প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাকে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন শেখাতে হবে না। দেশের মানুষের ভোটাধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে করেছি। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ গণভবনে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের ৭৮তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান ও যুক্তরাজ্য সফরের নানা দিক তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিদেশী কূটনীতিকদের প্রসঙ্গ টেনে সরকারপ্রধান বলেন, ‘এ কথাটা আমি বলেছি তাদেরকে, আমাকে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন শেখাতে হবে না। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে করেছি এবং সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারপর সেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে বলেই জনগণ আমাদের বারবার ভোট দিয়েছে। একটানা ক্ষমতায় আছি বলেই আজকে অর্থনৈতিক উন্নতিটা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামল ছাড়া অন্য যারা ২৯ বছর ক্ষমতায় ছিল তারা দেশকে কী উন্নতি দিয়েছে? এমনকি জনগণের মুখে এক মুঠো ভাত পর্যন্ত তুলে দিতে পারেনি। সারা বছর দেশের উত্তরবঙ্গ এমনকি দক্ষিণের অনেক জায়গাতেও দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত।’
প্রধানমন্ত্রী তার সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আন্দোলন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ডেঙ্গুসহ চলমান অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা, সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন, বিভিন্ন দূতাবাস এবং রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তা প্রদানে সরকারের ভূমিকাসহ আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
বিএনপির আন্দোলন ইস্যুতে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাদের যে আন্দোলন সেই আন্দোলনে তো আমরা বাধা দিচ্ছি না। তারা আন্দোলনের নামে লোক সমাগম করে যাচ্ছে, ভালো কথা। এতদিন চুরি-চামারি করে যে অবৈধ অর্থ তারা বানিয়েছিল আর যত টাকা মানি লন্ডারিং করেছিল, সেগুলোর এখন ব্যবহার হচ্ছে। অন্তত সাধারণ মানুষের হাতে কিছু টাকা তো যাচ্ছে। আমি সেভাবেই বিবেচনা করি। যত আন্দোলন করবে তাতে সাধারণ মানুষের পকেটে কিছু টাকা যাবে। তাই আমি বলেছি কিছু বলার দরকার নেই, তারা আন্দোলন করতে থাকুক। কারণ এ টাকাগুলো তো বের হওয়াটাও দরকার।’
আন্দোলনকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘যদি মানুষের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা কেউ করে, ওইরকম অগ্নিসন্ত্রাস বা নাশকতার প্রচেষ্টা চালায় তাহলে তো ছাড়ব না। কারণ আমাদের সঙ্গে জনগণ আছে। আমাদের কিছু করা লাগবে না। জনগণকে ডাক দিলে তারাই ঠাণ্ডা করে দেবে। তারা যখন অগ্নিসন্ত্রাস করেছিল তখন সাধারণ মানুষই ওদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এবারো তাই হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সফরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে কেউই কোনো কথা বলেননি। এ ধরনের কোনো কথা হয়নি এবং কেউ এ ধরনের কথা আমাকে জিজ্ঞাসাও করেনি। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক অভিজ্ঞতা ২০০৭-০৮ সালে হয়ে গেছে আমাদের। তার পরও আবার কেউ তা চাইতে পারে। আর সিস্টেমটা তো বিএনপিই নষ্ট করে ফেলেছে। কাজেই এ রকম কোনো কথা হয়নি।’
‘বিএনপি যা বলে তার সবই মিথ্যা’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তারা যা বলে তার সবই মিথ্যা। মিথ্যা কথায় কেউ কান দেবেন না। মিথ্যা কথায় কেউ বিশ্বাস করবেন না। তাদের জন্মই হয়েছে অবৈধভাবে। আর টিকে আছে মিথ্যার ওপরে। তাদের শেকড় তো নেই। তারা মিথ্যার ওপর নির্ভর করে। এটাই করবে। এটা তাদের অভ্যাস।’
