জনসংখ্যাকে সব উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে

দেশের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হারের চেয়ে নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ। এর মূল কারণ মানুষের গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরের প্রবণতা। জন্মহার, মৃত্যুহার ও মাইগ্রেশন হারের ওপর নির্ভর করে একটি স্থানের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাসের হার। গত বছরের জনশুমারি অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখের কাছাকাছি। যদিও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটি ১৭ কোটি ৩০ লাখ। জনশুমারি অনুসারে, আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১

ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম পিএইচডি করেছেন জনবিজ্ঞান বিষয়ে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পোস্ট-ডক্টরেট করেছেন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গ্লোবাল হেলথ কাউন্সিল (ইউএসএ) কর্তৃক তিনি ‘নিক সাইমন্স স্কলার’ নির্বাচিত হয়েছিলেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণার জন্য। আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে তিনি জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম

চলতি বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ অনুসরণে আমাদের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো ‘জেন্ডার সমতাই শক্তি: নারী ও কন্যাশিশুর মুক্ত উচ্চারণে হোক পৃথিবীর অবারিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন।’ প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

প্রতিপাদ্যটি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে খুবই প্রাসঙ্গিক। জেন্ডার সমতায় কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-জনমিতিক সূচকে প্রাথমিক শিক্ষায় নিট এনরোলমেন্টের মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য থাকলেও আমাদের আরো অগ্রগতি দরকার। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার সাক্ষরতার হারে পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রায় ৬ শতাংশ পিছিয়ে। বছরে প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী স্বামী কর্তৃক সহিংসতার শিকার হন। আরেক চতুর্থাংশ নারী নিজের স্বাস্থ্যযত্নে সেবা গ্রহণে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৩ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এ বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে আইসিপিডি+২৫ প্রতিশ্রুতি পূরণ করে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা শূন্যতে পৌঁছানো আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্বের উচ্চহার জেন্ডার সমতার জন্য বাধা রয়েছে। শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের অনুপাতে প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধান রয়েছে। আর রাজনীতিতে জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বিবেচনায় নিলেও নারী প্রতিনিধিত্ব দাঁড়ায় মাত্র ২১ শতাংশ। পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যে অগ্রগতি থাকলেও জেন্ডার সমন্বিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানে অগ্রগতি দরকার, কেননা বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা মূলত নারীকেন্দ্রিক। জেন্ডার শ্রেয়োবোধ পরিবর্তনে পুরুষদের অংশগ্রহণে কার্যকর কৌশলপত্র দরকার। জনমিতিক লভ্যাংশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নারী ও কন্যাশিশুদের কণ্ঠ মুক্ত করতে হবে এবং তাদের পছন্দ ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে জেন্ডার সমতায় আমরা এগিয়ে যাব।

অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরের কারণে দেশের শহরগুলোয় জনসংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ছে। শহরকেন্দ্রিক মাইগ্রেশন প্রবণতা দেশের সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য কি সহায়ক?

দেশের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হারের চেয়ে নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ। এর মূল কারণ মানুষের গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরের প্রবণতা। জন্মহার, মৃত্যুহার ও মাইগ্রেশন হারের ওপর নির্ভর করে একটি স্থানের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাসের হার। গত বছরের জনশুমারি অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখের কাছাকাছি। যদিও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটি ১৭ কোটি ৩০ লাখ। জনশুমারি অনুসারে, আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। আবার বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্যান্স সিস্টেম অনুসারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্বাভাবিক হার। কিন্তু নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এর দ্বিগুণেরও বেশি। নগরায়ণের হার উন্নয়নের একটি সূচক। কিন্তু সে সূচকের সঙ্গে বিবেচ্য জনসংখ্যার আকার। কারণ শহরের জনসংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন কিংবা চিকিৎসার মৌলিক সেবা খাতে চাপ বেড়ে যায়। তখন শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে। এখন দেশের ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে। ঢাকা পৃথিবীর নবম জনবহুল শহর, যেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ঢাকা ২০৩০ সালের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে চলে যাবে। তখন ঢাকাকে ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের চাপ বহন করতে হবে। ভারতের মুম্বাই বা চীনের বেইজিং তখন ঢাকার পেছনে পড়ে যাবে। উন্নয়নের জন্য উচ্চ জনঘনবসতি অন্তরায় হতে পারে। গুটিকয়েক নগর রাষ্ট্র বিবেচনায় না নিলে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।

