গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলন ও সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই

যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, স্বাধীনতার ৫২ বছর পর দেশে-বিদেশে আজ এটা সর্বজন স্বীকৃত যে আমরা গণতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আমরা হারিয়েছি। কিন্তু আমি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত শিগগিরই হোক আর দেরিতেই হোক, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরে পাবে

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রধান উপদেষ্টা। ছিলেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী এ রাজনীতিবিদ বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের সমকালীন রাজনীতি, ডলার সংকট ও ব্যাংক খাতের বিরাজমান পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি এবং আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন

আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন? 

যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, স্বাধীনতার ৫২ বছর পর দেশে-বিদেশে আজ এটা সর্বজন স্বীকৃত যে আমরা গণতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আমরা হারিয়েছি। কিন্তু আমি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত শিগগিরই হোক আর দেরিতেই হোক, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরে পাবে ইনশাআল্লাহ। এর কারণ, অধিকার আদায়ে এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস রয়েছে। ইতিহাস এ কথাই প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ একনায়কত্ব বা স্বৈরশাসন কোনো দিন মেনে নেয়নি। তাই আমি আশাবাদী, খুন-গুম-হত্যা ও প্রতিশোধের রাজনীতির অবসান ঘটবে। আমাদের ভবিষ্যৎ হবে আমাদের অতীতের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসা নীতি গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ শুনতে চাই।

১৯৬৫ সালে প্রণীত ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি আইনের ধারা ২১২(এ)(৩)(সি)-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যে ভিসা নীতির ঘোষণা দিয়েছেন তার মূল কথা হচ্ছে—অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যারা বাধা দেবে, তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে। এ ভিসা নীতি গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অবমাননাকর। উপমহাদেশের কোনো দেশে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা এই প্রথম। এর আগে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ যেমন—নাইজেরিয়া, উগান্ডা ও সোমালিয়ায় অনুরূপ ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু দুঃখজনকভাবে প্রশাসনের যে দলীয়করণ হয়েছে তার ফলে কোনো একটি বিদেশী রাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার ফলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যাবে না। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলন ও সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। 

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করছেন?

একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে যদি আগামী নির্বাচন না হয়, তাহলে সেই নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। গত ১২ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যাতে করে বর্তমান সরকারি দল যেকোনো অবস্থায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে শাসকগোষ্ঠী সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের দোহাই দিয়েছিলেন। যদিও ওই রায় ছিল বিতর্কিত। শুধু তা-ই নয়, ওই রায়ে বলা হয়েছিল, দশম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার উদ্দেশ্যে রায়ের ওই অংশ গ্রহণ করেনি। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের আসল কারণ ছিল প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাস্তবায়ন। ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধনীর জন্য ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় কমিটি গঠন হয়। কমিটি আট মাস ধরে সাবেক প্রধান বিচারপতি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কমিটি তাদের আগের অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাব করে, যা ৩০ জুন সংসদে ২৯৯-১ ভোটে পাস হয়। ১৯৯৪ সালে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল তার চিন্তার ফসল। যদিও আসল সত্য ছিল ভিন্ন, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রথম উত্থাপন করা হয়। ওই সময় আওয়ামী লীগ ও অন্য বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ৯৬ দিন হরতাল পালন করেছিল। এটা সুখের বিষয় যে দিনের পর দিন হরতালের সংস্কৃতি থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু আমরা আশা করব ক্ষমতাসীন দল জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

নির্বাচনে বহিঃশক্তির কোনো প্রভাব থাকবে কি? থাকলে কোন দেশের প্রভাব কেমন হতে পারে?

