেশগুলোর তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রাজিলে আক্রান্তের হার অনেক হলেও মৃত্যুহার অনেক কম (শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ), একইভাবে আর্জেন্টিনা (শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ), মালয়েশিয়া (শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ), ভারত (শূন্য দশমিক শূন্য ৯৭ শতাংশ), বলিভিয়া (শূন্য দশমিক শূন্য ৩০ শতাংশ), পেরু (শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ) এবং সর্বোচ্চ মৃত্যুহার বাংলাদেশে (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ)।
২০০০ হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ২০০০-১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৪১৫ এবং মৃত্যুবরণ করেছিল ২৩৪ জন, যেখানে মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৯৫৮ শতাংশ এবং ভারতে মোট আক্রান্ত ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৫০২ জন এবং মৃত্যু সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২ এবং মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। একইভাবে ২০১১-২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট আক্রান্ত ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ জন, মৃত্যু সংখ্যা ছিল ২৯৫ এবং মৃত্যুহার নেমে এসেছিল শূন্য দশমিক ১৬১ শতাংশে এবং ভারতে ২০১১-২১ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ১২৯ জন, মৃত্যু সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৭ জন, মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ১৯৫ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান থেকে এটা সুস্পষ্ট যে ২০০০-১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতের ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ব্যবস্থাপনায় যে ঘাটতি ছিল তা ২০১১-২১ সাল পর্যন্ত দারুণভাবে পুষিয়ে নিয়ে সফলভাবে ডেঙ্গুর লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের পরের অবস্থা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ এবং ভারতের জন্য অত্যন্ত সুখকর। অর্থাৎ ২০২১ সাল হতে বাংলাদেশ ও ভারতের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বিপরীত মেরুতে যেতে থাকে, যা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।
পরিসংখ্যান হতে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে ২০২১ সালের পর হতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহভাবে বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে ভারতে এর তীব্রতা কমতে কমতে এখন তা স্বস্তির মধ্যে চলে এসেছে। এ অভাবনীয় সফলতার কারণ জানাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। পুরো ভারত বিশেষ করে আমাদের দেশের অভিন্ন জলবায়ু, জনসংখ্যা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান যুক্ত কলকাতার অবস্থার কথাই বিশ্লেষণ করা যাক। যে কলকাতাকে ঘিরে উনংবিশ শতাব্দীর কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন ‘রাতে মশা, দিনে মাছি, এ নিয়ে কলকাতায় আছি’। এখন সেই কলকাতা শহর এডিস মশামুক্ত করে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানিকে জয় করেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে তাই বলছি।
কলকাতা পৌরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ড এবং আমাদের ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলে ৭৫+৫৪ = ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। এ ১৪৪টি ওয়ার্ড যদি মাত্র একজন মুখ্য পতঙ্গবিদ, একজন সিনিয়র পতঙ্গবিদ, তিনজন সেন্ট্রাল ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসার, ১৬টি সেন্ট্রাল রÅাপিড অ্যাকশন টিম, ১৬টি বড় ভেক্টর কন্ট্রোল ইনচার্জ তাদের অধীন ১৪৪টি ওয়ার্ড ভেক্টর কন্ট্রোল ইনচার্জের সার্বক্ষণিক তদারকি ও কমিউনিটি এনগেজমেন্টের মাধ্যমে যেভাবে দ্রুতগতিতে এডিস মশার বিস্তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে ডেঙ্গু বিস্তার প্রতিরোধ করতে সফলভাবে সমর্থ হয়েছে, বাংলাদেশে এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগে সত্যিই সফলতার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে অতি অল্প সময় লাগবে বলে আমার বিশ্বাস। হ্যাঁ, তবে