জলাবদ্ধতা: বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে না

জলাবদ্ধতা এ নগরীর পরিবেশবিষয়ক সমস্যাবলির মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে বছরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, জলাবদ্ধতা এখানে একটি অন্যতম সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে, তা আগে থেকেই নগর ব্যবস্থাপকদের বোঝা উচিত ছিল। কেন একটি নগরীতে জলাবদ্ধতা হয়, এটি আসলে অংকের মতোই একটি স্বতঃসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিষয়। সিটি করপোরেশন

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভিসেসের (সিআইআরএস) পরিচালক। বুয়েট থেকে পুরকৌশলে স্নাতক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর থেকে স্নাতকোত্তর ও জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন। পানি ও পরিবেশ প্রকৌশল, বিশেষ করে নগর পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মূলত তার মূল গবেষণার বিষয়। ঢাকার জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

সম্প্রতি জলাবদ্ধতায় নাকাল হলো পুরো ঢাকা। দুর্ঘটনায় চারজনের প্রাণহানি হলো। বৃষ্টিতে যে নিয়মিত জলাবদ্ধতা হচ্ছে এর কারণগুলো কী? 

জলাবদ্ধতা এ নগরীর পরিবেশবিষয়ক সমস্যাবলির মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে বছরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, জলাবদ্ধতা এখানে একটি অন্যতম সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে, তা আগে থেকেই নগর ব্যবস্থাপকদের বোঝা উচিত ছিল। কেন একটি নগরীতে জলাবদ্ধতা হয়, এটি আসলে অংকের মতোই একটি স্বতঃসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিষয়। সিটি করপোরেশন বা ‘ওয়াসা’তে যারা প্রকৌশল বিভাগে আছেন, তাদের অবশ্যই তা জানার কথা। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ‘হাইড্রোলজি’ একটি অবশ্যপাঠ্য বিষয়। আর এর আলোচনার বিষয়বস্তু মূলত আবর্তিত হয় ‘হাইড্রোলজিক্যাল সাইকেল বা পানিচক্র’ ঘিরে। 

বৃষ্টির পর পানি মাটিতে পড়ার সময় কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। প্রাকৃতিক ভূমিরূপ তথা গ্রামাঞ্চলে এ পানির একটি বড় অংশ বা ৫০ শতাংশ মাটি শুষে নেয়। বাকি অংশগুলোর মধ্যে কিছু আবার বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বাতাসে উড়ে যায় কিংবা গাছ শুষে নেয় ইত্যাদি। শেষমেশ প্রায় ১০ শতাংশের মতো ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ হিসেবে মাটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাশের নালা-খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু এ একই প্রাকৃতিক ভূমি যখন নগরে রূপান্তরিত হয় তখন কী ঘটে? প্রাকৃতিক ভূমি তখন কংক্রিটের বাড়িঘর আর পিচঢালা রাস্তা তথা ‘পানি অপ্রবেশ্য’ বা ‘ইম্পারভিয়াস’ তলে পরিণত হয়, যাতে পানি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ হিসেবে যা পাশের ড্রেনে যাচ্ছে, তা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০-৬০ শতাংশে। ঢাকার হিসাব আরো করুণ। এখানে ভূগর্ভে পানি প্রবেশের পরিমাণ কমে প্রায় ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে এরই মধ্যে। তাছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো প্রাকৃতিক জলাধার যথা পুকুর-খাল-বিল প্রায় প্রতি বছর কমছে—নিশ্চিহ্ন  হয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা বা মাঠগুলো। 

ঢাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মতো প্রাকৃতিক জলাধার না থাকায় কী কী সমস্যা হচ্ছে?

