দেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় শ্রম অসন্তোষ অব্যাহত ছিল গতকালও। কাঙ্ক্ষিত মজুরির দাবিতে পথে নেমেছেন মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়া এলাকার শ্রমিকরা। পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন হলেও এখনো এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের মজুরি প্রস্তাব ও সমঝোতার আগ পর্যন্ত শ্রম অসন্তোষ প্রশমনের সম্ভাবনাও এখন কম। সার্বিক দিক বিবেচনায় অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্তসংখ্যক র্যাব, বিজিবি ও শিল্প পুলিশ মোতায়েনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গার্মেন্ট খাতের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে গঠিত বোর্ডের চতুর্থ সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২২ অক্টোবর। ওই সভায় ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে শ্রমিক পক্ষের প্রস্তাব ছিল ২০ হাজার ৩৯৩ টাকার। মালিক পক্ষের প্রস্তাব ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকার। ওই দিনই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিল্প অধ্যুষিত এলাকার শ্রমিকরা। অসন্তোষেরও শুরু তখনই। এরপর গত ১২ দিন ধরে শ্রমিক অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় অসন্তোষ দৃশ্যমান হয় ৩১ অক্টোবর, যা গতকালও অব্যাহত ছিল। এখন পর্যন্ত এ শ্রম অসন্তোষে দুজন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছিল ৬৯টি কারখানায়। কারখানাগুলো ছিল গাজীপুর ও আশুলিয়া এলাকার। এরপর ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে শ্রমিক অসন্তোষের তীব্রতা দৃশ্যমান হয়। এখন পর্যন্ত বিক্ষোভগুলোও মূলত এ তিন এলাকাকেন্দ্রিক। গতকাল রাতে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গাজীপুরে ১৭০ থেকে ২০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। আশুলিয়ায় বন্ধ কারখানার সংখ্যা ২৭০টির মতো।
গতকাল বিক্ষোভ তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। বিএনপির অবরোধ শুরুর পর অসন্তোষের তীব্রতা কিছুটা বেড়েছে। নতুন করে ডাকা ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ শুরু হবে রোববার। আজ ও আসন্ন অবরোধের মধ্যে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিক্ষুব্ধ এলাকাগুলোয় এরই মধ্যে বিজিবির টহল শুরু হয়েছে। বিক্ষোভের সম্ভাব্য তীব্রতা মোকাবেলায় বিজিবির পাশাপাশি র্যাব ও শিল্প পুলিশ বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় গার্মেন্টসের নিরাপত্তা জোরদারে পর্যাপ্তসংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আশুলিয়া, সাভার, মিরপুর, রামপুরা, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গী ও গাজীপুর-কোনাবাড়ী এলাকার গার্মেন্টসগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে পর্যাপ্তসংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।’
গাজীপুর মহানগরসহ বিভিন্ন স্থানে গতকালও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। শ্রমিকরা গত ২৩ অক্টোবর থেকেই এখানে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। বুধবার বিক্ষোভ কিছুটা কম থাকলেও গতকাল তা বেড়ে যায়। সকাল থেকেই শ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জমায়েতের চেষ্টা চালায়। এখানকার অধিকাংশ কারখানাই গতকাল বন্ধ ছিল।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ জেলায় প্রায় আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে ১৭০ থেকে ২০০টি বন্ধ। কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, বাসন, কাশিমপুর—এ চার থানাভুক্ত এলাকায়ই মূলত সমস্যাগুলো হচ্ছে। এখনো মজুরির সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই শ্রমিকদের কেউ না কেউ প্ররোচিত করছে, যার ধারাবাহিকতায় দুজন শ্রমিকও নিহত হয়েছেন। শনিবার থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন। এর মধ্যে বিজিবি সদস্যই আছে ৩৫০ জন। গাজীপুর মেট্রো এলাকার অন্তত ৫০০ পুলিশ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা পুলিশের সদস্য আছে ৫০০। শিল্প পুলিশের আট শতাধিক সদস্যকে এজন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
গাজীপুরে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ইটাহাটা ও নাওজোর এলাকায় কোস্ট টু কোস্ট কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা এলোপাতাড়িভাবে আশপাশের কারখানাগুলোয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাংচুর চালায়। খবর পেয়ে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময়ে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস এলাকার টিএম ফ্যাশন লিমিটেড, চৌধুরীবাড়ী এলাকায় বেলমন্ড গার্মেন্টস, ব্রাদার্স ফ্যাশন লিমিটেড ও রুয়া ফ্যাশন লিমিটেডসহ অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় বাসন সড়ক এলাকায় আলেমা ও মীম ডিজাইন কারখানার সামনে বিক্ষোভ হয়। এক পর্যায়ে মহানগরের চৌধুরীবাড়ী এলাকার বেলমন্ড গার্মেন্টস, ব্রাদার্স ফ্যাশন লিমিটেড, রুয়া ফ্যাশন লিমিটেডসহ আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। ভোগড়া বাইপাস এলাকার আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছুড়ে মহাসড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দেয়।