সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

ব্রিকসের সদস্যপদ পেতে বাংলাদেশ চেষ্টাও করেনি

ব্রিকসের সদস্যপদ এখনই পেতে হবে এমন কোনো চিন্তা বাংলাদেশের ছিল না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘এখনই সদস্যপদ পেতে হবে সে ধরনের কোনো চিন্তা আমাদের মাথায় ছিলও না। সে ধরনের চেষ্টাও করিনি। চাইলে পাব না সে অবস্থাটা নেই।’ দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে গতকাল গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা। প্রথমে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা

ব্রিকসের সদস্যপদ এখনই পেতে হবে এমন কোনো চিন্তা বাংলাদেশের ছিল না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘এখনই সদস্যপদ পেতে হবে সে ধরনের কোনো চিন্তা আমাদের মাথায় ছিলও না। সে ধরনের চেষ্টাও করিনি। চাইলে পাব না সে অবস্থাটা নেই।’ দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে গতকাল গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা। প্রথমে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এরপর সাংবাদিকদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সরকারপ্রধান। 

এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেকটা কাজের একটা নিয়ম থাকে। আমরা সে নিয়ম মেনেই চলি। আমার সঙ্গে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ হলো, আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন ব্রিকস সম্মেলনে। তখন আমাকে এও জানালেন তারা কিছু সদস্যপদও বাড়াবেন। সে বিষয়ে আমার মতামতও জানতে চাইলেন। আমি বললাম এটা খুবই ভালো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্রিকস যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এ পাঁচটি দেশের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ সবসময় ছিল এবং আছে। সে সময় এটা নিয়ে আলোচনা হলো পর্যন্ত।’

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জুনে যে আলোচনা হয়, সে পর্যায়েই বিষয়টি ছিল বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ব্রিকসের সদস্য হওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট আমাকে তখনই বলেছিলেন যে ধাপে ধাপে নেবেন, ওই ভৌগোলিক অবস্থানকে বিবেচনা করে যে দেশগুলো তাদেরকে নেবেন এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে তারা সদস্য সংখ্যা বাড়াবেন। তবে হ্যাঁ, নিলে আমরা খুব খুশি। কিন্তু আমরা ঠিক ওইভাবে ব্রিকসে এখনই সদস্যপদ পাব, এ প্রথমবারই যে সদস্যপদ পাব, এ ধরনের চিন্তা আমাদের মাথায় ছিলও না, আর সেই রকম চেষ্টাও কিন্তু আমরা করি নাই বা কাউকে আমরা বলিও নাই।’ 

ব্রাজিল ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কিন্তু কাউকে কিছু বলতে যাইনি যে এখনি মেম্বার করেন। তখন থেকে আমরা জানি যে তারা কয়েকটা দেশ নেবে।’ ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ অন্য সরকারপ্রধানদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজেও সদস্যপদ নিয়ে আলোচনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওই সময় আলোচনা হয় যে এখন আমরা (ব্রিকস) এ কয়জন নেব। এরপর ধাপে ধাপে আরো সদস্য সংখ্যা বাড়াব।’ 

বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি এ ইস্যুটা আসবে। আমাদের অপজিশন থেকে খুব হা-হুতাশ যে আমরা নাকি চেয়েছি কিন্তু পাইনি। বাংলাদেশ কিছু চেয়ে পাবে না এটা কিন্তু ঠিক না। অন্তত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের যে মর্যাদাটা আমরা তুলে ধরেছি, সেখানে আমাদের সেই সুযোগটা আছে। তবে তারা বলতে পারে, কারণ বিএনপির আমলে ওইটাই ছিল। বাংলাদেশের কোনো অবস্থানই ছিল না সারা বিশ্বে। বাংলাদেশ মানেই ছিল দুর্ভিক্ষের দেশ, ঝড়ের দেশ, বন্যার দেশ, হাত পেতে চলার দেশ, ভিক্ষা চাওয়ার দেশ। এখন অন্তত বাংলাদেশ ভিক্ষা চাওয়ার দেশ না, এটা সবাই জানে।’

ব্রিকস জোটের অধীনে গঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ শুরু থেকেই বাংলাদেশের ছিল এবং বাংলাদেশ ওই ব্যাংকের সদস্য হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন শুনলাম যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হচ্ছে, ওটার উপরে আমাদের আগ্রহটা বেশি ছিল। সেখানে আমরা যুক্ত হতে চেয়েছিলাম।’ ওই ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশে দুটি প্রকল্প চালু থাকার কথাও আরেক প্রশ্নে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রার বাঁধাধরা না থাকার কথাও তিনি বলেন।

