বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্কুলারিটি মডেলে রূপান্তরের যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বর্তমানে ‘সার্কুলারিটি’ বাংলাদেশে পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস, অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুবিধা তৈরি প্রভৃতি ক্ষেত্রগুলোয় উল্লেখযোগ্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে সার্কুলারিটি গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জও আছে, যেগুলো সম্মিলিতভাবে বিবেচনা এবং সমাধান করা আবশ্যক।
সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে শিল্প নেতা, নীতিনির্ধারক এবং সার্কুলার অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল ‘আপস্ট্রিম সার্কুলারিটি ডায়ালগ: বাংলাদেশে প্রাক-ভোক্তা টেক্সটাইল বর্জ্য’ শীর্ষক এক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে ব্র্যান্ড, প্রস্তুতকারক, নীতিনির্ধারক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন গ্রুপে অংশ নেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব মিশন বার্নড স্পেইনার, ইউনিডোতে সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি ভ্যালু চেইনস প্রজেক্টের চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মার্ক ড্রেক এবং গ্লোবাল ফ্যাশন এজেন্ডার ইমপ্যাক্ট প্রোগ্রামস অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির ডিরেক্টর, হলি সিরেট সংলাপের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া সার্কেল ইকোনমির গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের প্রধান হিলডে ভ্যান ডুইজএন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন এবং সার্কুলার গেম উপস্থাপন করেন।
সংলাপের মূল বিষয়গুলো ছিল বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ সার্কুলার ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল, নীতি, অবকাঠামো, সহযোগিতা ও উদ্ভাবনী পন্থা গ্রহণ করা। সংলাপটি ‘সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি ভ্যালু চেইনস প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে আয়োজন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ফিনল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে ইউনিডোর নেতৃত্বে চ্যাথাম হাউজ, সার্কল ইকোনমি, ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং গ্লোবাল ভ্যালু চেইনের সার্কুলারিটি সমর্থনকারীদের সহযোগিতায় প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সংলাপে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। উভয় প্যানেলের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ইস্যু। যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রস্তুতকারকদের সার্কুলার ইকোসিস্টেমে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ব্যবসায়িক মডেল ও প্রণোদনা। আলোচনার ইস্যুর মধ্যে আরো ছিল দেশে মূল্য ধরে রাখার জন্য টেক্সটাইল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার মানদণ্ড এবং সমগ্র প্রক্রিয়ায় কীভাবে বর্তমান ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। সংলাপে বেস্টসেলার মুখ্য ভূমিকা পালন এবং সার্কুলারিটি ও পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ গ্রহণে প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে বেস্টসেলারের সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমরা এখন এমন একটি বিশ্বে বাস করছি, যেখানে জলবায়ু সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন, স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশের মূল্যে ব্যবসা এখন আর কোনো বিকল্প নয়। শূন্য কার্বন নির্গমন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দৌড়ে সার্কুলারিটি ‘পরবর্তী স্বাভাবিক’ (ধারণা) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা ব্যবসা ও টেকসই উন্নয়নকে সংযুক্ত করেছে। বিজিএমইএর জন্য, সার্কুলারিটি আমাদের মূল্যবোধ, লক্ষ্য এবং রূপকল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদনকারী দেশ। বছরে প্রায় চার লাখ টন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদিত হয়। যার মাত্র ৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পুনর্ব্যবহৃত হয় এবং ৩৫ শতাংশের বেশি বয়লারে ব্যবহার হয় বা ল্যান্ডফিলে যায়। টেক্সটাইল বর্জ্য, যা ঝুট নামে পরিচিত, বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পে সার্কুলারিটি অর্জনের পথে অতিক্রম করার জন্য একটি ভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বেস্টসেলারের সিনিয়র প্রজেক্ট স্পেশালিস্ট আলেকজান্ডার গ্রানবার্গ বলেন, ‘এ মুহূর্তে সবাই একটি সার্কুলার অর্থনীতিতে যাওয়ার জন্য নতুন ব্যবসায়িক অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। দীর্ঘদিনের অনেক ব্যবসায়িক অংশীদারসহ বাংলাদেশ হচ্ছে বেস্টসেলারের জন্য একটি প্রধান সোর্সিং দেশ, আর এ কারণেই বর্জ্য পৃথক্করণের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে সূচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।’
গ্লোবাল ফ্যাশন এজেন্ডার সিইও ফেদেরিকা মার্চিয়ননি বলেছেন, ‘একটি সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য পৃথক এজেন্ট বা কোম্পানির সামর্থ্যের বাইরে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে। তাই খ্যাতনামা সংস্থাগুলোর একটি গ্রুপের মধ্যে এ মাল্টিস্টেকহোল্ডার অংশীদারত্বের সমন্বয় করতে পেরে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। সত্যিকারের সার্কুলারিটি শুধু উৎপাদন অঞ্চলে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই অর্জন করা যেতে পারে এবং এ অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো বাংলাদেশ বিশ্বে পুনর্ব্যবহৃত পণ্য উৎপাদনে (রিসাইক্লিং) নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত, যদি দেশটি শিল্পোত্তর বর্জ্যের সব সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ একটি প্যানেল আলোচনায় বলেন, ‘টেক্সটাইল বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা মূলত অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশের বর্জ্য সংগ্রহের আনুষ্ঠানিকীকরণের জন্য একটি আইনি বা বাধ্যতামূলক কাঠামোর প্রয়োজন।’
বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাজ আজিম বলেন, ‘টেক্সটাইল বর্জ্য পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে পুনর্ব্যবহৃত সুতা ও কাপড় থেকে তৈরি পোশাক রফতানি করে ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।’
রিভার্স রিসোর্সেসের চিফ প্রোগ্রাম অফিসার ও সহপ্রতিষ্ঠাতা নিন ক্যাসল বলেন, ‘অভ্যন্তরীণভাবে রিসাইক্লিং সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ সম্প্রসারণটি শিল্পকে পুনর্ব্যবহৃত পণ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে, ফাইবার আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সহায়তা করবে।’
চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মার্ক ড্রেক বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ফিনল্যান্ড সরকারের সহায়তায় ইউনিডো বিশ্বব্যাপী “সুইচ টু সার্কুলার ইকোনমি ভ্যালু চেইনস প্রজেক্ট”-এর নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশে আমরা বৈশ্বিক এবং স্থানীয় শিল্প নেতারা, যেমন বেস্টসেলার, এইচঅ্যান্ডএম এবং তাদের প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় উদ্ভাবনী সার্কুলার সমাধান পাইলটিং করে টেক্সটাইল এবং পোশাক শিল্পের জন্য সার্কুলার ট্রানজিশনকে সহযোগিতা করছি।’