জি২০ সম্মেলন থেকে ‘প্রধানমন্ত্রী খালি হাতে ফিরেছেন’—বিএনপি নেতাদের এমন অভিযোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বিএনপির এ অভিযোগের কোনো উত্তর দিতে চাই না। আমি শুধু দেশবাসীকে বলতে চাই বিএনপির নেতারা একটি মাইক হাতে কীভাবে মিথ্যা কথা বলে সেটা সবাই জেনে নেন। মিথ্যা বলাটা তাদের অভ্যাস আর সবকিছুকে খাটো করে দেখার চেষ্টা, এ বিষয়ে যেন দেশবাসী সচেতন থাকে।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ছাড়াও সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন করার সাহস যাদের নেই, তারা বিরোধী দল কীসের? সংসদের বাইরের কোনো দলকে বিদেশে বিরোধী দল হিসেবে মনে করা হয় না।’
বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংসদ সদস্য হিসেবে বিরোধী দলে যাদের আসন তারাই বিরোধী দল। এটা সবার মনে রাখা উচিত।’
বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা তুলে প্রধানমন্ত্রী জানান, অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে হবে, বিরোধী দল থাকতে হবে। কিন্তু বিরোধী কে? যাদের সংসদে একটি সিট নেই তাদের বিরোধী দল হিসাব করে তো রাখা যায় না, বলা যায় না। রাস্তায় উচ্চবাচ্যকারীরা বিরোধী দলের মর্যাদা পায় না বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
কভিড-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি স্যাংশনে সারা বিশ্বের মন্দা ভাবের উল্লেখ করে সাম্প্রতিক বিভিন্ন দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত খাদ্যমন্দা। এটা কেউ বলবে কেউ বলবে না। আমি নিজেই তো কয়েকটা দেশ দেখলাম। সেখানে যে কী অবস্থা আমরা জানি। আমরা মানুষের পাশে আছি। যাতে মানুষের কষ্ট না হয়।’
রিজার্ভ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কভিডের সময় আমদানি বন্ধ ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল। তখন তো রিজার্ভ বেড়েছিল। এরপর যখন সব খুলে গেল, সবকিছু আমদানি শুরু হল। তখন রিজার্ভ কমবে, এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন রিজার্ভ ১ বিলিয়নও ছিল না। ছিল শূন্য দশমিক ৭ বিলিয়ন। আমি যখন ’৯৬ সালে সরকার গঠন করি তখন রিজার্ভ ছিল বিলিয়নের নিচে। যেটুকু বেড়েছে, আমাদের সরকারই বাড়িয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘রিজার্ভ বেশি রাখা বেশি প্রয়োজন, নাকি দেশের মানুষের ভালো, মানুষের জন্য কাজ করা বেশি প্রয়োজন?’
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে সবাই, ভর্তুকির সুযোগ নিচ্ছে অর্থশালী বড়লোকরা। এখন একটা স্লট ঠিক করব কতটুকু সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের জন্য আলাদা দাম। তার থেকে বেশি যারা করবে তাদের জন্য আলাদা দাম। এরই মধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি ওইভাবে একটা স্লট করতে।’
তিনি বলেন, ‘সব গুছিয়ে দেয়ার পর এখন ইলেকশনের কথা, ভোটের কথা, অর্থনীতির পাকা পাকা কথা শুনতে হয়। আমি এসব শুনতে রাজি না। আমার ৭৭ বছর বয়স। ১৫ বছর বয়স থেকে মিছিল করি। এ পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। আমি এখানে কিছু পেতেও আসিনি, নিতেও আসিনি। আমি এসেছি দেশের মানুষকে দিতে।’
আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কী কী অগ্রাধিকার পাবে এমন প্রশ্নে জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেটাই আমরা বিবেচনায় দেখব, বিবেচনা করব। প্রতি ছয় মাস পরপর আমি কিন্তু সার্ভে করি। কারো পজিশন খারাপ হলে সরাসরি মুখের ওপর বলে দিই। আমরা এ ব্যাপারে সচেতন বলেই নির্বাচনে জনগণের আস্থা পাই, ভোট পাই এবং নির্বাচনে জয়ী হই।’
ডেঙ্গু সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু নিজের ঘরবাড়ি না, ছাদ থেকে শুরু করে আশপাশের অঞ্চল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। প্রত্যেকটা এলাকাভিত্তিক সবাই যদি একটু উদ্যোগ নেয় তাহলে ডেঙ্গুর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটা হলো বাস্তবতা।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অবশ্যই প্রচেষ্টা আছে, প্রচেষ্টা চলছে। গবেষণাও চলছে। এরই মধ্যে শুনলাম জাপান নাকি একটা টিকা আবিষ্কার করেছে। এগুলো তো আসলে সময়সাপেক্ষ।’