ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম চারদিনেই মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের। গত রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় চারজন আর ঢাকার বাইরে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৮২৩ জন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫ জন। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৮১৮ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গতকাল পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ৯ হাজার ৬৯ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২ জন ঢাকার নানা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। বাকি ৫ হাজার ১৭ জন চিকিৎসা নিচ্ছে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয়।
২০২৩ সালে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৬১ হাজার ৪৮৯ ও ঢাকার বাইরে ৭১ হাজার ৬৪৫ জন। ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪১৯ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৫৬ হাজার ৯৬৯ ও ঢাকার বাইরে ৬৬ হাজার ৪৫০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
সরকারি হিসাবে, ডেঙ্গুতে এ বছর এখন পর্যন্ত মোট ৬৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত জানুয়ারিতে ছয় ও ফেব্রুয়ারিতে দুজনের মৃত্যু হয়। তবে মার্চে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও এপ্রিল ও মে মাসে দুজন করে মারা যায়। গত জুনে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই মাসে মৃত্যু হয় ৩৪ জনের। জুলাই ও আগস্টে মৃত্যু হয় যথাক্রমে ২০৪ ও ৩৪২ জনের। চলতি মাসের প্রথম চারদিনে মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ৮১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তির দু-তিনদিনের মধ্যে। এর অর্থ হলো যারা মারা যাচ্ছে তারা দেরি করে হাসপাতালে আসছে। যে সময়টাতে রোগীরা আসছে তখন চিকিৎসকদের তেমন কিছু করার থাকছে না।
জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ দেখলেই হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, মানুষের গতিশীলতা বৃদ্ধি, অনুপযুক্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরক্ষরতা ও সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী সুস্থতার ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ নিম্নভূমির দেশগুলোয় খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ঢাকার দুই মেয়রের দাবি, ডেঙ্গু মোকাবেলায় তারা পর্যাপ্ত কাজ করছেন। তবে কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এডিস মশার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পরিকল্পনা, সমন্বয় ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সাধারণ মানুষেরও। মশা দমনে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠেছে। এটি এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এটি মোকাবেলায় গতানুগতিক পদক্ষেপ বাদ দিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার রোগীদের অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত শুধু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আসছে। এর বাইরেও যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের তথ্য কোথাও নেই। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও বিষয়টি স্বীকার করছেন। কারণ যারা আক্রান্ত হয়ে ঘরে বসে চিকিৎসা নিচ্ছে, তাদের তথ্য এখানে যুক্ত হয় না। এমনকি সব বেসরকারি হাসপাতালের তথ্যও এখানে নেই।