স্থানীয় কোম্পানি হিসেবে দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে তিনটি কোম্পানি। এসব কোম্পানির একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, সংস্থাটির আওতাধীন গ্যাসফিল্ডগুলোয় মোট ১ হাজার ৬৩৭ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাস মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত গ্যাসফিল্ডগুলোর মজুদ নিঃশেষ হয়ে আসছে। বর্তমানে এসব গ্যাসফিল্ডে মজুদকৃত গ্যাসের পরিমাণ ৪৫০ বিসিএফের কিছু বেশি।
বাপেক্সের আওতাধীন সিংহভাগ গ্যাসের মজুদ দ্বীপ জেলা ভোলার দুটি গ্যাসফিল্ডে। কিন্তু এ দুটি গ্যাসফিল্ড এখনো জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। কবে নাগাদ গ্রিডে যুক্ত হবে সে বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত বাপেক্সের সাতটি গ্যাসফিল্ডে মোট গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৪৮১ বিসিএফ। বাকি ১ হাজার ১৫৬ বিসিএফ ভোলার দুটি গ্যাসফিল্ডে। যদিও গ্যাসফিল্ডগুলো উৎপাদনে থাকায় এরই মধ্যে মজুদের পরিমাণ আরো কমে এসেছে।
দেশের গ্যাসফিল্ডগুলোর মজুদ যে ফুরিয়ে আসবে তার জরিপ আগেই করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। ২০১৭ সালে করা গ্যাস খাতের মহাপরিকল্পনায় গ্যাসের উৎপাদন ও মজুদ হ্রাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে মজুদ বাড়াতে স্থানীয় গ্যাস খাতে বিনিয়োগ ও অনুসন্ধানে সরকারের প্রতি সে সময় আহ্বানও জানানো হয়। কিন্তু সহজ উপায়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে গিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধীরগতি নামে। ফলে গ্যাসের মজুদ ও উত্তোলন কমে আসবে এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাপেক্সের ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উত্তোলনে থাকা কূপ এবং পরিত্যক্ত অনেক কূপে গ্যাস রয়েছে। এসব কূপ অনেক আগেই সংস্কার করার দরকার ছিল। তাহলে উত্তোলন ও মজুদ দুটোই বাড়ানো যেত। যদিও এখন বাপেক্সকে দিয়ে অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কাজটি করা হচ্ছে।’
বাপেক্সের আওতাধীন গ্যাসফিল্ডগুলোয় শুধু মজুদ কমেনি, সেই সঙ্গে উৎপাদনও কমে গেছে। পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উত্তোলনের তথ্য অনুযায়ী, বাপেক্সের আওতাধীন সাতটি গ্যাসফিল্ড থেকে দৈনিক ১৩৯-১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমসিএফ) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, যা স্থানীয়ভাবে উত্তোলনকৃত গ্যাসের মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ রয়েছে ৮ হাজার ৬৮০ বিসিএফ বা ৮ দশমিক ৬৮ টিসিএফ (এক টিসিএফ সমান এক হাজার বিসিএফ)। এর মধ্যে বাপেক্সের আওতাধীন গ্যাসফিল্ডের মজুদ ১ হাজার ৬৩৭ বিসিএফ।
মজুদ থাকা এসব গ্যাসফিল্ডের মধ্যে কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাসফিল্ডে মজুদ রয়েছে ১৭১ বিসিএফ, সেখান থেকে দৈনিক গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে ৩০ এমসিএফ। খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাসফিল্ডে মজুদ রয়েছে ১৩১ বিসিএফ, উত্তোলন হচ্ছে এক এমসিএফেরও কম। মৌলভীবাজারের ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসফিল্ডে গ্যাসের মজুদ রয়েছে ৭২ বিসিএফ, উত্তোলন হচ্ছে সাড়ে ১২ এমসিএফ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে মজুদ রয়েছে ৩০ বিসিএফ, উত্তোলন হচ্ছে আট এমসিএফ। একই জেলার সুন্দলপুর গ্যাসফিল্ডে গ্যাসের মজুদ রয়েছে ২৪ বিসিএফ, উত্তোলন হচ্ছে সাত এমসিএফ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা নদী গ্যাসফিল্ডে মজুদ রয়েছে এক বিসিএফ, যেখান থেকে দৈনিক উত্তোলন করা হচ্ছে তিন এমসিএফের কিছু বেশি। এছাড়া সিলেটের জকিগঞ্জে ৫২ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হলেও সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন এখনো শুরু হয়নি।
গ্রিডের বাইরে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ডে মজুদ রয়েছে ৭২১ বিসিএফ। এখান থেকে দৈনিক গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে প্রায় ৮০ এমসিএফ। পাইপলাইন না থাকায় এটি জাতীয় গ্রিডে আসছে না। স্থানীয়ভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সংযোগ দিয়ে শাহবাজপুরের গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে সদ্য আবিষ্কৃত ভোলা নর্থ গ্যাসফিল্ডের মজুদ ৪৩৫ বিসিএফ হলেও তা এখনো উৎপাদনে আসেনি। বৃহৎ আকারে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করতে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।
দেশে গ্যাসের উৎপাদন ও মজুদ বাড়াতে জ্বালানি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ করছে বাপেক্স। ২০২৫ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রিডে ৬১৫ এমসিএফ গ্যাস যুক্ত করার যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার অনেকগুলো ধাপে বাপেক্সকে রাখা হয়েছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বাপেক্সের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাপেক্স ২০২৫ সাল পর্যন্ত তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে রেখেছে। অর্থাৎ গ্যাস অনুসন্ধানে কোথায় কোথায় খনন, কূপ সংস্কার করা হবে তা ঠিক করা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেভাবেই কাজ এগোচ্ছে। তবে এ কাজে বাপেক্স এখন একা কাজ করবে না, গভীর কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করবে। বাপেক্স শুধু তার নিজের নয়, অন্যান্য কোম্পানির আওতাধীন গ্যাসফিল্ডের কূপে সংস্কার ও ওয়ার্কওভারের কাজও করছে। বর্তমানে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্স শ্রীকাইল, সিলেট গ্যাসফিল্ডসহ বেশ কয়েকটি গ্যাস স্থাপনায় কাজ করছে।’
বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন পরিকল্পনা ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শোয়েবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দেশে গ্যাস উত্তোলনে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানির পাশাপাশি বিদেশী দুটি কোম্পানি গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলোর আওতাধীন গ্যাসের মজুদও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আওতায় বেশির ভাগ গ্যাসফিল্ড থাকলেও মজুদ বেশি রয়েছে তিন-চারটি গ্যাসফিল্ডে। এসব গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন জাতীয় গ্রিডে যৎসামান্য। উৎপাদন বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও তা খুব বেশি কাজে আসছে না। এছাড়া দেশে জ্বালানি খাতের বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে আদৌ কোনো গতি পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।