ঢাকায় বৃষ্টির পর ৬০-৭০ শতাংশ পানিই ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে এ ‘রানঅফ বা ভূ-উপরিস্থিত পানি’ দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য যে ধরনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা খাল-নালা থাকার কথা তার ধারেকাছেও আমাদের নেই। আর যা আছে তাও ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে বন্ধ হয়ে আছে। ফলে জলাবদ্ধতা এখানে অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে দায়ী আরেকটি জিনিস হচ্ছে বাঁধ। আব্দুল্লাহপুর থেকে শুরু করে ঢাকার পুরো পশ্চিমাঞ্চল শহর রক্ষা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। ফলে পশ্চিমে পানি যাওয়ার মূল রাস্তা মূলত দুটি গোড়ান চাটবাড়ী ও কল্যাণপুর পাম্প স্টেশন। কিন্তু এ দুটি পাম্প স্টেশনে পানি পৌঁছার মতো পর্যাপ্ত পথও নেই। একভাবে পাম্প স্টেশনের সামনে পানি সাময়িক জমা হওয়ার জন্য জলাধার দুটিও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যাতে পানি শহরের ভেতরে জমে থাকা ছাড়া উপায় নেই। 

ডেঙ্গু মহামারী আকারে হাজির হলো—এর পেছনে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো মেগা সিটিগুলোর নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার দায় দেখছেন কি? সমাধান কী?

অবশ্যই। ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। আর মশার উৎপত্তি হয় বদ্ধ পানিতে কিংবা আবর্জনার স্তূপ থেকে। বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় সব সিটি করপোরেশনই অনেকটা ব্যর্থ। বর্জ্য বিষয়টিকে অনেকটা হালকাভাবে দেখা হয় অথচ এটি নগর পরিবেশের প্রায় সব সমস্যার মূল। বর্জ্য রোগজীবাণু ছড়ায়। আবার বর্জ্য ড্রেনে জমা হয়ে ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে আছে। মেগা সিটিগুলোর নগর ব্যবস্থাপনায় প্রোঅ্যাকটিভ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে, সমস্যা সৃষ্টি করে তা জটিল হওয়ার পর দশ গুণ বেশি অর্থ ও শ্রম ক্ষয় করে তা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। আবার প্রকল্প নেয়ার ব্যাপারে তারা যতটা আগ্রহী, প্রকল্প শেষে তা রক্ষণাবেক্ষণে মোটেই ততটা আগ্রহী নয়। হাজার কোটি টাকা খরচ করে ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণের পর তা যদি ময়লায় পূর্ণ হয়ে বন্ধ হয়ে থাকে তাহলে লাভ কী? সম্ভবত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময়ই লোক দেখানো দৃশ্যমান উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত। ময়লা-আবর্জনা বা মাটির নিচের বিষয়, যেমন পানি ও পয়োনিষ্কাশন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না। 

উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা হাতে হাত মিলিয়ে আসছে কি? যদি সিলেটের, হাওর অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের ক্ষয়ক্ষতি মাথায় রাখা হয় তাহলে?

আগেই বলেছি, হাইড্রোলজির সূত্র অনুযায়ী, একটি প্রাকৃতিক ভূমিরূপ যখন কংক্রিটে আবৃত হবে, ভূ-উপরিস্থিত পানির প্রবাহ বেড়ে গিয়ে জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। আর উন্নয়ন মানেই হচ্ছে নতুন ভবন, রাস্তা আর স্থাপনা নির্মাণ। ফলে সংগত কারণেই এটি হাইড্রোলজিক্যাল ভারসাম্যতাকে বিনষ্ট করে। কিন্তু তার মানে এ নয় যে আমরা উন্নয়ন করব না। উন্নয়নের অনুষঙ্গ হিসেবে জলাবদ্ধতা অবশ্যম্ভাবী। এর সমাধান আছে। আসলে সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই যখন একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়ার সময় এর সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব ও তা সমাধানের উপায়গুলো চিন্তা না করেই তা শুরু করে দেয়া হয়। পরিবেশগত সমীক্ষা তথা ইআইএ স্টাডি করা হলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। উন্নত দেশগুলোয় একটি নগর পরিকল্পনায়, অতিরিক্ত সৃষ্ট পানি কীভাবে ধরে রাখা যায় তার জন্য নতুন জলাধার, নালা-খাল আর ড্রেনেজ সিস্টেম একেবারে হিসাব করে ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের ক্ষেত্রে শুধু উন্নয়ন আর স্থাপনা নির্মাণই শেষ। এর পরবর্তী প্রভাবের জন্য কিছুই করা হয় না। 

