চীনের অর্থনৈতিক ক্ষত সামগ্রিকভাবে এশিয়ার অর্থনীতিতে মন্থরতা নিয়ে আসছে। শ্লথ হয়ে পড়েছে মহামারী-পরবর্তী সময়ে দেশটির পুনরুদ্ধার গতি। আবাসন খাতে চলমান সংকট এবং শিল্পোৎপাদন কার্যক্রম তৈরি করেছে বাড়তি উদ্বেগ। কমে গেছে ভোক্তা ব্যয়, যার প্রভাব পড়েছে রফতানি ও পর্যটননির্ভর অন্যান্য এশীয় দেশগুলোয়। খবর এশিয়া টাইমস।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি থাকবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা আগের দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় কম। অন্যদিকে, চলতি মাসে দেয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৩-২৪ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি থাকবে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ পূর্বাভাসও জুলাইয়ে দেয়া আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। দেশটির পুনরুদ্ধার গতির এ মন্থরতা পার্শ্ববর্তী দেশের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
চীনের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশই আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট। অথচ ২০২০ সালের গ্রীষ্ম থেকেই খাতটি নানা ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলা করছে। আবাসন ও শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধসের কারণে চীনের মানুষ ব্যয় কমিয়ে ফেলছে। আর ব্যয় কমানোর উপায় হিসেবে কমছে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা। এভাবে চীনা পর্যটক কমে যাওয়ায় শ্লথগতি দেখা দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন খাতে। বিভিন্ন ধরনের স্কিম চালুর পরও পর্যটননির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না। কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
২০১৯ সালে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ চীনা পর্যটক থাইল্যান্ডে যান, যা মোট বিদেশী পর্যটকদের ২৭ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সে হার নেমে এসেছে ১২ শতাংশে। ২০১৯ সালে কম্বোডিয়ার মোট পর্যটকের ৩৬ শতাংশ ছিল চীনা নাগরিক। ২০২৩ সালে হারটি ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ২০১৯ সালে ভিয়েতনামের পর্যটকের ৩২ শতাংশ ছিল চীনের নাগরিক। ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ১২ শতাংশে।
সার্বিকভাবে থাইল্যান্ডের বিদেশী পর্যটক কমেছে ৩২ শতাংশ। ভিয়েতনামের পর্যটন কমেছে ৩১ শতাংশ। পর্যটননির্ভর এশীয় অর্থনীতির জন্য চীন আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে ছিল। ফলে চীনের পর্যটন প্রবণতা কমে যাওয়া তাদের জন্য চাপ তৈরি করেছে। চীন মহামারীতেই নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিষেধাজ্ঞা সরানো হলে প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যায়নি নাগরিকদের মধ্যে।
মহামারীর আগে থাইল্যান্ডের পর্যটন খাত ছিল দেশটির মোট জিডিপির পাঁচ ভাগের এক ভাগ। সম্প্রতি ভিসা ফ্রি নীতি গ্রহণ করে থাই সরকার। কিন্তু গোল্ডেন উইকের দীর্ঘ আটদিনের ছুটিতেও থাইল্যান্ডমুখী যাতায়াত ছিল তুলনামূলক কম। থাই কোম্পানিগুলো তাদের পরিকল্পনা বর্তমানে নতুন করে গোছাতে বাধ্য হচ্ছে।
মহামারীর আগে ভিয়েতনামের রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট বিআরজি গ্রুপ চুক্তি করে জাপানি বিনোদন কোম্পানি সানরিওর সঙ্গে। ২০১৯ সালেই প্রকল্প হাতে নেয়া হয় হ্যানয়তে থিম পার্ক প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সাহস পাচ্ছেন না পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে। অথচ এটা শেষ করতে পারলে সানরিও হতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান থিম পার্ক।
কম্বোডিয়ার নাগা করপোরেশন নমপেনে তৃতীয় ক্যাসিনো স্থাপন করছে ৩৫০ কোটি ডলার খরচ করে। কিন্তু তা খুলে দেয়ার তারিখ পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। কাজ শেষ করতে করতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে। অথচ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালেই। নাগা করপোরেশনের ক্যাসিনোগুলোয় প্রধান গ্রাহকই থাকে চীনা। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে সেখানে হোটেল ভাড়ার পরিমাণ কমেছে ৪০ শতাংশ।
ভারত থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে পর্যটকের সংখ্যা। কমেছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও। চীনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্ষত তৈরি করেছে এশিয়ার জন্যও।