আমাদের নির্বাচন অবাধ এবং নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়। নির্বাচনে যদি বহিঃশক্তির কোনো প্রভাব থাকে তা দেশের জন্য শুধু অমঙ্গলই বয়ে আনবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আমরা দেখলাম, একটি বিদেশী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফরে এসে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখলেন। পর্দার অন্তরালে তিনি কী করেছেন আমরা তা জানি না কিন্তু এটা ছিল বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি বিদেশী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। এর আগেও বাংলাদেশের নির্বাচনে এবং রাজনীতিতে বহিঃশক্তির যে প্রভাব ছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার কোয়ালিশন ইয়ার্স বইয়ে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, তিনি কেমন করে তৎকালীন বাংলাদেশের সেনাপ্রধানকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন। মিস্টার মুখার্জির বই থেকে এটা আঁচ করা যায়, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতেই তিনি জানতেন ওই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় আসবে। 

সত্যি কথা বলতে কি, একটা দেশে যখন গণতন্ত্র থাকে না তখনই সে দেশের রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বেশি হয় এবং তা কার্যকরও হয়। একটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম রক্ষাকবচ হচ্ছে গণতন্ত্র। সম্প্রতি একজন কেবিনেট মন্ত্রী (তিনি প্রভাবশালী কিনা জানি না কিন্তু তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন) প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি একটি বিদেশী রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে আবারো ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য। মন্ত্রী মহোদয়ের এ বক্তব্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং জনগণের জন্য চরম অবমাননাকর। কিন্তু অবমাননাকর এ বক্তব্য প্রদানের পরও তিনি তার মন্ত্রিত্ব হারাননি। প্রশ্ন জাগে, আমরা কতটা স্বাধীন আর বাংলাদেশ কতটা সার্বভৌম? 

দেশের ডলার সংকট ও ব্যাংক খাতের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ডলারের এ সংকট সম্পর্কে সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, গত অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। দেশের ইতিহাসে আমদানি ব্যয়ের এত উল্লম্ফন এর আগে কখনো হয়নি। সরকারের দাবি, এটাই ডলার সংকটের মূল কারণ। 

এর বাইরে সরকার যে কথাগুলো বলে না তা হলো বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার। সরকারের মন্ত্রীরাও নানা সময়ে বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে করের মাধ্যমে সেটা সাদা করার সুযোগও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সুযোগ কেউ গ্রহণ না করায় নতুন অর্থবছরের বাজেটে সেটি রহিত করা হয়েছে। 

আমদানি-রফতানির আড়ালেই মূলত এ অর্থ পাচার হয়ে থাকে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত রফতানির বিপরীতে দেশে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার আসেনি। এত বিপুল অর্থ কোথায় গেল? আইএমএফ জানতে চেয়েছে চলমান বছরেও রফতানির ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে আসেনি কেন। একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে? 

আগের আমদানি দায়ের পরিমাণ কত? অর্থাৎ বাকিতে আমদানি করে যে অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি। গণমাধ্যম বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এমন অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ এখন আমাদের প্রকৃত রিজার্ভ ২৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। এ বিপুল পরিমাণ দায় কেন তৈরি হলো? আমদানি করে কেন ব্যবসায়ীরা দায় মেটাতে পারেননি? আমদানির জন্য তারা বিপুল পরিমাণ ঋণ তো ঠিকই ব্যাংক থেকে নিয়েছিলেন। সেই ঋণের টাকা কী তাহলে ওই যে রফতানি আয় দেশে আসেনি তার আড়ালে ডলার হয়ে বেরিয়ে গেছে? সে জন্যই দেশ এখন ডলার সংকটে? এসব প্রশ্নের জবাব সরকার দিচ্ছে না। বিরোধী দলগুলোও জোরালোভাবে জাতির সামনে সরকারের এ ব্যর্থতা তুলে ধরতে পারছে না। 

এখানেই শেষ নয়, আমরা জানি বর্তমানে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ৯৬ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। অথচ পাঁচ বছর আগেও এ ঋণের পরিমাণ অর্ধেক ছিল। এ ঋণের মধ্যে আবার ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যা পরিশোধ করতে হবে এক বছর বা তার কম সময়ে। অথচ দেখুন আমাদের হাতে প্রকৃত রিজার্ভ সাড়ে ২৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। তাহলে কি এটা বলা যায় না বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে দেউলিয়া অবস্থায় আছে? আর একটা দেশ যখন এমন পরিস্থিতিতে থাকে তখনই কেবল বেলআউটের জন্য আইএমএফের কাছে যায়, তাও খুব সামান্য টাকার জন্য ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার? আবার আন্তর্জাতিক ঋণ মান সংস্থা মুডি’স বাংলাদেশের ঋণমানও কমিয়ে দিয়েছে। অথচ সরকার এসব কথা বলছে না, আড়াল করছে। সব দোষ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনার ওপর।