আবার ঢাকার বন্যার সঙ্গে হাওর বা চট্টগ্রামের বন্যার অনেক পার্থক্য আছে। একেক বন্যার একেক সংজ্ঞা। হাওরের বন্যাকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’। চট্টগ্রামের বন্যা ‘টাইডাল ফ্লাড’ বা জোয়ার-ভাটা দিয়ে প্রভাবিত। তবে সব ক্ষেত্রেই মানুষের সৃষ্ট কিছু কারণ এর প্রভাবকে আরো খারাপ করে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন সিলেটে বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রামের বন্যা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তাছাড়া পাহাড়ে বন ধ্বংসের কারণে, পানির প্রবাহ, ভূমিধস ও পলি বাড়ছে যা এ অঞ্চলে বন্যাকে ভবিষ্যতে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। 

আমাদের বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কী কী দেখছেন?

আগেই বলেছি আমাদের বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পাচ্ছে না। আবার এক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ বেশি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি জনগণের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যত্রতত্র ময়লা ফেলার আমাদের যে নাগরিক কালচার, এর জন্যই মূলত আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে। উন্নত দেশে কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে ডাস্টবিন ছাড়া ময়লা ফেলা যায়। ফলে ড্রেনে পড়ে এটি আবার জলাবদ্ধতার কারণ হচ্ছে। 

আবার পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিগত স্থাপনা যথা ড্রেন, পাইপলাইন, রেগুলেটর ইত্যাদি বানাতে যতটা আগ্রহী, ঠিক ততটা আগ্রহী নই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথা খোলা জায়গাগুলো রক্ষা করা, পুকুর-নালা-খালের পরিমাণ বাড়ানো, ড্রেনের ময়লাগুলো অন্তত বছরে একবার বন্যা মৌসুমের আগে হলেও পরিষ্কার করা, প্রতি বছর লেকগুলোয় জমা পলি পরিষ্কার করে গভীরতা বাড়ানো ইত্যাদি। 

এ সংকট সমাধানের উপায় কী কী?

যেকোনো সমস্যা উত্তরণে সবসময়ই দুটি উপায় থাকে। একটি হচ্ছে ‘প্রোঅ্যাকটিভ বা প্রতিরোধমূলক’ আর অন্যটি ‘রিঅ্যাকটিভ বা প্রতিকারমূলক’। আপনি যদি খোলা জায়গা, খাল-নালা আর জলাধারগুলো রক্ষা করতেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেন তাহলে সমস্যা এতটা জটিল হতো না। আর এখন সমস্যা চূড়ান্ত পর্যায়ে অবনতির পর সমাধান খোঁজা ব্যয়সাপেক্ষ এবং অনেক জটিল। প্রযুক্তিগত সমাধান এখনো যে নেই, তা নয়। তবে সময়ে যে কাজটি ১০ টাকা খরচে করতে পারতেন, তা এখন ১০০ টাকায় করতে হবে। উন্নত তথা শিক্ষিত দেশগুলো বরাবরই প্রতিরোধমূলক তথা সঠিক ভূমি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করেছেন। আবার কিছু উন্নয়নশীল দেশ, সমস্যা বাড়ার পর ঢেলে সাজিয়ে শোধরানোর মতো অভিজ্ঞতাও আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় রাস্তা ও আবাসিক এলাকা ভেঙে খাল বানানোর নজির আছে। তেমনি চীন সাম্প্রতিক সময়ে ‘‌স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা প্রবর্তনের মাধ্যমে অনেকগুলো শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে।

‘‌স্পঞ্জ সিটি’ ধারণাটি আরেকটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন কী?

