আজ জাতীয় শোক দিবস

সহনশীল ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতি গড়ে উঠুক

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। জনগণের ভোটে নির্বাচিত দলের কাছে ক্ষমতা না দিয়ে নিজেরা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা চালায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ স্পষ্ট করে দেয়, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। এ সংগ্রামে অংশ নিয়ে নিজেদের জন্য রাষ্ট্র নির্মাণ করে

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা শুরু করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। জনগণের ভোটে নির্বাচিত দলের কাছে ক্ষমতা না দিয়ে নিজেরা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা চালায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ স্পষ্ট করে দেয়, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। এ সংগ্রামে অংশ নিয়ে নিজেদের জন্য রাষ্ট্র নির্মাণ করে সর্বস্তরের মানুষ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলাকালেই সপরিবার খুন হন বঙ্গবন্ধু। হত্যার এ রাজনীতি বাংলাদেশে দুঃখজনক এক অধ্যায়ের সূচনা করে, যেখান থেকে বাংলাদেশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। 

অন্তহীন শোক নিয়ে প্রতি বছরের ন্যায় ফের হাজির হয়েছে রক্তস্নাত ১৫ আগস্ট। মধ্য আগস্টের কালরাতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারীদের মধ্যে রাজনীতিবিদ আর সেনাবাহিনীর দলছুট একটি গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন আরো প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিল। ঘাতকের বুলেটে মৃত্যু হয় বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ রিন্টু খানসহ অনেকের। 

নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ও ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থী ফিরিয়ে আনা, শহীদ পরিবার ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, সেই সঙ্গে ১৯৭২ সালের ভয়াবহ খরাসহ নানা দুর্যোগ ও বিপত্তি সামাল দিয়ে দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন বঙ্গবন্ধু। এসব বাধা-বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মাত্র তিন বছরে (১৯৭২-৭৫) যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তা এক কথায় বিস্ময়কর। নির্যাতিত-নিপীড়িত পরাধীন বাঙালি জাতি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাত্র তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সার্বিক, টেকসই উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর একটি আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র গঠনে অনেক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেছিলেন। একটি সুখী-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তার শক্ত ভিত তিনি নিজেই স্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু তার আদর্শ আছে, তার স্বপ্ন-প্রত্যাশা আছে, আছে তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বলা বাহুল্য, তার নেতৃত্বের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন স্বদেশের অধিকারী হয়েছি বটে, তবে এখনো তার স্বপ্নের সোনার বাংলা, শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য-সংহতিও নিশ্চিত করতে পারিনি, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাতির মধ্যে নানা বিভক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ইতিবাচক নয়। 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুদৃঢ় জাতীয়তাবাদ আর সামাজিক সমতা—এ চার মূলনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা বাস্তবায়ন হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সুদৃঢ় সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত হতো। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেন গুদামে খাদ্য নেই, মাঠে ফসল নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ শূন্য। বস্তুত কোনো ব্যাংকের কার্যকারিতা নেই। সড়ক ও রেলপথ বিচ্ছিন্ন, নৌ ও সমুদ্রবন্দরগুলো বিধ্বস্ত। স্কুল-কলেজগুলো ছিল পরিত্যক্ত সেনাছাউনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে সম্ভাব্য সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিছু কুচক্রী মহল তখনো চাইছিল দেশটি স্বাধীনতা হারাক অথবা তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হোক। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। একই সঙ্গে জনগণকে একটি জনমুখী প্রশাসন ব্যবস্থাও উপহার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। 

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে একনিষ্ঠভাবে তার সে দর্শন ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। দৃঢ়তার সঙ্গে সে স্বপ্ন-প্রত্যাশা হৃদয়ে লালন এবং কর্মের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। দেশের সামগ্রিক চিত্রে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিফলন নেই বললেই চলে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ। কিছু গোষ্ঠীর হাতে প্রভূত অর্থ জমা হলেও দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কাটেনি। আইনের শাসন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সর্বব্যাপী দুর্নীতির করাল গ্রাসে অনেক ভালো উদ্যোগও কার্যকর প্রভাব রাখতে পারছে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ, সহনশীল, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। 

আরও