ঘনবসতি উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ তখনই যখন বাড়তি জনগণের জন্য কোয়ালিটি ইনস্টিটিউটস তৈরি হয় না এবং সেবা খাত ডেভেলপ করে না। আবার কোয়ালিটি ইনস্টিটিউটস ও সেবা খাত প্রতিষ্ঠিত হলে ঘনবসতির কারণে একটি স্থানে উৎপাদন ও ভোগের পরিমাণ বেড়ে যায় যা ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখে। তাই নগর কেন্দ্রিক ঘনবসতি উন্নয়নের জন্য কতটুকু সহায়ক কিংবা চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে তা নির্ভর করছে সরকার ও স্থানীয় সরকারগুলোর নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী, কার্যকর ও সমন্বিত নীতিনির্ধারণের ওপর।

আর শুধু মেট্রোপলিটন সিটিকে বিবেচনায় নিলে হবে না মেট্রোপলিটন সিটির বাইরের আরবান এলাকা রয়েছে। সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। মেট্রোপলিটন সিটিকে বিবেচনায় নিলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশনে প্রায় এক কোটি মানুষ বাস করছে। ঢাকাকে আরো বিস্তৃত পরিসরে চিন্তা করলে নগর এলাকায় লোকাল গভর্নমেন্টের সংজ্ঞা অনুযায়ী জনসংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ধরে রাখতে জনসংখ্যাকে পরিমিত রাখা দরকার, কিন্তু সেটা আমাদের এখানে পরিমিত অবস্থায় নেই। এরই মধ্যে আমাদের শহর অতিরিক্ত মানুষের ভারে ভারাক্রান্ত। এতে নাগরিক পরিষেবা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাস্তায় যানজট। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক পরিষেবা, পরিবেশ ইত্যাদির গুণগত মান ধরে রাখা যাচ্ছে না, যা সুষম উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শহরে বসবাসরত মানুষের অনুপাত বর্তমানে ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যেটি ২০৫০ সালে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবাসন ও অবকাঠামো খাতে তা কীরূপ প্রভাব ফেলবে? আমাদের বিদ্যমান নগরায়ণ ব্যবস্থাপনা শহরে বর্ধমান এ জনসংখ্যার চাপ বহনে সক্ষম হবে কি?

জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী নগরে বসবাসরত মানুষের অনুপাত ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ হলেও ইউএন হ্যাবিট্যাট অনুযায়ী এটি ৪০ শতাংশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশের প্রতি দুজন নাগরিকের একজন শহরে বসবাস করবে। ২০৪০ সালেই দেশের ৫২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ শহরবাসী হবে। বর্তমানের শহর ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিকভাবে চললে নাগরিক সেবায় ব্যাঘাত ঘটত না। সুষম ও টেকসই উন্নয়ন দেখতে পেতাম। কিন্তু বর্তমানে ব্যবস্থাপনা সঠিক হচ্ছে না। আবাসন ও অবকাঠামো খাতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বলা হচ্ছে, বস্তিবাসীর সংখ্যা আগের তুলনায় কমে আসছে, কিন্তু বস্তির সংজ্ঞা কী সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। ভাসমান জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আয়, শ্রেণী বা অর্থনৈতিক কর্মভিত্তিক আবাসনের প্রয়োজন। শিল্প-কলকারখানাভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থাপনা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থাপনা ভিন্ন রূপ হবে। সরকারের অনেক পরিকল্পনা জনঘনত্ব বান্ধব। তবে সব পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ধানমন্ডিকে বলা হয়েছিল ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। কিন্তু এটি কি আবাসিক এলাকা রয়েছে নাকি বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তর হয়ে গেছে। একইভাবে বাণিজ্যিক এলাকাগুলো আবাসন হচ্ছে। পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিনা সেটি প্রশ্ন থেকে যায়। জনসংখ্যা ও জনঘনত্বের মানদণ্ড পরিকল্পনায় বিবেচনা করতে হবে। শহরমুখী মাইগ্রেশনের কারণগুলো যথার্থভাবে অ্যাড্রেস করা হচ্ছে না।

ঢাকার ও দেশের অন্যত্র ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ হ্রাসমান। সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতা আমাদের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এর সমাধান কী?