‘‌স্পঞ্জ সিটি’ শব্দটি থেকেই এর ধারণাটি আঁচ করা যায়। অর্থাৎ একটি শহর, যা স্পঞ্জের মতো আচরণ করবে। স্পঞ্জ যেমন পানি শুষে নেয় বা ধরে রাখতে পারে ঠিক তেমনটি। চীনে যা করা হয়েছে তা হচ্ছে শহরজুড়ে যতভাবে সম্ভব এমন ব্যবস্থা করা যাতে করে পানি মাটিতে শুষে যায়। যেমন ফুটপাত, এমনকি রাস্তা পর্যন্ত এমন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে প্রস্তুত করা, যার ভেতর দিয়ে বৃষ্টির পানি মাটিতে শুষে যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিনোদনের জন্য ওয়াটার পার্ক করা হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য আধার নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা ও ছাদকৃষিও উৎসাহিত করা হয়েছে। খাল পুনঃখনন ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। জলাধার ও খোলা জায়গাগুলো এমনভাবে প্রস্তুত করা যে এর পানি ধারণক্ষমতা যেন আরো বেড়ে যায়। 

২০০০ সালের দিকে জাপানে অবস্থানকালে দেখেছিলাম, জাপানের প্রতিটি খেলার মাঠ আসলে একেকটা পুকুরের মতো। কীভাবে তা সম্ভব? আসলে খেলার মাঠের নিচের ২০-৩০ ফুট মাটি প্রথমে সরিয়ে নেয়া হয়। তারপর মাটির বদলে পাথর-নুড়ি আর বালি দিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এমনভাবে স্তর বিন্যাস করা হয় যে আগের তুলনায় মাঠটির নিচে এখন প্রায় ১০ গুণ বেশি পানি শোষণ বা ধারণ করে রাখা সম্ভব।

ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কি দীর্ঘমেয়াদি সংকট সৃষ্টি করছে? বর্ষা মৌসুমে যে খোঁড়াখুঁড়ি চলে এর ফলে ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগ-বালাই হচ্ছে কি?

বর্ষা মৌসুমে যে খোঁড়াখুঁড়ি—এটি তো শুধুই ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং অবশ্যই পরিহারযোগ্য। অর্থবছরের যে সূচি, তাতে করে নাকি এমনটি করতে হয়। কথা হচ্ছে, এ অর্থবছরের সংজ্ঞা তো আমাদেরই দেয়া। প্রয়োজনে দেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে অর্থবছরের সূচি পরিবর্তন করা যেতে পারে। আগেই বলেছি, উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব সবসময়ই জড়িত, আর তা প্রকল্প নেয়ার আগেই ভেবে নিয়ে সমাধানের সুযোগ রাখতে হবে। আমাদের এখানে দেখা যায়, একটি সংস্থা রাস্তা বানিয়ে এক মাস যেতে না যেতেই আরেক সংস্থা এসে তা খেঁাড়া শুরু করে দেয়। এটি একটি জঘন্যতম অপরাধ এবং সরকারি অর্থের নিদারুণ অপচয়। এর জন্য সংস্থাগুলোর মাঝে সমন্বয় কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ টাকা তো জনগণের, তথা ট্যাক্সের টাকা। চোখের সামনে এ ধরনের অপচয় সহ্য করা যায় না। 

হাতিরঝিলের মতো প্রকল্পও কি ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগ-বালাইয়ের উৎস হচ্ছে?

