সিপিডির আহ্বান

পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘আমরা ধরে নিচ্ছি যে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তায় আর করণীয় নেই।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘আমরা ধরে নিচ্ছি যে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তায় আর করণীয় নেই। আমাদের এ ধারণাটি সঠিক নয়। কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা ধারাবাহিকভাবেই পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।’ সিপিডির ধানমন্ডির কার্যালয়ে ‘তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা: অর্জন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গতকাল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন যে শর্ত আসবে তার মধ্যে শ্রম অধিকার সম্পর্কিত শর্ত সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। তার অংশ হিসেবে কর্মপরিবেশে আমাদের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে। আগামীতে এর ভেতর লিগ্যাল ও কমপ্ল্যায়েন্স ইস্যুও যুক্ত হবে। এক সময়ে আমরা বলেছিলাম, শুধু বাংলাদেশেই কেন মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ হচ্ছে? অন্যান্য তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনকারী দেশে কেন এ কাজটি হচ্ছে না? ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকর্ড বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে নতুনভাবে পাকিস্তানে তাদের কার্যক্রম শুরু করছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী দিনে তারা ভারত, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকর্ডের উদ্যোগের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হলো। আমরাও মনে করি ওই দেশগুলোতে কীভাবে মনিটর হচ্ছে সেটাও আমাদের জানার দরকার আছে এবং আমাদের এ অভিজ্ঞতা তারা কীভাবে নিচ্ছে সেটাও জানা দরকার আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিলের (আরএসসি) আওতায় ১ হাজার ৮৮৭টি কারখানা মনিটরিংয়ের মধ্যে রয়েছে। আর নিরাপদ হিসেবে ৩৫০টি কারখানা শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেলের (আরসিসি) আওতায় ৬৫৯টি কারখানা মনিটরিংয়ের আওতায়। সব মিলিয়ে ২ হাজার ৮৯৬টি কারখানা আরএসিসি ও আরসিসির মনিটরিংয়ে রয়েছে। কিন্তু ৮৫৬টি কারখানা বর্তমানে কোনো মনিটরিংয়ের আওতায় নেই। কীভাবে এ কারখানাগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনা যায় সেদিকে চোখ রাখা উচিত।’

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘৮৫৬টি কারখানায় কাজ চলছে, রফতানিও হচ্ছে। এরা সবাই কাজই করছে, তাহলে ওই কারখানাগুলো মনিটরিং কে করবে? এ সংখ্যাটি দিন দিন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মোট কারখানার ২২-২৩ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে ৩০ শতাংশ হতে পারে। কারখানাগুলোকে তদারকির মধ্যে আনতে হবে। কোনো কারখানা অ্যাসোসিয়েশনের বাইরে থাকতে পারবে না। কেননা এসব কারখানায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কে নেবে? বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ ওই কারখানার দায়ভার নেবে না। আমরা চাই সব কারখানা যেন কোনো না কোনো সংগঠনের সঙ্গে দায়বদ্ধতায় থাকে।’

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে বিগত ১০ বছরে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আর বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। এটি অবশ্যই একটি বড় অর্জন। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আমরা বড় দুর্ঘটনা এড়াতে পেরেছি এবং কমপ্লায়েন্সে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি। এটি ইতিবাচকভাবে দেখি। কিন্তু রফতানিমুখী আরএমজি শিল্পে ২০২০ সালে অগ্নি দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ১৭৭টি। ২০২১ সালে ছিল ১৮০ এবং ২০২২ সালে বেড়ে এখন অগ্নি দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪১টি। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ঘটনা বাড়ছে। কারখানার ভেতরে কর্মপরিবেশজনিত দুর্ঘটনা সেটিও কম-বেশি কোনো বছরই কমছে না, এখনো রয়েছে। ২০২৩ সালে কারখানার দেয়াল ভেঙে একজন শ্রমিক মারা গেছেন, ১ মে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে ১৮ জন শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশে ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। মৃত্যুর সংখ্যা কমে এলেও শূন্য হয়ে যায়নি। জিরো ডেথ, জিরো ইনসিডেন্স বা জিরো অকারেন্সে আমরা পৌঁছতে পারিনি। যে কারখানাগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় রয়েছে তার কোনো কোনো জায়গায়ও এ দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়গুলোকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।’

সিপিডির সিনিয়র রিসার্স অ্যাসোসিয়েট তামিম আহমেদ বলেন, ‘ডাইফের (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) বর্তমান যে সক্ষমতা রয়েছে তা আরএমজি ইন্ডাস্ট্রির আকার বিবেচনায় যথেষ্ট নয়। ২০২১ অর্থবছরে ডাইফ ৪৭ হাজার ৩৬১টি ইন্সপেকশন করেছে। সেখানে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ইন্সপেকশন ৬ হাজার ২২৭টি। কিন্তু ২০২২-এ এসে আরএমজি ইন্সপেকশন ৩ হাজার ৫৬০-এ নেমে এসেছে। ডাইফের সক্ষমতা বাড়ানোর পরও ইন্সপেকশন পরবর্তী বছর কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। ডাইফ এখন লিমা নামে একটি টুল ব্যবহার করছে, যেটি ফিল্ডে না গিয়েও ইন্সপেকশন পরিচালনা করতে পারে। লিমিটেড ম্যানপাওয়ার দিয়ে এ ইন্সপেকশন করা সম্ভব, তার পরও এ ইন্সপেকশন পতন কেন হলো তা পরিষ্কার না। ডাইফের সঙ্গে আইএলও চার-পাঁচ বছর ধরে একটি প্রোগ্রামে কাজ করেছে। যেটি গত বছর শেষ হওয়ার কথা। এটিও নিশ্চিত নয় যে আইএলওর ডিরেক্ট ইন্টারভেনশনের কারণেই কী ইন্সপেকশনে উল্লম্ফন দেখেছিলাম নাকি আইএলওর ইনভলভমেন্ট শেষ, সে কারণেই সংখ্যাটা কমেছে সেটিও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।’

আরও