এখন আমরা যে অর্থনৈতিক সংকট দেখছি তার শুরু হয়েছে ব্যাংক খাতের লুটপাট দিয়ে। এ পরিকল্পিত লুটপাটের প্রথম অধ্যায় ছিল, দেশের অর্থনীতিতে চাহিদা না থাকলেও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া। সংসদ সদস্য মনোনয়ন না দেয়ার সান্ত্বনাস্বরূপ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদাহরণ আমরা দেখেছি। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক খাতে সুশাসন থাকবে না এবং সেটাই হয়েছে। একসময় সরকারি খাতের বেসিক ও জনতা ছিল নামকরা ব্যাংক। বেসরকারি খাতে ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং আরো হাতে গোনা দু-চারটি ব্যাংক। নবীন ব্যাংকারদের স্বপ্ন ছিল এসব ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করা। অথচ দেশের সব ব্যাংককে দেউলিয়া পরিস্থিতি করে দেয়া হয়েছে। দলীয় সমর্থক-নেতাকর্মীদের সুবিধা দিতে অবাধে ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণের টাকা যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কিনা সেটা দেখা হয়নি। ফলে বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় বসে তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা, সেটা এখন বেড়ে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। 

ঋণের নামে ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট করা হয়েছে, অথচ কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এখনো নেয়া হয়নি। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে, নিয়মের বাইরে গিয়ে বারবার পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে, আদালতে মামলার নামে বহু খেলাপি ঋণ চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। আইএমএফ একবার বলেছিল, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২ লাখ কোটি টাকা। আমি বলব, এখন সেটা ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া নয়-ছয় সুদহার চাপিয়ে দিয়েও অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করেছে বর্তমান সরকার। বর্তমানে সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ হলেও আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে একদিকে আমানতকারীদের প্রকৃত সুদহার ঋণাত্মক, ব্যাংকে আমানত রাখা কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে। এতে ব্যাংকগুলো ব্যাপক তারল্য সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ব্যবসায়ীরা সুদবিহীন ঋণ পাচ্ছেন। আবার সেই ঋণও ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। এদিকে সস্তায় ঋণ পাওয়ার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে খ্যাত ব্যাংক খাত পুরো দেউলিয়া হয়ে যেতে বাধ্য। 

সামনের দিনে রাজনীতিতে অর্থনীতি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলারও ছিল না। বলা হচ্ছে, বর্তমানে এটি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একটি দেশের অর্থনীতি যখন বড় হতে থাকে, তখন রাজনীতিতেও এর প্রভাব বাড়তে থাকে। অর্থাৎ রাজনীতি অর্থনীতি দিয়ে প্রভাবিত হয়। তথা অর্থনীতির স্বার্থকে মেনে নিয়েই রাজনৈতিক কৌশল বা কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হয়, যাতে মানুষের জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত না হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তাহলো এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি। ভোটবিহীন একটি সরকার শুধু উন্নয়নের ফানুস জনগণের সামনে তুলে ধরেছে যেটা এখন চুপসে যাচ্ছে। উন্নয়নের যে দৃশ্যমান চিত্র আমরা দেখি, যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার ইত্যাদি, এর পেছনে রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি। অন্যদিকে উন্নয়নের যে তথ্য-উপাত্ত সরকার প্রকাশ করে সেগুলোও ইচ্ছামতো বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো হয়, উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা, উন্নয়নের গল্প শোনানো। 

সুতরাং ভোটবিহীন একটি সরকারের কথিত উন্নয়ন কখনো প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। সে উন্নয়ন অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতির জন্য কাজেও আসে না। অচিরেই হয়তো আমরা দেখতে পাব, কিছু কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের অংশগ্রহণে, সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত একটি গণতান্ত্রিক সরকারই কেবল পারে টেকসই উন্নয়ন করতে। 

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্ধকার দিক হলো, নির্বাচনে অর্থনীতি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। সরকার বা বিরোধী দল কেউ-ই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয় না। তারা বলে না তাদের আর্থিক নীতি বা মুদ্রানীতি কী হবে এবং তারা ভোটারদেরও বলে না কীভাবে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করবে।