ইউনূসের জন্য বিবৃতি না দিয়ে আইনজীবী পাঠান: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে বিশ্বনেতা ও নোবেলজয়ীদের বিবৃতির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজের প্রতি এত আত্মবিশ্বাস থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিবৃতি ভিক্ষা করে বেড়ান কেন? যারা বিবৃতি দিয়েছেন তাদের আহ্বান জানাই, বিবৃতি না দিয়ে বিশেষজ্ঞ পাঠান, আইনজীবী পাঠান। দলিল-দস্তাবেজ, কাগজপত্র ঘেঁটে দেখুন অন্যায় আছে কিনা।’

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘দুর্নীতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান করতে বলেছেন, কিন্তু দুর্নীতিবাজ পছন্দের লোক হলে আবার এগুলো নিয়ে কথা আসছে। কেন? আইন তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে। নোবেলজয়ী বলে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে না? পৃথিবীতে এমন বহু নোবেল বিজয়ী আছেন, পরবর্তী সময়ে তাদের কাজের জন্য কারাগারে আছেন (যেতে হয়েছে)।’ 

বিবৃতির ফলে আদালত প্রভাবিত হবে কিনা, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কিনা?—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পারবে না কেন? আদালত স্বাধীনভাবে চলবে। ভয় পেলে চলবে না। শ্রমিকদের পাওনা তাদের দিতে হবে। এখন যদি জিজ্ঞেস করি, গ্রামীণ ব্যাংক কিন্তু সরকারি (নিয়মে চলে)। তাহলে সরকারি বেতনভুক্ত একজন কীভাবে বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন? কীভাবে তিনি এগুলো করেন?’ 

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণটা কার? ভোট চোরদের, ভোট ডাকাতদের, খুনি, জাতির পিতার হত্যাকারী, ২১ আগস্টের হামলাকারীদের? এদেরকে মানুষ চায়? এদের প্রতি তো মানুষের ঘৃণা আছে। ২০০৮ সালে প্রমাণ হয়েছে। আমার কাছে অংশগ্রহণ বলতে, জনগণের অংশগ্রহণ। সেটা থাকবে। জনগণ এরই মধ্যে সব নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিদেশে যখন গেলাম, যার সঙ্গে দেখা হয়েছে, বলেন—কী করে বাংলাদেশ এত উন্নতি করল? আর দেশের এরা (বিরোধীরা) এটা বলে না। তারা পরশ্রীকাতরতায় ভোগে। আমি ওটা নিয়ে চিন্তা করি না। যতক্ষণ আছি, দেশের জন্য কাজ করে যাব।’

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম প্রশ্ন করেন, সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক ধকল যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে লক্ষ করছি, নিত্যপণ্যের ব্যাপারে মৌসুমি ব্যবসা পরিচালিত হয়। মজুদ আছে, সরবরাহ আছে, তার পরও হঠাৎ করে জিনিসের দাম বেড়ে যায়। পেঁয়াজ, ডাবের ক্ষেত্রে দেখলাম। কাঁচামরিচের কেজি ১ হাজার টাকা দেখলাম। অনেক পণ্যের ব্যাপারে সিন্ডিকেট করে বাংলাদেশে ব্যবসা করে মানুষের পকেট থেকে অনেক টাকা নেয়া হচ্ছে। সিন্ডিকেটের কথা দায়িত্বশীল মন্ত্রীরাও বলেন। তারা বলেন, সিন্ডিকেটে হাত দেয়া যায় না। সেখানে হাত দিলে বিপদ আছে। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিপদ আছে কে বলেছে, আমি ঠিক জানি না। আমরা তো সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ তখন সাইফুল আলম বলেন, ‘দুজন মন্ত্রী বলেছেন—সিন্ডিকেট আছে, সিন্ডিকেটে হাত দেয়া যাবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন।’ প্রতিউত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন? বাণিজ্যমন্ত্রীকে ধরব তো। খাদ্যপণ্য নিয়ে কয়েকটা হাউজ ব্যবসা করে। যখনই তারা দাম বাড়ায় আমরা আমদানি করি, বিকল্প ব্যবস্থা করি, যাতে তারা বাধ্য হয় দাম কমাতে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। কাজেই সিন্ডিকেট থাকলে ভাঙা যাবে না, এটা কোনো কথা না। কত শক্তিশালী সিন্ডিকেট আমি জানি না, আমি দেখব কী ব্যবস্থা করা যায়।’ 

