কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতে প্লাবিত চট্টগ্রাম অঞ্চল। স্থানে স্থানে পানিতে ডুবে গেছে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মীয়মাণ রেলপথ। ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার রেললাইনের অবকাঠামো কিছু স্থানে এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। জুলাই পর্যন্ত ৮৮ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া রেলপথটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়ার কথা আগামী মাসে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে রেলপথটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলা কয়েক দিন ধরে বন্যায় ডুবে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর ঢেমশা, দক্ষিণ ঢেমশাসহ স্থানে স্থানে ২০ থেকে ৫০ মিটার করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বড় একটি অংশ পানিতে ডুবেছে। নির্মাণকাজ চলমান থাকায় বন্যার পানিতে পেভমেন্টের মাটি সরে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। এখনো ১২ কিলোমিটার রেলপথ ট্র্যাক বসানো হয়নি। বিশেষত স্টেশন এলাকাগুলোয় ট্র্যাক বসানোর কাজ শেষ করা যায়নি। এ অংশগুলোয়ই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আগামী দেড় মাসের মধ্যে ১২ কিলোমিটার রেলপথ বসাতে না পারলে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস চালু করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়াল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের’ অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যে পরিমাণ রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে তাতে প্রকল্প এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হবে, এটা স্বাভাবিক। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। বন্যা আরো এক সপ্তাহ থাকলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে যাবে।’
প্রবল বৃষ্টিপাতে শুরু হওয়া পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে দেরি হওয়ায় চট্টগ্রাম ও বান্দরবানসহ পার্বত্য জেলাগুলো বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। রেলপথ সংলগ্ন এলাকার কোনো কোনো স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, কিছু স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে রেলপথটিরও ভূমিকা রয়েছে। রেলপথের কালভার্ট সংখ্যা অপর্যাপ্ত হওয়ায় পানি দ্রুত সরতে পারছে না।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের সমীক্ষায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ১৪৫টি মাইনর ব্রিজ বা কালভার্ট স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই প্রকল্পে কালভার্টের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি তুলে আসছিলেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য ছিল পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর ছড়া, খাল ও জলপ্রপাত আছে। অতিবৃষ্টি বা ঢলের সময় এগুলোর পানি দ্রুত বের হওয়ার জন্য রেলপথে কালভার্টের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবির মুখে প্রকল্প এলাকায় সংখ্যা বাড়িয়ে মোট ২৪৪টি কালভার্ট স্থাপন করা হয়। কালভার্টগুলোর দৈর্ঘ্য সর্বনিম্ন ৫ মিটার থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ মিটার পর্যন্ত। ভূমি থেকে রেলপথের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৮ মিটার। আবার রেলপথের অনেক অংশ পাহাড়ি এলাকা। এসব এলাকায় রেলপথ বসানো হয়েছে পাহাড়ের সঙ্গে সমন্বয় করে। এছাড়া প্রকল্পে মেজর ব্রিজ স্থাপন করা হয়েছে ৩৯টি। এর মধ্যে মাতামুহুরী নদীতে ৪৮০ মিটার, সাঙ্গু নদীতে ২৮০, ডলু নদীতে ১০০, টংকাবতী নদীতে ৮০, মাতামুহুরীর শাখা নদীতে ২৪০ ও বাঁকখালী নদীতে ১৬০ মিটারের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথটির ভূমিকার কথা মানতে নারাজ প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই ঠিক নয়। কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রেলপথ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। বরং আমরা সমীক্ষার প্রস্তাবের চেয়েও বেশি কালভার্ট নির্মাণ করেছি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) জলবায়ু ফান্ড থেকে প্রকল্পের অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে। তাই পরিবেশগত বিষয়ে দাতা সংস্থার তদারকি খুবই কঠোর ছিল।’
তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় ১০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ায় প্লাবনের পানি নামার সময় বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে অমূলক নয়। দীর্ঘদিন উন্মুক্ত একটি পরিবেশের পর হঠাৎ বাধা এলে পানি স্বাভাবিকভাবেই আটকে যাবে। তবে যেভাবে বৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে তাতে শুধু নতুন রেলপথকে বন্যার জন্য দায়ী করা চলে না। এর পরও চলমান প্রকল্প কর্তৃপক্ষের উচিত সাম্প্রতিক বন্যার কারণ উদ্ঘাটন ও রেলপথে কালভার্ট স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবেশগত ত্রুটি হয়েছে কিনা সে বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা চালানো।’
