বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রশ্ন মান নিয়ে

রাজধানীর মৌচাকে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মডার্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তের শর্তানুযায়ী কলেজটির নিজস্ব ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সুপরিসর শ্রেণীকক্ষ, পাঠাগার ও সেমিনার কক্ষ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার কথা। যদিও সরজমিন দেখা গেছে, কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে মুকুল টাওয়ার নামের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে। একই

রাজধানীর মৌচাকে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মডার্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তের শর্তানুযায়ী কলেজটির নিজস্ব ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সুপরিসর শ্রেণীকক্ষ, পাঠাগার ও সেমিনার কক্ষ এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার কথা। যদিও সরজমিন দেখা গেছে, কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে মুকুল টাওয়ার নামের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে। একই ফ্লোরে কার্যক্রম চালাচ্ছে একটি ভাষা শিক্ষার কোচিং সেন্টার। ভবনটিতে মডার্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাড়াও আরো সাতটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কলেজটিতে সাকল্যে ক্লাসরুম আছে একটি। সপ্তাহের একাধিক দিন গিয়েও এখানে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর আনাগোনা দেখা যায়নি। সেভাবে ক্লাস না হলেও প্রতি বছর এখান থেকে বিএড সনদ নিয়ে বেরুচ্ছেন শতাধিক শিক্ষার্থী। নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সনদ দেখিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন তাদের অনেকেই। 

একই চিত্র মিলেছে রাজধানীর আজিমপুরের নিউ পল্টন রোডে অবস্থিত মহানগর টিচার্স ট্রেনিং কলেজেও। কলেজটি এলাইড ভবন নামের একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভবনটির প্রথম তলায় বিউটি পার্লার, স্বর্ণের দোকান, দ্বিতীয় তলায় এলাইড লেদার করপোরেশন, তৃতীয় তলার একাংশে এলাইড প্রিন্টিং এবং চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় আবাসিক ফ্ল্যাট অবস্থিত। কলেজটিতে বর্তমানে বিএড কার্যক্রম চলমান থাকলেও সেখানে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের দেখা মেলেনি। স্থানীয়রা জানায়, সাধারণত বছরে কয়েকদিন প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দেখা মেলে। বেশির ভাগ সময়ই সেখানে কাউকে দেখা যায় না। রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরের অধিকাংশ বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজেই এখন এ চিত্র দেখা যায়।

ঢাকার প্রাইম টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজ, ভিক্টোরিয়া টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, নারায়ণগঞ্জের ফাতেমা রহমান টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ফরিদপুরের সানফ্লাওয়ার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, পটুয়াখালীর দক্ষিণবঙ্গ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, বরিশালের কলেজ অব এডুকেশন বিএড, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া টিচার্স ট্রেনিং কলেজসহ অর্ধশতাধিক বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ নিয়ে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মানুযায়ী, যারা বিএড সম্পন্ন করেন তারা বেতন-ভাতাসহ বেশকিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। একসময় শুধু সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলো এ প্রশিক্ষণ দিলেও বিএড কোর্সের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করে গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে শতাধিক বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। তবে এসব কলেজের অধিকাংশই শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ক্লাস বা প্রশিক্ষণ আয়োজন না করেই বিএড সার্টিফিকেট প্রদান করছে। আর অপেক্ষাকৃত সহজে কোর্স সম্পন্নের সুযোগ থাকায় স্কুল শিক্ষকরাও এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন।

বেসরকারি বিএড কলেজের একাংশে শিক্ষা মানহীন হয়ে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক ফাহিমা সুলতানা বলেন, ‘‌বর্তমানে আমাদের অধিভুক্ত বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সংখ্যা ৯৪টি। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করার পরই এসব কলেজকে অধিভুক্ত করা হয়। এরপর কোনো কলেজগুলো যদি এসব শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। বর্তমানে যে কলেজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মানহীনতার কারণে সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে।’ 

বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০১৮ এবং ২০২২-এর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এর বিপরীতে বেড়েছে বেসরকারি কলেজগুলোয়। পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ৩ হাজার ৯৫১ এবং ১০৪টি বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ৫ হাজার ১৭৬ শিক্ষার্থী ছিল। পরবর্তী সময়ে বেশকিছু বেসরকারি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২২ সালে বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সংখ্যা নেমে আসে ৯০-তে। তবে কলেজ সংখ্যা কমলেও এ সময় শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। 