সরকারপ্রধান এও বলেন, ‘নিজেরা উৎপাদন করেন, বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। নির্ভরশীলতা কমলে সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে। এক ইঞ্চি জায়গাও অনাবাদি রাখবেন না। এখন ডিম নিয়ে (সিন্ডিকেট) শুরু করেছে। ডিম সিদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে দেবেন। অনেক দিন ভালো থাকবে। অভাব যেন না থাকে, সেটাই দেখব। সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভরশীলতা কমায় দিব, বিকল্প ব্যবস্থা করব। সিন্ডিকেট এভাবেই ভেঙে যাবে।’ 

বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে শাকসবজি কিনতে চাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘জীবনে কেউ আগে ভাবে নাই, বর্ষাকালে শিম, লাউ, ফুলকপি, গাজর, টমেটো খাবে। শীতের সবজি গবেষণা করে এখন ১২ মাস উৎপাদন হচ্ছে। এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনেকে (বিভিন্ন দেশ) আমাদের তরিতরকারি কিনতে চাচ্ছে। আমরা দিচ্ছি। সুইজারল্যান্ডের সুপার মার্কেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।’ 

আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ২২ আগস্ট রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিকস সম্মেলন শেষে তিনি ২৭ আগস্ট সকালে দেশে ফেরেন। এ সফরের বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠ করা লিখিত বক্তব্যটি তুলে ধরা হলো—

“‍বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,

সহকর্মীবৃন্দ,

সুধীমণ্ডলী।

আসসালামু আলাইকুম! শুভ অপরাহ্ণ।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ১৫তম BRICS-Africa Outreach and BRICS Plus Dialogue’-এ অংশগ্রহণের জন্য আমি ২২ আগস্ট ২০২৩ সেখানে যাই। এ সম্মেলনে যোগদানের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট Mr. Cyrill Ramaphosa গত জুনে জেনেভায় World of Work Summit-এর সাইডলাইনে সাক্ষাৎকালে ও পরবর্তীকালে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ হতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাকে এ আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২০২১ সালে বাংলাদেশ BRICS-এর অর্থনৈতিক বাতায়ন New Development Bank-এর সদস্যপদ লাভ করে।

এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল: Partnership for Mutually Accelerated Growth, Sustainable Development, and Inclusive Multilateralism’

২৩ আগস্ট সকালে আমি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড বিজনেস সামিট’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেই।

আমার বক্তব্যে আমি দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কথা তুলে ধরি। আমি তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানাই। বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য আমাদের যে অভিযাত্রা সেখানে তাদের সম্পৃক্ত হওয়ারও আহ্বান জানাই।

ওইদিন দুপুরে আমি আফ্রিকা মহাদেশের নয়টি দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের অংশগ্রহণে ‘আঞ্চলিক দূত সম্মেলন’-এ অংশগ্রহণ করি। সম্মেলনে রাষ্ট্রদূতগণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি তুলে ধরেন।

আমি রাষ্ট্রদূতদের সরকার কর্তৃক গৃহীত ‘লুক আফ্রিকা পলিসি’র আওতায় আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দ্বিপক্ষীয় সম্ভাবনাময় খাতসমূহ চিহ্নিতকরণ ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই। এছাড়া, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য রাষ্ট্রদূতদের স্বাগতিক দেশগুলোর সরকার যাতে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে সে জন্য কাজ করার নির্দেশনা প্রদান করি।

সন্ধ্যায় আমি BRICS-এর চেয়ার এবং সম্মেলনের আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগদান করি।

একই দিন সন্ধ্যায় চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ‘সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারত্ব’-এর বিষয়ে আমাদের পারস্পরিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করি।

চীনের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশকে সব সময় সমর্থন দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করতে তার দেশের আগ্রহের কথা জানান।

পরদিন আমি ‘BRICS-Africa Outreach and BRICS Plus Dialogue’ এ অংশগ্রহণ করি। এ সভায় ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ হতে আমি বক্তব্য প্রদান করি। আমার বক্তব্যে আমি গত সাড়ে ১৪ বছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরি। একই সঙ্গে আমি রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করি।

আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করি যে টেকসই উন্নয়নের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০০৬ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫%, ২০২২ সালে আমরা দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮.৭% করেছি। একই সময়ের মধ্যে আমরা চরম দারিদ্র্যকে ২৫.১% থেকে ৫.৬%-এ হ্রাস করেছি। আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি।

আমরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহহীনতার অভিশাপ থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে চলেছি। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর। গত সপ্তাহে আমরা ১০ কোটি মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছি।