এক্ষেত্রে মোটামুটি তিনটি দিক রয়েছে। সুপেয় পানির ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি সত্ত্বেও ইউনিসেফের ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি চারজনের একজন মানুষের বাড়িতে নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পানি পানের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ দেশে ৬৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে রয়েছে। শহরে পানির ব্যবহার নিয়ে ও ভূগর্ভস্থ পানির সঠিক মজুদ নিয়ে গবেষণা দরকার। পানি দূষণের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এসব বিষয়ে গবেষণার জন্য ফান্ডিং করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পানি কৃত্রিম জলাধারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে পানির অপচয় রোধ করতে হবে। অবহেলায় কল বা ট্যাপের পানি নষ্ট করা যাবে না। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা লাগবে।

আমাদের শহরগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুণগত মানসম্মত চিকিৎসা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সবার জন্য সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কেমন ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন?

শহরে তো মানুষ আসবেই কর্মসংস্থান বা শিক্ষার জন্য। নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে স্থানান্তর হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, স্থানান্তরের পর তারা সেবাটা পাচ্ছে কিনা। নগরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কারা সরবরাহ করে? নগরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বা সিটি করপোরেশনের। কিন্তু সারা বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় সরকার কী করে? এমনিতে শহরকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলো সারফেস লেভেলের, এগুলো সবার জন্য বলা যাবে না। যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে তারা বেসরকারিতে যাবে। কিন্তু এ নগরে বসবাসকারী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ রয়েছে, নিম্ন আয়ের মানুষ রয়েছে। তারা সেবা কোথা থেকে নেবে? এখন সেবা নেয়ার জন্য স্থানীয় সরকারের আওতায় আরবান হেলথ কেয়ার নামে একটা প্রজেক্ট আছে। এই প্রজেক্ট ডাটানির্ভর। এডিবিসহ অন্যান্য বিদেশী দাতাসংস্থা এখানে ফান্ডিং করে। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে তারা এ কাজ করে। এটা প্রজেক্ট বেসিসে হচ্ছে। সব সিটি করপোরেশনের জেলাগুলোয় এটি নেই। এটি নগরের নারী ও শিশুদের কেন্দ্র করে। নারী ও শিশুর বাইরে তো নগরে আরো অনেক মানুষ বাস করে। প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ছাড়াও অনেক সুরক্ষাহীন মাইগ্রেন্ট জনগোষ্ঠী আছে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে নিশ্চিত হবে? স্বাস্থ্যসেবা ক্রয় করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের যে ব্যয় করার কথা, তার চেয়ে আপনাকে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরবান হেলথ কেয়ার প্রজেক্টও তো সব ক্ষেত্রে সেবা দিচ্ছে না। শুধু দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে সেবা দিচ্ছে। ডে কেয়ার সেবা আর কয়টা রয়েছে? শহরে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ দুইয়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দিক চিন্তা করার ব্যাপার রয়েছে। সরকার আরবান হেলথ কেয়ার স্ট্র্যাটেজি তৈরি করেছে ২০২০ সালে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন দরকার। কৌশলপত্র নীতিমালা করলেই হয় না, এগুলোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। ইকোনমিক গ্রোথের জন্য স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তদারকি লাগবে। একেক হাসপাতালে একেক ধরনের ফি ধার্য করা হবে কেন? অনেক উন্নত দেশ স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কম খরচে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তিন নম্বর লক্ষ্য হলো সব বয়সী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। 

আমাদের নগরগুলোয় সবুজের সমাবেশ কমে যাচ্ছে ও প্রভাবশালী অনেকে জলাশয় দখলপূর্বক ভরাট করে ভবন করছে। ঢাকাকে কংক্রিটের জঙ্গল বলে আখ্যায়িত করেছে অনেকে। নগরকে বাসযোগ্য করে তুলতে কী করণীয়?

