রিজার্ভ নেমেছে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে গেছে। গত বুধবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫ কোটি বা ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে গেছে। গত বুধবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫ কোটি বা ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। ১৮ অক্টোবর যা ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এ হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভ ১১ কোটি ডলার কমেছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কমে গিয়েছিল। শুধু গত মাসেই রিজার্ভের প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষয় হয়। এক মাসে রিজার্ভের এত বড় ক্ষয় আগে কখনো দেখা যায়নি। 

দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের আগস্টে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, ওই সময় রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। এর পরই রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়। গত দুই বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার করে রিজার্ভ কমেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে এক ধাক্কায় রিজার্ভের ক্ষয় ২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় পরিশোধের জন্য প্রতি মাসে রিজার্ভ থেকে অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়েও রিজার্ভের ক্ষয় বাড়ছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১৩০-১৪০ কোটি ডলারের এলসি দায় পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভের পরিমাণ ১৯ বিলিয়নের ঘরে নেমে আসবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গণনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাই থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণপ্রাপ্তির শর্ত হিসেবেই তা করা হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে আইএমএফের সদস্যদেশগুলো ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম৬) অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাবায়ন করে আসছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তা শুরু করতে সময় নিয়েছে প্রায় এক যুগ। বিপিএম৬ মূলনীতি অনুযায়ী হিসাব করা রিজার্ভও বাংলাদেশের নিট বা প্রকৃত রিজার্ভ নয়। নিট রিজার্ভ হিসাবায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফ থেকে নেয়া এসডিআরসহ স্বল্পমেয়াদি বেশকিছু দায় বাদ দেয়া হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ এখন ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি দায় মেটানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সহায়তা দেয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ কারণে রিজার্ভ কমছে। তবে আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই রিজার্ভ আবার বাড়তে শুরু করবে।’

ডলার সংকট কমাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকেই আমদানির লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য এলসি খোলার শর্ত কঠোর করা হয়। ব্যাংকগুলোও ডলার সংকটের কারণে নিজেদের এলসি খোলা কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থবছর শেষে আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও (জুলাই-আগস্ট) আমদানির পরিমাণ ২২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসিও খুলতে পারছে না। আবার দেশের অনেক ব্যাংক এখনো নির্দিষ্ট সময়ে এলসি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। 

আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেও ডলার সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সফল হয়নি। বরং রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের বড় বিপর্যয় সম্প্রতি ডলার সংকটকে আরো উস্কে দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ১৩৪ কোটি ডলার, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। ডলারের বিনিময় হার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোরতার কারণেই রেমিট্যান্সের বড় পতন হয়েছে।

দেশে যে পরিমাণ ডলার ঢুকছে, তার চেয়ে বেশি এখন বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে দেশের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাব নেতিবাচক ধারায় চলে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে ডলারের সংকট কিংবা রিজার্ভের ক্ষয় শিগগিরই কমে আসার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

আরও