অন্যদিকে সরকারি কলেজের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও কমেছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। ২০২২ সালে ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৭৬, যা ২০১৮ এর তুলনায় ৯৭৫ জন কম। ৯০টি বেসরকারি কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ হাজার ৪১৯, যা আগের তুলনায় ৪ হাজার ৩৪৩ জন বেশি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর তথ্যানুযায়ী কলেজগুলোর প্রতিটিতে এক বছর মেয়াদি বিএড কোর্সে ৬০০টি করে মোট ৮ হাজার ৪০০ আসন রয়েছে। এ কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক ছুটি এবং সরকারি ছুটির দিনগুলো ব্যতীত নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয় এবং প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে বাধ্যতামূলক অংশ নিতে হয়। অন্যথায় তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেন না। 

অন্যদিকে বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিংগুলোর বড় একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, এগুলোয় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ভর্তি এবং ফর্ম পূরণ করে পরীক্ষা দিলেই সার্টিফিকেট মেলে। স্কুল শিক্ষকদের বড় একটি অংশ এখন বেসরকারি কলেজগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। 

এ বিষয়ে রংপুর সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমজাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার মান নিশ্চিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। একজন স্নাতক, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও তিনি ছাত্রদের কীভাবে শেখাবেন, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় কীভাবে সামাল দেবেন—এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। শিক্ষক যদি এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত না হন তবে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আর এ সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করেই আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সম্পন্ন করি। কিন্তু গত কয়েক বছরে এমন কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যারা ক্লাস বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বি-এড ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগ দিচ্ছে। আর যেহেতু তাদের কাছ থেকে কোর্স সম্পন্ন করলে কম পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাই শিক্ষকরাও সেদিকে ঝুঁকছেন। ফলস্বরূপ দক্ষ শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে চাইলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে অবশ্যই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে নীতিমালার আওতায় আনা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের এটা নিশ্চিত করা জরুরি যে একজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন তার অর্থ তিনি শুধু একটি সার্টিফিকেট পেয়েছেন তাই নয়, বরং তিনি প্রকৃতপক্ষেই বিষয়গুলো শিখে দক্ষ হয়ে উঠেছেন।’

তবে বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, শুধু সহজে সার্টিফিকেট প্রাপ্তি বা দূরত্বই নয়, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি না পাওয়ার কারণেও অনেক সময় জেনেশুনেই মানহীন বেসরকারি কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঢাকার একটি বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষার্থী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমার প্রথম পছন্দ ছিল সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। কিন্তু আমি যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি তারা শিক্ষক সংকট দেখিয়ে আমাকে ছুটি দিতে রাজি হয়নি। আবার দ্রুততম সময়ে উচ্চতর গ্রেড পেতে হলে বিএড সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করলে যতটুকু সুবিধা পাব, বেসরকারি কলেজগুলো থেকে করলেও সে একই সুবিধা পাব। তাই শেষ পর্যন্ত আমি বেসরকারি কলেজেই ভর্তি হয়েছি।’

ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতাকে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মশিউর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌বেসরকারি ট্রেনিং কলেজগুলোর মান সন্তোষজনক নয়, এ বিষয়ে আমিও একমত। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বড় জটিলতা আইনি বাধা। যেমন তারা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন না—এ অভিযোগটা অনেক জায়গা থেকেই আসে। কিন্তু আমরা যখন তাদের ডাকি তখন তারা ঠিকই শিক্ষকদের স্বাক্ষরের কাগজ হাজির করে যে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। আবার স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিষয় এলে তারা জমির দলিল দেখায় যে এটা কলেজের জমি। এমন পরিস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে তারা আদালতে এর বিরুদ্ধে রিট করে এবং এসব কাগজপত্রের কারণে পার পেয়ে যায়। এছাড়া আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। ফলে নিয়মিত সব কলেজ পরিদর্শনও অসম্ভব। তবে আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি, কলেজগুলোয় মান নিশ্চিত করার।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌এসব কলেজের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সংকট হলো কলেজগুলো পুরোপুরি নিজেদের অর্থে চলে। শিক্ষকদের বেতন থেকে সবকিছু নিজেরা বহন করে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি কিছু সহযোগিতার বিষয় থাকলে মান নিশ্চিত করা সহজ হতো।’

দেশে শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দেখা হয় প্রশিক্ষিত দক্ষ শিক্ষকের অভাবকে। আবার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর মানসম্মততা নিশ্চিত করা না গেলে এ সমস্যা আরো কঠিন আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘‌শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নয়ন করতে হলে আমাদের শিক্ষকদের অবশ্যই যথাযথ প্রশিক্ষন প্রদান করতে হবে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় আনতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে এ মুহূর্তে একটা বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ-প্রশিক্ষিত শিক্ষক। নতুন যে শিক্ষাক্রমটি ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে। তবে এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলেও সবার আগে আমাদের শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে—এ কারণে এই মুহূর্তে শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতে গুরুত্ব প্রদান জরুরি।’

আরও