স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর জন্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমা না চাওয়ার কারণ দেখিয়ে আপনি দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাই। 

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ ৩৩ বছরের। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আমার একটা পরিকল্পনা ছিল। একটা ভিশন ছিল। কিন্তু জামায়াত বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে এ সম্পর্কে জাতির সামনে একটি গ্রহণযোগ্য বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে আমার স্পষ্ট মতপার্থক্য ছিল এবং কোনো উপায়েই জামায়াত আমার কথা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না, যা আমি আমার পদত্যাগপত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছি।

জামায়াতকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে আসতে প্রায় দুই দশক চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলাম তখন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলাম। এ সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ বা বিদ্বেষ ছিল না। হঠাৎ করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি। এ সিদ্ধান্ত ছিল দীর্ঘদিনের চিন্তার ফসল। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান, বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও মরক্কোয় ইসলামী আন্দোলনের কর্মনীতি এবং দিকনির্দেশনায় যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে (যা গ্রহণ করতে জামায়াত তৈরি ছিল না) সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নিজের বিবেকের তাড়নায় দেশের স্বার্থ, ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থ সামনে রেখে জামায়াত থেকে সরে দাঁড়ানোকেই আমি শ্রেয় মনে করি। আমার পদত্যাগের কারণগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করি, যা গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। প্রচারমাধ্যমে সবকিছুই সংরক্ষিত আছে, তাই বিষয়টি নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলতে চাই না।

জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনীতি নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

যেহেতু আমি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছি তাই জামায়াতের রাজনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলা আমার জন্য সমীচীন নয়। 

আপনার মতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী?

জামায়াত একটি পুরনো দল। জামায়াতের একটা সুনির্দিষ্ট আদর্শ কর্মসূচি এবং শক্তিশালী সংগঠন আছে। জামায়াতের কর্মী বাহিনী সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ। জনগণের একটা অংশ সর্বাবস্থায় জামায়াতকে সমর্থন করবে। কিন্তু জামায়াতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে জামায়াত নেতারা আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি কীভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং বিশেষভাবে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামী আন্দোলনের যে পরিবর্তন হয়েছে সেই পরিবর্তনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে কতটা দূরদর্শী এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। 

রাজনীতি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

বাংলাদেশ সংবিধান সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা রোমান সম্রাটের ক্ষমতার চেয়েও বেশি। মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার বলতে বাংলাদেশে কিছু নেই। বাংলাদেশের সরকার হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুবই সীমিত। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের অধিকারী দল সংবিধান সংশোধনসহ যা ইচ্ছা তা করতে পারে। নির্বাচনে যারা জয়লাভ করে তারাই সব ক্ষমতার অধিকারী। এ অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হলেও গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা যাবে না। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের প্রয়োজন হবে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাংবিধানিক পন্থায় নতুন সংবিধানের অধীনে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের নতুন যাত্রা করতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনীতিতে পেশাদারত্ব আনতে হবে। প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ নিয়ে সুদূর প্রবাসের নির্বাসিত এ জীবনে এবং পরিণত বয়সে আমাদের স্বপ্ন হচ্ছে দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে; রাজনৈতিক বিদ্বেষ এবং হানাহানির অবসান ঘটবে; জাতির মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য তৈরি হবে। পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যে কৃষকের ছেলে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসবে, জীবনে তার স্থান নির্ধারিত হবে তার মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে। আমাদের স্বাধীনতা তখনই স্বার্থক হবে যখন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী একজন তরুণ ছাত্রছাত্রী আকাশ পানে তাকিয়ে বলতে পারবে”আমার দৃষ্টিসীমা যতটা প্রসারিত, জীবনে আমি ততটাই উন্নতি করতে পারব।”

সত্যি কথা বলতে কি এরূপ একটা বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এবি পার্টি নামে একটি মধ্যমপন্থী এবং ইনক্লুসিভ রাজনৈতিক দল গঠনে সাধ্যমতো সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়েছি। এ মহান লক্ষ্য অর্জনে জীবনের বাকি সময়টুকু দেশ গড়ার কাজে ব্যয় করতে চাই।

আরও