অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী অনুপস্থিত। সংকটের সময় এখনো আর্থিক খাতে নেতৃত্বহীনতা। বলা হচ্ছিল আমরা ভালো আছি, কিন্তু এখন সংকট এসে গেছে। এ সময় কোন খাতে কত বরাদ্দ দিতে হবে, এটা নিয়ে প্ল্যানিং থাকা দরকার ছিল। এখন রিজার্ভ আর কোনোভাবেই ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামতে দেয়া যাবে না। সেজন্য দ্রুত স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া জরুরি।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ‘দক্ষিণ এশিয়ার রাজস্ব চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে ড. আহসান এইচ মনসুর এ কথা বলেন। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলত্তে অনসর্জ। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের সভাপতিত্বে আলোচনায় আরো অংশ নেন ডিসিসিআই সভাপতি ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করা হচ্ছিল। কিন্তু এটা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। মূলত আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার করণে বিভিন্ন সংকট দেখা দিচ্ছে। তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কাজ না করে শুধু ব্যয় কমিয়ে সংকটের সমাধান হবে না।’
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেন আর খারাপ না হয় সেজন্য আর্থিক ব্রেক দরকার বলে মনে করেন ড. সেলিম রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জগুলো এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। দুই বছরে রিজার্ভ অর্ধেকের চেয়ে বেশি কমে এসেছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ও নেতিবাচক ধারায়। তাই এখানকার সমস্যা ইগনোর করে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখলে সমাধান আসবে না। সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেরি হওয়ায় অনেক সাইড ইফেক্ট দেখা দিচ্ছে।’
সতর্ক করে দিয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আইএমএফের শর্তগুলো নিয়ে এক দশক ধরে আলোচনা হচ্ছে। এখানে কিন্তু তারা নতুন কিছু নিয়ে আসেনি। অথচ কিছু মহল আছে যারা সংস্কার হতে দেয় না।’ ড. সেলিম রায়হান আরো বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, শ্রীলংকাও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছিল। এখন আবার নিম্ন আয়ের দেশে নেমে গেছে। আমাদেরও জিডিপি বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয় কমছে। ফলে ঋণ পরিশোধ একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে অর্থনীতির সঙ্গে রাজনৈতিক যে সংযোগ, তা রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়তা ছিল না।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার বলেন, ‘ঋণ গ্রহণ ঝুঁকির পর্যায়ে না থাকলে সরকারের এটায় নজর রাখা উচিত। কারণ সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়ে গেলে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। এটা এরই মধ্যে কমে গেছে। আর যেসব প্রকল্প এখনই দরকার নেই সেগুলোকে অপেক্ষমাণ রাখতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে ফুটপাতের দোকানগুলোকেও করের আওতায় নিয়ে যেতে পারে।’ করের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেশনের দাবিও জানান এ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি।
মূল প্রবন্ধে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলত্তে অনসর্জ বলেন, ‘বিশ্বের অনেক অগ্রসরমাণ আর্থনীতির দেশগুলো এখন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ডিজিপির ৪০ শতাংশের মতো, যা মধ্যম মানের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। তবে রাজস্ব আয় না বাড়লে এবং প্রবৃদ্ধি যদি সুদহারের কম হয়, তাহলে ঋণ পরিস্থিতি টেকসই মনে হলেও প্রবৃদ্ধির হঠাৎ পতন হতে পারে। তাই এখন আর্থিক সংকোচন প্রয়োজন।’
এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক দেশ বেশি ঋণ নেয়ার পর আর্থিক সংকটে পড়েছে বলে সতর্ক করে দেন বিশ্বব্যাংকের এ অর্থনীতিবিদ। বেশি ঋণ ও কম রাজস্ব আয় দেশকে বড় সমস্যায় ফেলে উল্লেখ করে ড. ফ্রানজিসকা বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেশি হওয়ায় অবশ্য তাদের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি কম।’ এক প্রশ্নের জবাবে রাজস্ব বাড়াতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার বলে মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ।