শীত মৌসুম শুরু হতে বাকি মাসখানেক। এরই মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতিদিন বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা সীমিত থাকছে ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটে। চাহিদা না থাকায় উৎপাদনে আসা দেশের বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে এখন পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিষয়টিতে প্রভাবকের ভূমিকা রাখছে বিদ্যমান জ্বালানি সংকটও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনে আসা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করতে না পারায় বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। গত ২৫ অক্টোবর বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস ছিল ১৩ হাজার মেগাওয়াট কিন্তু প্রকৃত ব্যবহার ও উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩৯০ মেগাওয়াট। এর আগে ১৯ অক্টোবর বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস ছিল ১৪ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ওই দিন বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ও ব্যবহার হয়েছে ১৩ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াট। সে হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিদ্যুতের ব্যবহার ৯৬১ মেগাওয়াট কমেছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ খাতের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের বক্তব্য হলো দেশে সারা বছর বিদ্যুতের চাহিদা সমান থাকে না। প্রতি বছরই শীত মৌসুম শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই বিদ্যুতের চাহিদা কমতে থাকে। বর্তমানেও এ ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এখন সেচ মৌসুমও নেই। ফলে চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ হয়। সেজন্য সক্ষমতা প্রস্তুত রাখাও জরুরি।
সংস্থাটির মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সক্ষমতা পর্যাপ্ত রাখা হয়েছে। ইকোনমিক জোনগুলো প্রস্তুত হয়ে গেলে সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হবে। ফলে এখন যে সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো একটা সময় আমাদের লাগবেই।’
বিদ্যুতের চাহিদা না থাকায় এখন বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতাকে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দেশে বড়পুকুরিয়া ও পায়রা ছাড়া বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর আর কোনোটিতেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। সব মিলিয়ে দেশে ৪ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। মূলত চাহিদা না থাকার কারণেই এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অর্থায়নে নির্মিত মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্টের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলেও এখন সেখান থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিচ্ছে বিপিডিবি। জাপানের অর্থায়নে নির্মিত মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে ১৮০ মেগাওয়াট। এখনো কেন্দ্রটির কোনো ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়নি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মিত এসএস পাওয়ার প্লান্টের দুটি ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে এখন সর্বোচ্চ ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিচ্ছে বিপিডিবি। এছাড়া বরিশালের ৩০৭ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদনে রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটি ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে গ্যাসভিত্তিক তিনটি বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে এলেও গ্যাস সংকট ও চাহিদা না থাকার কারণে একটি কেন্দ্র সীমিত আকারে চালু রয়েছে। সামিট গ্রুপের ৫৯০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করা হলেও সেখান থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ইউনিক পাওয়ারের ৫৮৪ মেগাওয়াট এবং ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্সের ৭৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি প্রস্তুত হওয়ার পরও বসিয়ে রাখা হয়েছে। কবে নাগাদ কেন্দ্র দুটি থেকে বিদ্যুৎ নেয়া শুরু করবে সে বিষয়ও সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি বিপিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এছাড়া বেশ কয়েকটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ বিভাগের পাইপলাইনে রয়েছে। এর মধ্যে শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রই নির্মাণ হতে যাচ্ছে ২২টি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকালই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালে জানিয়েছেন, দেশে এখন মোট ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পাইপলাইনে রয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণাধীন রয়েছে ৫৬১ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র। মোট ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রের চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়াধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ২২৮ মেগাওয়াট।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজিম উদ্দিন আহমেদের টেবিলে উত্থাপিত তারকাচিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে গত ১৫ বছরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৭৯২ মেগাওয়াট। মোট সক্ষমতা উন্নীত হয়েছে ২৮ হাজার ৫৬২ মেগাওয়াটে।
দেশে এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা তোলা গেছে মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত। সংসদে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে বলে এ সময় জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল দেশে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে ১০ শতাংশ হারে। যদিও গত এক দশকে তা বেড়েছে গড়ে ৪-৫ শতাংশ হারে। এর বিপরীতে সক্ষমতা বেড়েছে গড়ে ২০-২৫ শতাংশ হারে। অতিরিক্ত সক্ষমতা অলস হিসেবে বসে থাকলেও দীর্ঘদিন এগুলোর চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে লোকসান ও দেনার বোঝা বেড়েছে বিপিডিবির।
চলতি বছরে তীব্র গরম ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালানো যায়নি। তীব্র লোডশেডিং তৈরি হয় দেশজুড়ে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও তাতে গ্রাহকরা খুব বেশি উপকৃত হয়নি। এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ সক্ষমতার সর্বোচ্চ লাভজনক ব্যবহার করাটাকেই বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা এখন পর্যাপ্ত। এখন প্রয়োজন এ পর্যাপ্ত সক্ষমতাকে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন করা যায়। এটা এখন বিদ্যুৎ বিভাগের চ্যালেঞ্জ। সক্ষমতা বসিয়ে না রেখে আমরা আন্তঃদেশীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ নেপাল-ভুটানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারি। যেটি ভারত-নেপাল এখন করছে। ব্যাপকহারে অতিরিক্ত সক্ষমতা যদি ব্যবহার করা যায়, তাতে বিপিডিবির লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে এ বিদ্যুৎ শিল্পে ব্যবহার বাড়াতে হবে।’