সাউথ এশিয়া ইকোনমিক সামিট

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানোর তাগিদ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ বসবাস করে। এখানে একটি বড় ভোক্তা বাজার থাকলেও এসব দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য ২৬ শতাংশ। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এ বাণিজ্য ৬২ শতাংশের বেশি। তাই এ অঞ্চলে নিজেদের মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ বসবাস করে। এখানে একটি বড় ভোক্তা বাজার থাকলেও এসব দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য ২৬ শতাংশ। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এ বাণিজ্য ৬২ শতাংশের বেশি। তাই এ অঞ্চলে নিজেদের মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ভয় দূর করে আঞ্চলিক যোগাযোগে গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ১৪তম সাউথ এশিয়া ইকোনমিক সামিটে এসব কথা বলেন তারা।

বনানীর একটি হোটেলে দুইদিনব্যাপী এ সামিটের উদ্বোধনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী এমপি। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি। সভাপতিত্ব করেন সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।

সেমিনারে অংশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মান্দাকিনি কাউল বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বাণিজ্যের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে কম কানেকটেড। কারণ এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশের মতো, যা আসিয়ানে ২৬ এবং ইইউতে ৬২ শতাংশের বেশি। আর এশিয়ার দেশগুলোর জনগণের মধ্যেও যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য তেমন কোনো প্লাটফর্ম নেই। যদিও এখন আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে।’ তাই ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণে তিনি আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রতি জোর দেন। 

ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কভিড-১৯ এবং চলমান যুদ্ধের প্রভাব থেকে নিজেদের পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে। দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য নিয়মিত আলোচনার আয়োজন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।’ এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভয় দূর করতে হবে। দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক কাগজপত্র ও ভিসাসংক্রান্ত নানা জটিলতা রয়ে গেছে। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে। এসব নিয়ে দেশগুলোর সরকারকে অনবরত কাজ করে যেতে হবে।’ 

বর্ষীয়ান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ভারতের বাজার নিয়েও আমাদের আলোচনা করা দরকার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হলেও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক হচ্ছে না। অথচ একসময় দক্ষিণ এশিয়া ছিল ইউরোপের চেয়েও বেশি সংযুক্ত। ’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন বেশকিছু সংকট মোকাবেলা করছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা নিয়েছে। তিনটি দেশ নিম্ন আয়ের দেশের গণ্ডি পেরোনোর চেষ্টা করছে। তবে স্মুথ গ্র্যাজুয়েশন একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর রাজনৈতিক কারণে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও থমকে আছে। আঞ্চলিক সহায়তার ক্ষেত্রগুলোকে পর্যালোচনা করতেই এ সামিটের আয়োজন করেছে সিপিডি।’

ভারতীয় গবেষণা সংস্থা আরআইএসের পরিচালক প্রফেসর সচিন চতুর্ভেদি বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৬ শতাংশ অবদান রাখছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। মন্দার সময়ও এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এফডিআই বাড়ছে, সেই সঙ্গে মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে।’

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ইশরাত হোসেন বলেন, ‘টেকসই অর্থনীতি বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় গণতন্ত্র। বর্তমানে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এখনো ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে আছে। ’

নেপালের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব দুর্গা বাট্টারি বলেন, ‘নেপালে ভূমিকম্প হলে তা ভারতেও প্রভাব ফেলে। সুতরাং আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে ভৌগোলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। খাদ্য নিরাপত্তায় কাজ না করে আমরা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিচ্ছি। অথচ এটি একটি মানবিক ইস্যু। দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা আঞ্চলিক মুদ্রা চালুর পদক্ষেপ নিতে পারি। এডিবি ও বিশ্বব্যাংক আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করলেও আমাদের পদক্ষেপ কী তা নিয়ে ভাবা উচিত।’ 

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘‌সামষ্টিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং একক মুদ্রা প্রচলনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হাসান বলেন, ‘রাশিয়া ও চীন তাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ লেনদেন নিজস্ব মুদ্রায় করছে। ২০০০ সালেও বিশ্ববাণিজ্যের ৭২ শতাংশ লেনদেন হতো ডলারে। এখন তা ৫৯ শতাংশ নেমে এসেছে। তবে লাতিন আমেরিকারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখনো আঞ্চলিক মুদ্রার ধারণা তেমন জনপ্রিয় হয়নি। ’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে রুপিতে লেনদেন করা বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি লাভজনক হবে না। তাই একমাত্র বিকল্প হিসেবে কারেন্সি সোয়াপ কাজ করতে পারে। দেশের রফতানি আয়ের অধিকাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার থেকে। সেক্ষেত্রে ডলারকে রুপিতে রূপান্তর করে লেনদেন করতে হবে। কিন্তু রুপি স্থিতিশীল না হওয়ায় এটা রিজার্ভে রাখলে বাংলাদেশের লোকসান হতে পারে।’ সার্বিক বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কারেন্সি ইউনিয়নের জন্য এখনো প্রস্তুত নয় বলেও মনে করছেন তিনি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমানও একই কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘অভিন্ন মুদ্রা প্রচলনের আগে ভিসামুক্ত সুবিধা চালু হয়েছিল ইউরোপে। সেক্ষেত্রে একক মুদ্রা চালুর অনেকগুলো পূর্বশর্ত পূরণ করতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে, যা এখনো হয়ে ওঠেনি। আঞ্চলিক মুদ্রা প্রচলনে কোনো দেশের প্রভাব বেশি থাকলে সেখানে সফলতা আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের প্রভাব সামনে আসবে, এটা বলাই যায়। আঞ্চলিক মুদ্রা কোনো দেশের একক কারেন্সি হবে না, এটা ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশকেও মেনে নিতে হবে। এখনো চীনের রফতানিকারকরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই এখনো একক মুদ্রার পরিবেশ তৈরি হয়নি। 

তবে এমন ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন ভারতীয় গবেষণা সংস্থা আরআইএসের পরিচালক প্রফেসর সচিন চতুর্ভেদি। তিনি বলেন, গত বছরের জুলাইয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্যে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ কম ডলার ব্যবহার হয়েছে। আর চলতি বছরের জুলাইয়ে মোট লেনদেনের ১৪ শতাংশ লেনদেন হয়েছে ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায়। অর্থাৎ ডলারবিহীন লেনদেনের প্রবণতা বাড়ছে। ভারতের সঙ্গে ৩৮টি দেশ রুপিতে বাণিজ্য করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও নেপালের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য শুরু করছে ভারত। তাই এখন ডলারের বিকল্প ভাবার সময় এসেছে।

পাকিস্তানের গবেষণা সংস্থা এসডিপিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আবীদ কাইয়ুম সোলেরী বলেন, ‘ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানি রুপিতে বাণিজ্য করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। একক মুদ্রা সম্ভব না হলেও ডলারনির্ভরতা হ্রাসের উপায় খুঁজতে হবে আমাদের। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভার্চুয়াল কারেন্সি চালু করা যেতে পারে।’

অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘একক মুদ্রা ছাড়াও বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে দেশগুলো। পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে আরো বেশি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

আরও