২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্প-কারখানা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন মর্মে উল্লেখ করি। আমি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের জন্য অপেক্ষমাণ থাকাকালীন কার্যকর বিকল্পের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরি।

আমি উল্লেখ করি যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের অবদানে আমরা গর্বিত। খাদ্য উৎপাদন, সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং দুর্যোগের ঝুঁকিহ্রাস বিষয়ে আমাদের দক্ষতা আফ্রিকার দেশসমূহের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে বাংলাদেশের সদিচ্ছা প্রকাশ করি। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা, মানব পাচার, সাইবার অপরাধ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইত্যদি বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করি। সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি প্রাপ্তির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও আমি গুরুত্বারোপ করি।

আমি Climate justice, অভিবাসীদের অধিকার, ডিজিটাল ইকুইটি এবং টেকসই ঋণের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য সকলকে আহ্বান জানাই। নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগসহ আইনভিত্তিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরি।

আমি দৃঢ়কণ্ঠে ব্যক্ত করি যে ‘বৈশ্বিক দক্ষিণে অবস্থানকারী দেশগুলোর ওপর আরোপিত কৃত্রিম সিদ্ধান্ত এবং বিভাজনের নীতিকে ‘না’ বলার এখনই উপযুক্ত সময়। সর্বজনীন নিয়ম ও মূল্যবোধকে অস্ত্রে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে আমাদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমাদের নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা-নিষেধাজ্ঞার চক্র বন্ধ করতে হবে। আমাদের অবশ্যই সকল হুমকি, উসকানি ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। আমি বিপজ্জনক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় সম্পদ অপচয় না করে বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের জন্য পণ্য ও পরিষেবা প্রদানে অর্থ সংস্থান করার জন্য আহ্বান জানাই। বিশ্বজুড়ে শান্তি, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতার জন্য সকলকে দায়িত্বশীল হওয়ারও আহ্বান জানাই।

‘BRICS-Africa Outreach and BRICS Plus Dialogue’ চলাকালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে আমি বক্তব্য প্রদান করি। সেখানে আমি নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের সফলতা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তুলে ধরেছি।

সম্মেলনের সাইডলাইনে বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। বৈঠককালে তারা বাংলাদেশের প্রস্তাবনার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের সময় বাণিজ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ইত্যাদি বিষয়ে অব্যাহত সহাযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এছাড়া আমি তাঞ্জানিয়ার প্রেসিডেন্ট, মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করি। তাঞ্জানিয়ার প্রেসিডেন্টকে আমি জিটুজি ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময়, আইটি পণ্য ও পরিষেবার বাজারে প্রবেশ এবং স্টার্ট-আপগুলোর অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে যৌথ উদ্যোগ শুরু করার প্রস্তাব দিই। এছাড়া, বাণিজ্য, ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগ, চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ, সুনীল অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়।

মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে সহমত হই। মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশগ্রহণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে মোজাম্বিকের যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান।

একইদিন নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎকালে তাকে আমি একটি উচ্চআয়ের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে এনডিবিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানাই।

তাছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠককালে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা হয়।

সন্ধ্যায় আমি দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয়োজিত গণসংবর্ধনায় ভার্চুয়ালি যোগদান করি। আমি তাদের দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনযোগাযোগ বাড়াতে অনুরোধ করি।

আমি তাদের বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশীদার হতে বলি।

‘BRICS-Africa Outreach and BRICS Plus Dialogue’-এ আমার সফরসঙ্গী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টাসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। ২৬ আগস্ট সকালে আমরা ঢাকায় উদ্দেশে রওনা হই।  

সামগ্রিকভাবে ‘BRICS-Africa Outreach and BRICS Plus Dialogue’ সভায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমার সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পেরেছি। একই সঙ্গে আমরা রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তুতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেছি। দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর আরোপিত কৃত্রিম সিদ্ধান্তের কারণে আমরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হতে রাজি নই। সর্বজনীন নিয়মের নামে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অসম নীতিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য আমি দক্ষিণের দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছি।

আমরা আশা করব, এ সম্মেলনের মাধ্যমে Mutually Accelerated Growth, Sustainable Development, and Inclusive Multilateralism প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি ফলপ্রসূ হবে এবং ব্রিকস জোট এক্ষেত্রে একটি আদর্শ প্লাটফর্ম হিসেবে তার ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করবে।

আমার লিখিত বক্তব্য এখানেই শেষ।

খোদা হাফেজ।

জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।” 

আরও