খাল জলাশয় ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা

সামনের বছরগুলোয় আরো ভয়াবহ রূপ নেবে ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি

এতদিন পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়লেও এখন ময়লা পানিতেও বংশবিস্তার করছে এডিস মশা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এ আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমেই বিচরণক্ষেত্র ব্যাপক মাত্রায় বিস্তৃত করতে পেরেছে ডেঙ্গু জীবাণুবাহক মশার এ প্রজাতিটি। বিশেষ করে রাজধানীর খাল-জলাশয়গুলোর জমে থাকা ময়লা পানি হয়ে উঠেছে মশাটির অবাধ প্রজননক্ষেত্র। এজন্য এসব খাল-জলাশয়ের অব্যবস্থাপনা ও টেকসই

এতদিন পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়লেও এখন ময়লা পানিতেও বংশবিস্তার করছে এডিস মশা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এ আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমেই বিচরণক্ষেত্র ব্যাপক মাত্রায় বিস্তৃত করতে পেরেছে ডেঙ্গু জীবাণুবাহক মশার এ প্রজাতিটি। বিশেষ করে রাজধানীর খাল-জলাশয়গুলোর জমে থাকা ময়লা পানি হয়ে উঠেছে মশাটির অবাধ প্রজননক্ষেত্র। এজন্য এসব খাল-জলাশয়ের অব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপের অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বক্তব্য হলো পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই রাজধানীর খাল ও জলাশয়গুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনায় কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সামনের বছরগুলোয় রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। 

সারা দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। গতকালও সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৭৫৫ জন ভর্তির তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। এর মধ্যে আটজনই ঢাকার। এর আগে বুধবার দেশের ইতিহাসে একদিনে রেকর্ড ১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকারই ১৭ জন। 

এ পরিস্থিতির জন্য এখন আবহাওয়াজনিত কারণের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের খাল-জলাশয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর মাশুল হিসেবে সামনের বছরগুলোয় এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। 

রাজধানীর খালের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেয়া হয় বছর আড়াই আগে। ঢাকা ওয়াসা আগে সেই দায়িত্ব সামলেছে। কিন্তু খাল ও জলাশয়গুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণে কোনো সিটি করপোরেশনই এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। জোড়াতালি দিয়ে চলছে দখল উচ্ছেদ, খনন, পরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম। এভাবে খালগুলোর টেকসই উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে কারণেই ঢাকায় দিন দিন বাড়ছে মশাবাহিত রোগ। 

ঢাকা ওয়াসা থেকে দুই সিটি করপোরেশন ২৬টি খাল বুঝে পায় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই দুই সিটি করপোরেশনে খাল পরিষ্কারে বেশ কর্মযজ্ঞ চালায়। এর প্রভাবে ওই সময় রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যায়। তবে এরপর খাল পরিষ্কারের কর্মকাণ্ড নিয়মিত না হওয়ায় কয়েক মাসের ব্যবধানে আগের অবস্থায় ফিরে যায় খালগুলো।

ঢাকার খাল ও জলাশয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওয়াসা থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও খালগুলো উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। যে আশা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে খাল হস্তান্তর করা হয়েছিল, তার কোনো প্রতিফল আমরা দেখিনি।’

ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে ঢাকার খাল-জলাশয়ের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এডিস মশা জন্ম নেয় আবদ্ধ পানিতে। ঢাকার খাল ও জলাশয়ের বেশির ভাগ পানিই আবদ্ধ ও মারাত্মক রকম নোংরা। এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে ঢাকার ডেঙ্গু মহামারী রূপ নেয়ার পেছনে এসব খাল-জলাশয়ের অব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে। আর এ ব্যর্থতার দায় দুই সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে।’

বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে ১১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে ২৯টি খাল রয়েছে। ২০২১ ও ২০২২ সালে বর্ষা মৌসুমের আগে আগে খালগুলো পরিষ্কারের জন্য ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে দুই সিটি। এর পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়েছিল। যদিও চলতি বছরের শুরুতে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খাল ও জলাশয় পরিষ্কার নিয়ে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ফলে এবারের বৃষ্টিতে তীব্র জলাবদ্ধতা যেমন ভুগিয়েছে, পাশাপাশি ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মুখোমুখি হচ্ছে নগরবাসী।