এক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করতে গেলে আমাদের কার্য পরিধিতে কর্মপরিকল্পনার কিছু পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধন অত্যন্ত প্রয়োজন। যেমন পরিষ্কার করে বলতে গেলে আমাদের প্রচলিত পদ্ধতিতেই, একই পরিমাণ লোকবলেই এটা সম্ভব। শুধু মানবসম্পদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রায়োগিক বিভাজন প্রয়োজন। আমাদের উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যে ৫৪টি ওয়ার্ড ও ৭৫টি ওয়ার্ড রয়েছে তার প্রতিটি ওয়ার্ডে পাঁচ-ছয়জন প্রশিক্ষিত ওয়ার্ড ভেক্টর দমন কর্মী, একজন চৌকস ইনচার্জের তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন ২৪ ঘণ্টা। প্রতিটি কর্মী নিজ নিজ ওয়ার্ডের প্রত্যেক স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে আপ টু ডেট তথ্য সংগ্রহ এবং মশার প্রজনন স্থল ধ্বংস নিশ্চিতকল্পে প্রতিটি বাড়ির মালিককে এ কাজে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করবেন। এলাকার জন প্রতিনিধি, গণ্যমান্যদের এ কাজে দক্ষতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি বাড়ির চারপাশ, ছাদ ও বাড়ির ভেতরের জমে থাকা পানি নিষ্কাশনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন।
প্রত্যেক সিটি করপোরেশনে যে ১০টি জোন আছে প্রত্যেক জোনে একজন করে চৌকস জোন ভেক্টর ইনচার্জ থাকবেন, যাদের কাজ হবে প্রত্যেক ওয়ার্ড ইনচার্জ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কিনা। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি জোনে আরো একটি করে রÅাপিড অ্যাকশন টিম থাকবে যাদের মূল কাজ হবে সেন্ট্রাল লেভেল এবং ওয়ার্ড লেভেল হতে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।
সিটি করপোরেশনের প্রত্যেকটি জোনে একটি করে ডেঙ্গু বা ভেক্টর ডিটেকশন সেন্টার থাকতে হবে। একইভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাইমারি আরবান হেলথ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যেখানে কমপক্ষে দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকবেন। সেখানে অবশ্যই অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা হবে। এই আরবান প্রাইমারি হেলথ সেন্টারে আগত যেকোনো রোগীকে যদি ডেঙ্গু হিসেবে সন্দেহ হয়, সঙ্গে সঙ্গে তার ব্লাড সেম্পল নিয়ে নিকটবর্তী ডেঙ্গু ডিটেকশন সেন্টারে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু ডিটেকশন সেন্টারে ডেঙ্গু নিশ্চিত হলে সে তথ্য রোগীর ও ডাক্তারের মোবাইল ফোন নম্বর এমআইএস-এ এমনভাবে ডাটাবেজ সেট করা থাকবে যেন একটি ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে জোন ইনচার্জ, সেন্ট্রাল ভেক্টর কন্ট্রোল অফিসার, সিনিয়র কীটতত্ত্ববিদ ও মুখ্য কীটতত্ত্ববিদ, সব কাউন্সিলর, মেয়র মহোদয়, ডিজি হেলথ, পরিচালক সিডিসি এবং স্বাস্থ্য সচিব মহোদয়ের দপ্তরসহ সব স্থানে পৌঁছে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মুখ্য কীটতত্ত্ববিদ তার অধস্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ করবেন, সেন্ট্রাল রÅাপিড অ্যাকশন টিম ওই নির্দিষ্ট জোনে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে রোগীর বাড়ির চারপাশে কমপক্ষে ৫০টি বাড়িতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং অ্যাডাল্ট মশা ধ্বংস করার জন্য যুক্তিযুক্ত অ্যাডাল্টিসাইডের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবেন। একইভাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে যতগুলো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নার্সিং হোম, ক্লিনিক আছে তার প্রত্যেকটিতে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক ঠিক করতে হবে। যার প্রকৃত দায়িত্ব হবে যখনই কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হবে সঙ্গে সঙ্গে তার ঠিকানাসহ সব তথ্য এমআইএসের ওই ডাটাবেজে প্রদান করবে। তার ওপর ভিত্তি করে ওপরের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে ভেক্টর কন্ট্রোল ইনচার্জ প্রতি সপ্তাহে মশক নিধন সপ্তাহ পালন করতে পারলে এ ভয়াবহ অবস্থা হতে পরিত্রাণ সহজ হবে। এভাবে কলকাতা মডেল অনুযায়ী যথাযথ তদারকি ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে আমরা অবশ্যই সফল হব।
ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ; জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)