পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে ভারত। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি কার্যকর থাকবে। অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতেই মূলত এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো। এরই মধ্যে সে ঝাঁজ বাংলাদেশের বাজারেও লেগেছে। ভারতে শুল্কারোপের খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়।
দেশে কয়েক মাস ধরেই পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় গত জুন থেকে আমদানির অনুমতি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এরপর ভারতীয় পেঁয়াজ এলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে নতুন করে পণ্যটি রফতানিতে ভারতের ৪০ শতাংশ শুল্কারোপ বাংলাদেশের বাজারে বেশ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা। অতীতেও পণ্য রফতানিতে প্রতিবেশী দেশটির বিভিন্ন পদক্ষেপ এ দেশের বাজারকে প্রভাবিত করতে দেখা গেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজ রফতানির ন্যূনতম মূল্য ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলার করেছিল ভারত। এরপর মাস শেষে পুরোপুরি পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় দেশটি। এতে এক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের বাজারে ৫০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় গিয়ে চড়ে।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক মোবারক হোসেন বলেন, ‘দেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ও দাম নিয়ন্ত্রণে আমরা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছিলাম। যাদের পেঁয়াজ পাইপলাইনে রয়েছে হয়তো আগামীকাল (রোববার) দেশে প্রবেশ করত। এসব পেঁয়াজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি। ৪০ শতাংশ শুল্কারোপের ফলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামের ওপর প্রভাব পড়বে।’
প্রতি বছরই পেঁয়াজ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে, যার সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৭ লাখ ৪৩ হাজার টন পেঁয়াজ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি হয় ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫৩ হাজার টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ লাখ ৭ হাজার ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৮ লাখ ৬৩ হাজার টন পেঁয়াজ।
বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৮-৩০ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়। এতে উৎপাদন হয় ৩৪ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ। তবে সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে বিভিন্ন ধাপে পণ্যটির ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে উৎপাদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা থাকলেও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অর্থাৎ ভরা মৌসুমেই বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে তা প্রায় তিন গুণ হয়। বাজার স্থিতিশীল করতে তাই গত ৫ জুন থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় আবার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৫ জুন থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৪ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে এসেছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮৬ টন। অর্থাৎ আইপির বিপরীতে ২৬ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
পেঁয়াজ আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করেই ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানিতে ৪০ ভাগ শুল্কারোপ করেছে। এতে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামে বেশ বড় একটা প্রভাব পড়বে। আজকে যদি আমাদের দেশীয় পেঁয়াজের মজুদ ঠিক থাকত তাহলে তাদের এমন সিদ্ধান্তের কোনো প্রভাব পড়ত না। উল্টো আমরাই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতাম না। তারা দাম কমাতে বাধ্য হতো। কিন্তু আমাদের দেশের পেঁয়াজের মজুদ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাই সরকারকে এখন উদ্যোগ নিতে হবে, ভারতকে অনুরোধ করে যদি শুল্ক প্রত্যাহার করা যায়। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।’
এদিকে ভারতের শুল্কারোপের খবরে হিলি স্থলবন্দরে গতকাল সন্ধ্যায় ২-৩ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয় প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম। ইন্দোর জাতের পেঁয়াজ ৪০-৪১ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। আর নাসিক জাতের পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৪৬-৪৭ টাকায়। গতকাল এ স্থলবন্দর দিয়ে ৪১টি ট্রাকে ১ হাজার ২০৬ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। তবে ভারতের শুল্কারোপের খবরে পেঁয়াজের সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে রাজধানীর বাজারে। গতকাল সন্ধ্যায়ও কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে পাবনার পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৪০০ টাকা পাল্লা (পাঁচ কেজি), রাতে দাম বাড়িয়ে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। একইভাবে ৩৫০ টাকা পাল্লার ফরিদপুরের পেঁয়াজ ৩৮০ এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি রফতানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুনুর রশীদ বলেন, ‘শনিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে ভারতীয় রফতানিকারকরা একটি নোটিফিকেশন পাঠিয়ে আমাদের জানিয়েছেন যে পেঁয়াজ রফতানির ক্ষেত্রে ভারত সরকার ৪০ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে। এতদিন শুল্কমুক্ত পণ্য হিসেবে রফতানি হলেও রোববার থেকে নতুন এ শুল্ক পরিশোধ করে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ রফতানি করতে হবে। ফলে নতুন এ শুল্কারোপের কারণে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।’ তবে কী পরিমাণ বাড়তে পারে তা রোববার নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান এ আমদানিকারক।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর প্রায় ১৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির আইপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে সাড়ে ৩ লাখ টনের মতো পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। ২৬ শতাংশ আমদানি হয়েছে। সুতরাং খুব বেশি আসছে না। তাই ভারত শুল্ক বাড়িয়ে দিলেও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। খুব বেশি ক্ষতি হবে না। আমাদের বাজারে এর খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন হিলি প্রতিনিধি হালিম আল রাজী)