দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে একটি আঞ্চলিক মুদ্রার প্রচলন নিয়ে কথা
হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক মুদ্রা কোনো দেশের একক মুদ্রা নয়। এখানে সব দেশের আর্থিক স্বার্থ
জড়িত থাকে। কিন্তু এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসসহ নানা ধরনের বাণিজ্যিক
বাধা রয়েছে। সে হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখনো একটি একক মুদ্রার জন্য প্রস্তুত
নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষণার প্রতিষ্ঠান সিপিডির অর্থনৈতিক সম্মেলনে এসব
বিষয় উঠে এসেছে।
শনিবার (৪নভেম্বর) বনানীর একটি হোটেলে ১৪তম দক্ষিণ এশিয়ান অর্থনৈতিক
সিপিডির সেমিনারের সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। দুই দিনের এ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার
গবেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হাসান বলেন, রাশিয়া এবং চীন তাদের অভ্যন্তরীণ
বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ লেনদেন নিজস্ব মুদ্রায় করছে। বিশ্ব বাণিজ্যের ৭২ শতাংশ লেনদেন
ডলারে হতো ২০০০ সালেও। এখন তা ৫৯ শতাংশ নেমে এসেছে। আমেরিকারসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে
আঞ্চলিক মুদ্রার ধারণা তেমন জনপ্রিয় হয়নি। বর্তমানে চীন এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের
বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে রুপিতে লেনদেন করা দেশের জন্য খুব বেশি লাভজনক
হবে না। তই একমাত্র বিকল্প হিসাবে কারেন্সি সোয়াপ কাজ করতে পারে। দেশের রফতানি আয়ের
অধিকাংশ আসে ইউএস এবং ইউরোপের বাজার থেকে। সেক্ষেত্রে ডলার থেকে রুপিতে রূপান্তর করে
লেনদেন করতে হবে। কিন্তু রুপি স্থিতিশীল না হওয়ায় এটা রিজার্ভে রাখলে বাংলাদেশের
ক্ষতি হতে পারে। তাই সার্বিক বিচারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কারেন্সি ইউনিয়নের জন্য
এখনো প্রস্তুত নয় বলে মনে করছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হাবিবুর রহমান একই কথা বলছেন।
তিনি বলেন, অভিন্ন মুদ্রা প্রচলনের আগে ভিসা মুক্ত সুবিধা চালু হয়েছিল ইউরোপে। সেক্ষেত্রে
একক মুদ্রা চালু অনেকগুলো পূর্বশর্ত পূরণ করতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। যা এখনো
হয়ে ওঠেনি। আঞ্চলিক মুদ্রা প্রচলনে কোনো দেশের প্রভাব বেশি থাকলে সেখানে সফলতা আসার
সম্ভাবনা কমে যায়। এক্ষেত্রে চীন এবং ভারতের প্রভাব সামনে আসবে এটা বলাই যায়। আঞ্চলিক
মুদ্রা কোনো দেশের একক কারেন্সি হবে না, এটা ভারতের মত বড় অর্থনীতির দেশকেও মেনে নিতে
হবে। এখনো চীনের রফতানিকারকরা লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই
এখনো একক মুদ্রার পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন তিনি।
তবে এমন ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন ভারতীয় গবেষণা সংস্থা আরআইএস-এর
পরিচালক প্রফেসর সচিন চাতুর্ভেদি। তিনি বলেন, জুলাই মাসে আঞ্চলিক বাণিজ্যে আগের তুলনায়
৯ শতাংশ কম ডলার ব্যবহার হয়েছে। আর চলতি বছরের জুলাইয়ে ১৪ শতাংশ লেনদেন হয়েছে ডলার
ছাড়া। অর্থাৎ ডলারবিহীন লেনদেনের প্রবণতা বাড়ছে। ভারতের সঙ্গে ৩৮টি দেশ রুপিতে বাণিজ্য
করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও নেপালের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্য শুরু করছে
ভারত। তাই এখন ডলারের বিকল্প ভাবার সময় এসেছে।
পাকিস্তানের গবেষণা সংস্থা এসডিপিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ডক্টর আবীর
কাইয়ুম সোলেরী বলেন, ইরান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানি রুপিতে বাণিজ্য করার
জন্য আমরা চেষ্টা করছি। একক মুদ্রা সম্ভব না হলেও ডলার নির্ভরতা হ্রাসের উপায় খুঁজতে
হবে আমাদের। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভার্চুয়াল কারেন্সি চালু করা যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, একক মুদ্রা ছাড়াও বেশ কিছু
পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও
একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে দেশগুলো। পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে আরো বেশি ফোকাস
দেয়ার সুযোগ রয়েছে।