নগরে সবুজের সমাবেশ কিংবা জলাশয় কতটুকু চোখে পড়ে? এ নগরের খালগুলো তো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু প্রতি বছর কী পরিমাণে গাছ লাগানো হচ্ছে? নতুন নতুন এমন গাছ লাগাতে হবে যে গাছগুলো নগরের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খায়। নাহলে এ গাছগুলো সমস্যা তৈরি করতে পারে। আমাদের এখানে ছায়া, সুনিবিড় পরিবেশ দরকার। এখানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কম থাকবে। এখানে জলাশয় থাকবে। আরবান ফরেস্ট বা সোশ্যাল ফরেস্ট নামে একটা কনসেপ্ট রয়েছে। বাসযোগ্য নগরীর জন্য আরবান বা সোশ্যাল ফরেস্ট ধারণার আলোকে বৃক্ষরোপণের জায়গা চিন্তা করতে হবে। আমাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিটি করপোরেশন বা অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের উদ্যোগে সামাজিক বনায়ন করতে হবে নিয়মিত। জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার করা দরকার। এখন ভবনের ছাদে সবজি চাষ করা হয়। সবুজ ছাদ অনেক ক্ষেত্রে তাপমাত্রা শোষণ করে নিতে পারে। বিশ্বে কিন্তু এখন হেলদি সিটি কনসেপ্ট রয়েছে। নগরে তাপমাত্রা কিন্তু হ্রাস পাবে, যদি এ পদক্ষেপগুলো নেয়া যায়। নগরে সবুজ গাছপালার দরকার রয়েছে। আমরা যারা বিভিন্ন সেক্টরে রয়েছি, প্রত্যেককে সচেতনতামূলক কাজ করতে হবে। বৃক্ষনিধন হয় এমন কাজ করা উচিত নয়। দূষণের মাত্রা যেন কমে যায় সেটি চিন্তা করতে হবে। বৃক্ষরোপণের জন্য জলাশয়গুলো যদি বাড়ানো যায়, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করলে সেখানে নাগরিকদের জীবন সুন্দর হবে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারবে। তাতে শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেও বড় পরিবর্তন আসবে। সারা দেশেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালিত করতে হবে। নগরকে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

অভ্যন্তরীণ মাইগ্রেশনের একটা বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন গুরুতর হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে শহরমুখী মানুষের ঢল আরো বড় হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান কী?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটবে। বাস্তুচ্যুত হবে। বাস্তুচ্যুত গোষ্ঠী নগরমুখী হবে। এ অবস্থার কারণে নগরে জনসংখ্যার চাপ বাড়বে। এ চাপ কমাতে স্থানীয় অ্যাডাপটেশনের দরকার। এর জন্য স্থানভেদে স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাম থেকে স্থানান্তর ঠেকাতে গ্রামে জীবিকার জন্য কর্মসূচি নিতে হবে। জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য চিন্তা করতে হবে শহরে যেহেতু মাইগ্রেশন হচ্ছে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিগুলো শহরের বাইরে করা হলে মানুষ শহরমুখী হবে না। শিক্ষা ও গুণগত সেবা শহরের বাইরে নিশ্চিত করা গেলে তো এখানে মানুষের আসার প্রয়োজন নেই। এ বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে ভালো যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাও সহায়তা করতে পারে। ঢাকায় মানুষ এল, কাজ করে চলে গেল। উন্নত দেশে এ ধরনের কমিউটিং সিস্টেম থাকে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হচ্ছে। একটি বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনিক, ব্যুরোক্রেটিক যত কাজ আছে সব কাজের জন্য ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় তো সব রাখার দরকার নেই, বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। পেনশনের টাকা তুলতে ঢাকায় আসতে হয়। প্রশাসনিক যে সেবাগুলো ঢাকার বাইরে দেয়া সম্ভব, সেগুলো যদি অনলাইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স যদি তৈরি করা যায় তাহলে তো শহরে আসার প্রয়োজন নেই। জনসংখ্যাকে সব উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর একটা নগর রেখে যাওয়া সম্ভব হবে।

আরও