হাতিরঝিল নিঃসন্দেহে একটি ভালো প্রকল্প। এটি সম্ভব না হলে এ লেকের অধিকাংশ জায়গা বেদখল হয়ে যেত। ঢাকার জলাবদ্ধতা বেড়ে দাঁড়াত বহুগুণ। তবে হ্যাঁ, কিছু সমস্যা আছে যা সমাধান করতে হবে। এ প্রকল্পকে দোষ দেয়া যাবে না। যেমন এখানে শুধুই বৃষ্টির পানি জমা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে টয়লেটের পানি আসছে। কিন্তু এটি তো আরেকটি ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা। নিয়মানুযায়ী টয়লেটের ফ্ল্যাশ করা পানি হয় সেপটিক ট্যাংকে থাকার কথা অথবা পয়োনিষ্কাশন পাইপে করে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন শেষে তারপর কোনো জলাধারে। সরাসরি নগরীর ড্রেনে নয়! এটি দেখার দায়িত্ব ওয়াসার। ফলে হাতিরঝিলের পানিতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আর মশা উৎপন্ন হচ্ছে। 

মেগা সিটি হিসেবে ঢাকা শহরের স্যানিটেশন ব্যবস্থা কেমন দেখছেন? আমাদের গণশৌচাগার পর্যাপ্ত বলে মনে করেন?

স্যানিটেশন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অনেক আগে পাগলায় একটি পয়ঃশোধনাগার তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে সম্ভবত ঢাকার ৫ শতাংশ পয়ঃপানিও কাভার করে না। সাম্প্রতিক কালে দাশেরকান্দিতে আরেকটি তৈরি হচ্ছে। সেপ্টিক ট্যাংক ও পরে তা নিরাপদ নিষ্কাশনের পদ্ধতিটি অকেজো। কখনো কাউকে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে ওয়াসাকে ডাকতে দেখেছেন? সবাই সেপটিক ট্যাংক যুক্ত করে রাখে পাশের ড্রেনের সঙ্গে। 

গণশৌচাগার তো নেই বললেই চলে। এয়ারপোর্ট রোডে অনেকগুলো আধা তৈরি করে ফেলে রাখা হয়েছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়া যেত। ঢাকা শহরে যে ট্রাফিক জ্যাম, তাতে এক কিলোমিটার অন্তর এ ধরনের গণশৌচাগার তৈরি করে বেসরকারি খাতে চালালেও ভালো চলার কথা! জনগণের স্বস্তি হতো। 

নগরায়ণের ফলে সবুজের উপস্থিতি কমছে। জনবহুল ঢাকা শহরে সবুজের উপস্থিতি বাড়ানো যায় কীভাবে?

সবুজের উপস্থিতি তথা খোলা জায়গা কমে যাওয়ার সঙ্গে আসলে প্রায় সব সমস্যাই জড়িত। জলাবদ্ধতাও এর একটি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঘনবসতির একটি অন্যতম কারণ। বিল্ডিং কোডে এজন্য একটি নির্দিষ্ট অংশ ছেড়ে দিয়ে বাড়ি নির্মাণের কথা বলা আছে। তা অবশ্যই পুরোপুরি মেনে চলা উচিত। নাগরিক জীবনের প্রশান্তির কথা মাথায় রেখে সাধারণ জনগণেরও উচিত নিজ আঙিনায় বেশি করে গাছ লাগানো। অন্যদিকে ছাদকৃষির মাধ্যমেও সবুজায়ন বাড়ানো যেতে পারে। প্রতিটি ফুলের টব কিছু না কিছু বৃষ্টির পানি ধরে রেখে জলাবদ্ধতাও কমাতে পারে। 

তবে খোলা জায়গাগুলো সংরক্ষণ ও সবুজায়নের ক্ষেত্রে তো সবার আগে সরকারকে ভূমিকা রাখা দরকার ছিল। কেননা ঢাকায় জমির দাম এত বেড়ে গেছে যে পাবলিকের পক্ষে তার জায়গা খোলা রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আফসোসের বিষয়, সরকার নিজেই অনেক ক্ষেত্রে খোলা জায়গায় সরকারি স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যা পরে গণআন্দোলনের মুখে প্রতিরোধ করা হয়েছে।

আরও