একটা সময় কীট গবেষকরা বলেছেন পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এডিস মশার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্বচ্ছ পানির পাশাপাশি বদ্ধ ও নোংরা পানিতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটতে দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ও দুই সিটি করপোরেশনের ভুল পদ্ধতির মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কারণে এডিস মশার আচরণও বদলে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার।

আগামীতে ঢাকার অপরিষ্কার খাল ও জলাশয়গুলোর কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি খাল ও জলাশয়ের নোংরা পানিতেও এডিস মশা জন্মাতে পারে। তবে এটা এখনো বড় আকার ধারণ করেনি। খাল ও জলাশয়ের নোংরা পানিতে কিউল্যাক্স মশার লার্ভার ঘনত্ব বেশি। কিন্তু ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় খাল-জলাশয়কে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা তাকে অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে খাল ও জলাশয় পরিষ্কারের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশার বিস্তারে নগরীর অপরিষ্কার ও বেদখল খালগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। খাল অব্যবস্থাপনার কারণে ঢাকার উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এডিস মশা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। এর আগে ২০১৯ সালেও রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। সে সময়ের বিপর্যয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক একটি গবেষণা করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ’-এ ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, নগরীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। 

গবেষক দলের সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন এবং দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, যেসব এলাকায় স্বচ্ছ পানির খাল-জলাশয় ও গাছপালা কম ছিল, সেসব এলাকার তাপমাত্রা বেশি। বিশেষ করে ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি তাপমাত্রার এলাকাগুলোয় ওই সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল বেশি। অন্যদিকে ২২ থেকে ২৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার এলাকাগুলোয় ডেঙ্গু আক্রান্তের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক কম।’

অপরিষ্কার খাল-জলাশয়, ডোবা এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন ডেঙ্গু বিষয়ে পিএইচডি গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে নতুন নতুন তথ্য আমাদের সামনে আসছে। এখন শুধু ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা একটি-দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ঢাকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আমরা দেখেছি খাল-ডোবা রয়েছে এমন এলাকা এডিস মশা বিস্তারের জন্য উপযোগী। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকে অবশ্যই মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে খাল ও জলাশয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ও রাজধানীর খাল ও জলাশয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় আগামী বছরগুলোয় ঢাকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আবহাওয়া এডিস মশার বিস্তারের জন্য খুবই উর্বর। শুধু মশা নিয়ে কাজ করতে থাকলে আমরা স্পষ্টভাবেই বলব, এটা ভুল পদক্ষেপ হবে। মশক নিধনের পাশাপাশি পরিবেশগত যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলোয়ও নজর দিতে হবে। বিশেষ করে নগরীর খাল ও জলাশয় পরিচ্ছন্ন রাখা আবশ্যক। এছাড়া মশার সঙ্গে ভাইরাস ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ না নিলে ডেঙ্গুর এ ভয়াল রূপ থামানো কঠিন হবে।’

এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম সম্প্রতি বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমরা প্রতিনিয়ত খাল ও জলাশয় পরিষ্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। ভবিষ্যতে এটি আরো প্রসারিত হবে।’

যদিও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে খাল-জলাশয়ের তেমন সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা একেক সময় একেক কথা বলছেন। কিছুদিন আগে মায়ামির বিশেষজ্ঞরা এসে বলেছেন এডিস মশা স্বচ্ছ পানিতে জন্মে। আমরা সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও বসব। যখন ডেঙ্গু থাকে না, তখন তো আর ফুল ফোর্স নিয়ে ডেঙ্গু মোকাবেলায় নামা যায় না। যখন ডেঙ্গু বেড়েছে আমরা এখন সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মাঠে নেমেছি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই ডেঙ্গু মোকাবেলায় আরো কী কী করা যায় তা ঠিক করব।’ 

আরও