নির্মীয়মাণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের চকরিয়া-কক্সবাজার অংশের (লট-২) কাজটি চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিআরইসি) সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। বন্যায় রেলপথটির ক্ষয়ক্ষতির কারণ জানতে চাইলে এ প্রকল্পে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের প্রজেক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আহমেদ সুফি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যায় রেলপথটির চকরিয়া-কক্সবাজার অংশের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমেছে। আজকেও (গতকাল) আমরা ট্রলিতে করে পুরো রেলপথটি ঘুরে দেখেছি। কোথাও কোনো কাঠামোগত ক্ষতি আমরা পাইনি। তবে টানা বৃষ্টির কারণে স্টেশন বিল্ডিংগুলোর বাইরের অংশের কাজগুলো আমরা করতে পারছি না। ’
তিনি আরো বলেন, ‘সিআরইসি-ম্যাক্সের জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রকল্পটির ৫৪ কিলোমিটার অংশ বাস্তবায়ন করছে। রেলপথটির মাটির কাজ ও রেলপথ বসানোর কাজ আমরা শেষ করে এনেছি। প্রায় সাত কিলোমিটার অংশে জয়েন্টের কাজ বাকি আছে।’
প্রসঙ্গত, কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির মূল প্রস্তাব অনুমোদন হয় ২০১০ সালের ৬ জুলাই। প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন হয় ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল। এর ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এটির কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুনে। ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকল্পটিকে সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটারের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে রামু থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়াল ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। মূলত ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, পর্যটন শহর কক্সবাজারকে সারা দেশের রেলওয়ে নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা, পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং সহজে ও কম খরচে মাছ-লবণ-কৃষিজ-বনজ পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সরকার।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষার সময় এমনিতেই এমব্যাংকমেন্টের (রেলপথ বা সড়কপথের জন্য বাঁধ) কিছুটা ক্ষতি হয়। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের এমব্যাংকমেন্টটি নতুন। বৃষ্টিতে হয়তো কিছু ক্ষয়ক্ষতি হবে। এটা তেমন বড় হওয়ার কথা না। পানি তো দুই দিক থেকেই (রেলপথের দুইপাশে) বাড়ছে। একদিক থেকে যদি বাড়ত, যদি পানির প্রবাহ থাকত তাহলে ক্ষয়ক্ষতিটা বেশি হতো। তবে কিছু ক্ষতি তো হবেই। আর এবার বৃষ্টিও হয়েছে অনেক। একদিনে ৩২২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।’
বন্যার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির কারণে আগামী অক্টোবরে রেলপথটি উদ্বোধনের পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত আগের কর্মসূচিতেই আছি। ইনশা আল্লাহ নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যে কাজ শেষ করে আমরা রেলপথটি উদ্বোধন করতে পারব।’
প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন খাল ও নদীর ভাঙন, বালি উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পাল্টে যাওয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকার দ্রুত নগরায়ণের কারণে বান্দরবান থেকে নেমে আসা পানির স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, যেভাবে বৃষ্টি ও পানিপ্রবাহ বেড়েছে, সেই অনুপাতে নিষ্কাশন না হওয়ায় হঠাৎ করেই বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রামের মতো বান্দরবান এলাকায়ও এখন বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার নিয়েছে।
বান্দরবানের বাসিন্দারা বলছেন, পাহাড়ে বৃষ্টিপাত বেশি হলেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পানি নেমে যায়। কিন্তু এবার পানি নামছে খুবই ধীরগতিতে। বান্দরবানের সাঙ্গু নদী দিয়ে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও পার্শ্ববর্তী ছড়া কিংবা খাল দিয়ে পানি দ্রুত সরে যেতে না পারায় এখন পাহাড়েও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা।
বান্দরবানের সমাজকর্মী ডনাই প্রু নেলি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমন বন্যা আমরা গত কয়েক দশকে দেখিনি। দিনে দিনে এখানকার গ্রামীণ ছড়াগুলো দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে নানাভাবে। বৃক্ষ নিধন ও ছড়ার পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় যারা বসবাস করছেন, তাদের বেশির ভাগ নদীর তীরঘেঁষে বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণ করায় নদীপথও ছোট হয়ে আসছে। বান্দরবান শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এখানকার ড্রেনগুলো দিয়ে ঠিকমতো পানিপ্রবাহ হচ্ছে না। এসব কারণেই জলজট, আর সেই জলজট থেকে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।’