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে গতকাল সকাল থেকেই গাজীপুর মহানগর ও জেলায় ১৬ প্লাটুন বিজিবি ও র্যাবের পাঁচটি টহল টিম কাজ করেছে। ৬৩ বিজিবি গাজীপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অবরোধ এবং শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়গুলো পুলিশ, র্যাবের পাশাপাশি আমরাও গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। কেউ যাতে কোনো ধরনের নাশকতা তৈরি করতে না পারে সেজন্য গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী এলাকায় তিন প্লাটুন, কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা ও ভোগড়া বাইপাস থেকে টাঙ্গাইল রোডে ১০ প্লাটুন এবং শ্রীপুর এলাকায় তিন প্লাটুন বিজিবি কাজ করছে।’
র্যাব-১ গাজীপুরের পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. ইয়াসির আরাফাত হোসেন বলেন, ‘জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি সম্পত্তি ও কলকারখানার ওপর আক্রমণ ঠেকানো এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নাগরিকদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে পাঁচটি টহল দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এছাড়া আমাদের নিজস্ব সাদা পোশাকে গোয়েন্দা দল পুরো জেলাব্যাপী কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
রাজধানীর মিরপুরে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো পুলিশ ও আন্দোলনরত গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এদিন দুপুর ১২টার দিকে পূরবী সিনেমা হলের সামনে সংঘর্ষ শুরু হয়। মিরপুর জোনের পুলিশের সহকারী কমিশনার হাসান মোহাম্মদ মুহতারিন বলেন, ‘শ্রমিকরা কাফরুল ও পল্লবী থানার ওসির ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি আহত হন। এরপর আমরা অ্যাকশনে যাই।’
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ার শঙ্কা নেই। তাদের ভাষ্যমতে, সংশ্লিষ্ট সবার প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে। আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক, মজুরি বোর্ডে মালিক পক্ষের প্রতিনিধি এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) বড় কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। আশা করছি আর কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে না, কারণ আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনরা প্রকৃত চিত্র বুঝতে শুরু করেছে।’
রাজধানীর বিজয়নগরে গতকাল শ্রম ভবনে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খানসহ শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। বেলা ৩টায় শুরু হয়ে এ বৈঠক শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়।
বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, ‘মালিক পক্ষ তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোয় ১০ হাজার ৪০০ টাকার যে প্রস্তাব দিয়েছে তা অযৌক্তিক। শ্রমিকদের জন্য বাজারদর অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য একটা মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ডকে সুপারিশ করা হবে। ৭ নভেম্বর নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে মজুরি বোর্ডের নতুন সভা হবে। সেখানে দুই পক্ষের মতামতে যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয়া হবে বলে জানান তিনি।’
গ্রহণযোগ্য মজুরির পরিমাণ সম্পর্কে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তে আসা গেছে কিনা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আজ পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ৭ নভেম্বর মজুরি বোর্ডের বৈঠক রয়েছে। সেখানে আশা করি চূড়ান্ত হতে পারে। যদি না হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। আশা করি শেষ ভরসাস্থল প্রধানমন্ত্রী মালিক শ্রমিকদের ডেকে একটি সিদ্ধান্ত দেবেন। এর আগেও যে কয়েকটি মজুরি বোর্ড হয়েছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছিল। এবারো হয়তো তার হস্তক্ষেপে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে যেতে পারব।’
গার্মেন্ট মালিক পক্ষ এবং শ্রমিকদের প্রস্তাবিত মজুরি কোনোটাই যৌক্তিক না বলে মনে করছেন সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান। প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এখানে মালিক ও শ্রমিক কোনো পক্ষের দাবি যৌক্তিক না। বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। তাই দুই পক্ষের মাঝামাঝি এমন একটি বেতন কাঠামোর প্রস্তাব করব যেখানে শ্রমিকরাও বাঁচে, শিল্পও বাঁচে। তাই বিষয়টি যেন গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে হয় সেই চেষ্টা সরকারের পক্ষে থেকে থাকবে।’
বৈঠকে উপস্থিত গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্সের নেতা তৌহিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিম্নতম মজুরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া জরুরি। যেহেতু এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তাই শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।’