অব্যাহত লোকসানে রংপুরে কমছে পোলট্রি খামার

হিট স্ট্রোকে মুরগির মৃত্যু, পোলট্রি খাদ্যের মূল্য বাড়াসহ বিভিন্ন কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন রংপুরের ক্ষুদ্র খামারিরা।

হিট স্ট্রোকে মুরগির মৃত্যু, পোলট্রি খাদ্যের মূল্য বাড়াসহ বিভিন্ন কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন রংপুরের ক্ষুদ্র খামারিরা। এছাড়া ডিম উৎপাদন এবং সরবরাহের সিংহভাগ করপোরেট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় প্রান্তিক খামারিদের লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে। অব্যাহত লোকসানের কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন।

দুই বছর আগেও রংপুর নগরীর বুড়িরহাট এলাকার ফজলে রাব্বির খামার ছিল। নিয়মিত পাঁচ হাজার মুরগি ডিম দিত। কিন্তু পোলট্রি খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং ডিমের মূল্য কম পাওয়ায় বাধ্য হন স্থায়ীভাবে খামার বন্ধ করে দিতে।

জানা গেছে, ২০০৪-০৫ সালে রংপুরে খামারভিত্তিক মুরগি পালন শুরু হয়। সে সময় লক্ষাধিক মুরগির খামার গড়ে ওঠে। কিন্তু ২০০৭ সালে মহামারী হিসেবে দেখা দেয় অ্যাভিয়াম ফ্লু। যার প্রভাব পড়ে পোলট্রি শিল্পে। ২০১২-১৩ সালে রংপুর দিনাজপুর এবং ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ২৫ লাখ ডিম উৎপাদন হতো। ২০১৯ সাল থেকে পোলট্রি খাদ্যের ধারাবাহিক মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এ শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন রংপুর বিভাগের সমন্বয়কারী মাহবুব আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত পোলট্রি খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত এবং উৎপাদিত ডিমের মূল্য ভালো না পাওয়ায় বর্তমানে জেলা পর্যায় খামারির সংখ্যা মাত্র ১০০-তে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে পোলট্রি খাদ্য ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০০-১ হাজার ৭০০ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমানে এর মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫০-২ হাজার ৮০০ টাকা। একটি ডিম উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে ক্ষেত্র বিশেষে সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা। ভুরাঘাটে আমার ১৬ হাজার মুরগি ছিল। কিন্তু লোকসান করতে করতে বর্তমানে মুরগি আছে চার হাজার। শুধু তাই নয়, ২০২০ সালে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছি। এখন সুদ হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। এছাড়া খামারে বিনিয়োগ করেছি প্রায় ২ কোটি টাকা। বর্তমানে রংপুর জেলায় ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১০ লাখ পিস। যার অধিকাংশ ডিম সরবরাহ করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো।’

তার মতো অনেকে খামার বন্ধ করেননি ঠিকই, তবে ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। ব্যাংকের চাপে এখন কোনোমতে খামার টিকিয়ে রেখেছেন। বুড়িরহাট এলাকার খামারি মাহমুদুল হাসানের আগে মুরগির সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। বর্তমানে রয়েছে মাত্র চার হাজার। এছাড়া সদর উপজেলার ভুরাঘাট ফতেপুর এলাকার মাহাজারুল ইসলামের মুরগি ছিল ১২ হাজার। এখন তার মুরগির সংখ্যা মাত্র দুই হাজার।

গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের ময়না কুটি গ্রামে দীর্ঘদিন লেয়ার মুরগির খামারের মাধ্যমে ডিম উৎপাদন করতেন মো. ফজলুল হক। প্রায় এক বছর ধরে তার খামারের শেড অব্যবহৃত পড়ে আছে। মূলত মুরগির খাবারের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়া এবং বিদ্যুতের দাম যে হারে বেড়েছে তাতে ডিম বিক্রি করে লোকসান এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। একসময় খামারে তার মুরগির সংখ্যা ছিল আট হাজার।

সিটি করপোরেশনের সাহেবগঞ্জ এলাকার নিনা বেগমও প্রায় নয় মাস আগে যখন খামার বন্ধ করেন তখন মুরগির সংখ্যা ছিল চার হাজার। তিনিও মুরগির খাবারসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাধ্য হয়েছেন খামার বন্ধ করতে।

রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার মুরগির খামারের সংখ্যা ৬৫৩টি। এখন কতগুলো বর্তমানে চালু আছে তা জানা যায়নি। তবে জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রমতে বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ে মাত্র ৫০টি লেয়ার মুরগির খামার চালু আছে। খামারগুলোয় মুরগি পালনে বিদ্যমান প্রতিকূলতার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিরূপ আবহাওয়া। অধিকাংশ খামার সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় দুই-তিন মাস আগে হিট ওয়েভে নগরীর বোদলা এলাকার খামারি বেলায়াত মাস্টার তার আট হাজার মুরগির শতকরা ২০ ভাগ হারিয়েছেন। পীরগাছা উপজেলার সাতদড়গা গ্রামের খামারি আবু হাশেম তার ১২ হাজার মুরগির শতকরা ১০ ভাগ  হারিয়েছেন এবং গঙ্গাচড়া উপজেলার মৌলভীবাজার এলাকার খামারি আবু বক্কর তার ছয় হাজার মুরগির মধ্যে শতকরা প্রায় ১২ ভাগ হারিয়েছেন। এছাড়া বিরূপ আবহাওয়ায় শতকরা ৭০ ভাগ খামারির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

রংপুর জেলা পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মো. আরমানুর রহমান লিংকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে মুরগির খাবারের দাম প্রকার ভেদে শতকরা ৪৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছর আগে ৫০ কেজির খাবারের বস্তার দাম ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ টাকা। অব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনাময় পোলট্রি খামার কমতে কমতে এখন ৫০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক খামারিদের এখন একটি ডিম উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে ১০ দশমিক ২০ টাকা। তবে করপোরেট কোম্পানিগুলো একসঙ্গে অনেক ডিম উৎপাদন করায় তুলনামূলক খরচ কম হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে জেলায় প্রতিদিন ডিমের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ পিচ ডিম সরবরাহ করছেন প্রান্তিক খামারিরা। বাকি ডিম সরবরাহ করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে চাহিদার প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করছে কাজী ফার্মস। এছাড়া নর্থ এগ এবং ভিআইপি সরবরাহ করছে বাকি ডিম।’

এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এনামুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার মুরগির খামারের সংখ্যা ৬৫৩টি। তালিকাভুক্ত হলেও সব খামার চালু নেই।’

আরও