ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘পিটার হাসের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু এ খবর সঠিক নয়। বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে আমার কোনো বৈঠক হয়নি।’ রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যে’র উদ্যোগে এক ছাত্র কনভেনশনে বিএনপি মহাসচিব এ কথা বলেন।
বিদেশে ঘুরে লাভ হবে না মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতির উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উনি খুব আনন্দে আছেন। আমেরিকায় ১৮ দিন ঘুরে এলেন, এখন ব্রাসেলস যাবেন। চতুর্দিকে ঘোরাঘুরি শুরু হয়েছে। ঘুরে ঘুরে যদি কোনো রকমে সামাল দেয়া যায়, সেই চেষ্টা করছেন তিনি। আমি বলতে চাই, আর ঘোরাঘুরি করে লাভ হবে না।’
বর্তমান সরকারের এখন চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ দেশের সব মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। বাঁচতে চায় আপনাদের হাত থেকে। আপনাদের নির্যাতন-অত্যাচার-চুরি-দুর্নীতি, রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেয়া, সবকিছু থেকে মানুষ এখন বাঁচতে চায়। এখনো বলছি সময় আছে। আমাদের মান্না সাহেব বলেছেন দুর্গা পূজার কথা। ভালো কথা। দুর্গা পূজার সময় যে ছুটি থাকবে এর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি দ্রুত একটা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে দেন। ল্যাটা চুকে যাবে। মানুষ ভোট দিতে যাবে, আপনার তো আর প্রয়োজন নেই।’
ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এতই যদি জনপ্রিয় হন তাহলে সুষ্ঠু একটা ভোট দিতে অসুবিধা কোথায়? পদ্মা সেতু বানিয়েছেন, আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল বানিয়েছেন, উড়াল সেতু বানিয়েছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়েছেন, লোকজন তো আপনাকেই ভোট দেবে। তাহলে দেন একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। কিন্তু সেটা আপনি করবেন না। কারণ আপনি জানেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আপনাদের অস্তিত্ব থাকবে না।’
দলীয় নেতাকর্মীদরে উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকবেন না, হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। আপনারা যদি নিজেরা বাঁচতে চান, দেশকে বাঁচাতে চান, আপনাদের বাবা-মা ও ভাই-বোনকে বাঁচাতে চান তাহলে জেগে উঠতে হবে। ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে রাজপথে। লড়াই করে, সংগ্রাম করে তাদের পরাজিত করতে হবে। আজকে দৃপ্ত শপথ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মুক্ত করতে হবে আমাদের দেশকে, আমাদের মানুষকে ভয়াবহ এ দানবের হাত থেকে। আমরা আশাবাদী যে ছাত্র ঐক্য তৈরি হয়েছে, এ যুবক-তরুণদের ঐক্যের মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে এ দানব ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘটবে।’
সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রনেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিকে গত বুধবার তার ধানমন্ডির বাসা থেকে গভীর রাতে দরজা ভেঙে গ্রেফতার এবং থানায় নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের সবার জন্য লজ্জার। পুলিশ অফিসার, যাদের আমাদের পয়সায় বেতন হয় তারা বেআইনিভাবে তার ওপর হাত তু্লে আহত করেছে। এ্যানির মতো একজন সাহসী ছেলে কোন অবস্থায় আদালতে দাঁড়িয়ে বলে যে, চোর-ডাকাতকে মানুষ এভাবে মারে না, আমাকে তারা (পুলিশ) যেভাবে মেরেছে। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তারা আপনার মাথার ওপর চেপে বসবে। আজকে এ্যানিকে যেভাবে মেরেছে কাল আপনাদের সবাইকে মারবে।’
ছাত্রজীবনের কথা স্মরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। এখানে যেসব নেতা বসে আছেন তারা যুদ্ধ করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, যুদ্ধ করে একটা স্বাধীন দেশ তৈরি করেছেন, স্বৈরাচারকে পরাজিত করেছেন। আজকে আপনাদের (ছাত্রসমাজ) কাছে সেই গুরুদায়িত্ব এসেছে এ ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে বলেন, এখন তরুণদের সব ক্ষোভ মোবাইল সেটে। স্ট্যাটাস দিলেই ক্ষোভ শেষ। মোবাইল সেটে দিলে হবে না, ক্ষোভটা রাজপথে আসতে হবে। রাজপথে এসে তাদেরকে পরাজিত করতে হবে, রুখে দাঁড়াতে হবে। আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা। আমার মাকে অসহায় অবস্থায় বন্দি করে রেখে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে। আমার ভাইকে তারা মেরে আহত করছে, আমাদের ৬৪৮ জন ভাইকে গুম করে দিয়েছে, সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছে। এ এক বছরের মধ্যে ২২ জন যুবনেতা, ছাত্রনেতা, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করেছে। এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কোথায়? আপনাদের মধ্যে সেই বিদ্রোহ জাগিয়ে তুলতে হবে।’
জাতীয় ছাত্রঐক্যের সমন্বয়ক ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খানের সভাপতিত্বে ছাত্র কনভেনশনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ভাসানী অনুসারী পরিষদের শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, জাগপার একাংশের রাশেদ প্রধান, আরেক অংশের খন্দকার লুতফুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, এলডিপির নুরুল আলম, বিএনপির রাকিবুল ইসলাম বকুল, কবি আবদুল হাই শিকদার, শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম প্রমুখ বক্তব্য দেন।